একটা কোনও গোপন স্থান খোঁজবার জন্যে আমরা বনের চারিদিকে ছুটাছুটি করতে লাগলুম। কিন্তু সেখানে আবার এক নতুন আতঙ্ক! লুকোবার ঠাঁই খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ বনের এক জায়গায় দেখি, দোতলা বাড়ির চেয়েও উঁচু একটা অতিকায় ভীষণ জানোয়ার দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে এবং দুই হাত বাড়িয়ে মস্ত একটা গাছ অতি অনায়াসে মড়মড় করে ভেঙে ফেলেছে। দেখতে তাকে অনেকটা ভল্লুক ও বনমানুষের মাঝামাঝি!
বিস্ময়ে-স্তম্ভিত নেত্রে বিমল বললে, ও কী সর্বনেশে জন্তু?
আমি বললুম, অতিকায় শ্লথ!
ও যদি আমাদের দেখতে পায়, তাহলে যে তার রক্ষা থাকবে না!
এর চেয়ে যে বানরমানুষদের সঙ্গে লড়াই করা ভালো! এসো, এসো পালিয়ে এসো!
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবার বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলুম!
রামহরি বললে, যেদিকে যাই সেই দিকেই বিপদ, এবারে সত্যি বুঝি প্রাণটা গেল।
বিমল হেসে বললে, কই রামহরি, তোমার মহাদেবকে আর ডাকছ না কেন? আর একবার ডেকে দেখো, যদি তিনি এ বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করতে পারেন।
রামহরি রেগে বললে, মরতে বসেছ খোকাবাবু এখনও দেবতা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা। হে বাবা মহাদেব! খোকাবাবু ছেলেমানুষ, তার অপরাধ ক্ষমা করো–বলেই হাতজোড় করে কপালে ছোঁয়ালে।
বিমল বললে, কিন্তু কী আশ্চর্য, বানরমানুষগুলো অবাক হয়ে কি দেখছে? ওরা যে এখনও আমাদের আর আক্রমণ করলে না? ওরা কি আমাদের বন্দুকের ভয়েই আর এগুচ্ছে না?
আমি বললুম, ওরা সবাই হ্রদের নৌকাগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছে! বোধহয় ওরা নৌকাগুলো ডাঙায় আসার জন্যে অপেক্ষা করছে! নৌকা ডাঙায় এলেই ওরা একসঙ্গে দুই দিক থেকে আমাদের আক্রমণ করবে।
বিমল বললে, নৌকোর ওপরেও গুলি চালাব নাকি?
না, নৌকোগুলো এখনও দূরে আছে, বন্দুক ছুড়লে হয়তো ফল হবে না। বন্দুক যদি ছুঁড়তে হয় তো মাঠের দিকেই ছুড়ো, আরও দু-একজন মরলে বাকি বানরমানুষগুলো ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে!
তাই ভালো।
আমরা দুজনেই শত্রুদের লক্ষ করে বার কয়েক বন্দুক ছুড়লুম। যা ভেবেছি তাই! বন্দুকের মারাত্মক শক্তি দেখে অনেকগুলো বানরমানুষ লাফ মেরে আবার গাছের উপরে উঠে ঘন পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল, অনেকে বনের ভিতরে ঢুকে পড়ল, মাঠের উপরে রইল খালি পাঁচ-ছয়টা আহত বা মৃতদহ। কিন্তু শত্রুদের ঘন ঘন চিৎকার শুনেই বুঝলুম, তারা আমাদের আশা একেবারে ত্যাগ করে পালিয়ে যায়নি–আড়ালে-আড়ালে ওঁত পেতে বসে আছে।
হ্রদের দিকে তাকিয়ে বিমল বললে, এইবার এদের ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু বিমল, নৌকোর ওপরে ওরা কারা রয়েছে ওদের তো বানরমানুষ বলে মনে হচ্ছে না!
হ্যাঁ, তাই তো! ওরা তো বানরমানুষদের মতো ল্যাংটো নয়–ওদের পরনে জামাকাপড়ের মত কি যেন রয়েছে না?
হ্যাঁ! বোধহয় ওরা আমাদেরই মতো মানুষ।
সংখ্যায় তো দেখছি ওরা চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের কম নয়! তাহলে এখানে আমরা ছাড়া আরও মানুষ আছে! কিন্তু কী মতলবে ওরা আমাদের কাছে আসছে? ওরা শত্ৰু না মিত্র?
কিছুই তো বুঝতে পারছি না! হয়তো ওরা অসভ্য মানুষ, হ্রদের ওই দ্বীপে থাকে।
নৌকোগুলো ডাঙার খুব কাছে এসে পড়ল। একখানা নৌকোর উপরে হঠাৎ দুজন লোক দাঁড়িয়ে উঠল এবং দু-হাত তুলে চিৎকার করে ডাকল–বিমল! রামহরি! বিনয়বাবু। বাঘা!
শুনেই বাঘা তিরের মতো হ্রদের দিকে ছুটে গেল! আনন্দে আমাদেরও বুক যেন নেচে উঠল–এ যে কুমার আর কমলের গলা!
আমরাও এক দৌড়ে হ্রদের ধারে গিয়ে দাঁড়ালুম। সঙ্গে-সঙ্গে একখানা নৌকা থেকে কুমার আর কমল ডাঙায় লাফিয়ে পড়ল এবং বাকি নৌকোগুলো থেকেও উল্লসিত কণ্ঠে উচ্চ চিৎকার শুনলুম–বিনয়বাবু, বিনয়বাবু!
আনন্দের প্রথম আবেগ সামলে দেখি, আমাদের চারপাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে যারা তারা কেউই অচেনা লোক নয়! তারা হচ্ছে আমাদেরই দেশের লোক, মঙ্গলগ্রহের বামনরা। বিলাসপুর থেকে তাদের বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল এবং এই দ্বীপে এসেই তাদের সঙ্গে আমাদের প্রথম ছাড়াছাড়ি হয়! পাঠকরাও নিশ্চয়ই তাদের কথা ভুলে যাননি?
মনের আনন্দে আমরা যখন কথাবার্তায় বিভোর হয়ে আছি, আচম্বিতে মাঠের দিক থেকে বিষম একটা গোলমাল শোনা গেল। ফিরে দেখি, বনের নানাদিক থেকে পিলপিল করে দলে-দলে বানরমানুষ বেরিয়ে আসছে। দেখতে-দেখতে হাজার-হাজার বানরমানুষে মাঠের একদিক একেবারে ভরে গেল! হঠাৎ ভীষণ হল্লা করে তারা একসঙ্গে আবার আমাদের আক্রমণ করতে অগ্রসর হল।
বিমল আবার বন্দুক তুলে ফিরে দাঁড়াল।
কুমার বললে, মিছে গোলমাল বাড়িয়ে লাভ নেই বিমল! এসো, আমরা নৌকোয় গিয়ে চড়িগে! ওরা সাঁতার জানে না, জলকে বড় ভয় করে!
আমি সায় দিয়ে বললুম, হ্যাঁ, সেই কথাই ভালো। ওদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে যদি আমাদের কেউ মারা পড়ে, তাহলে আজকের এই মিলনের আনন্দ অনেকখানি ম্লান হয়ে যাবে।
আমরা সকলে মিলে তাড়াতাড়ি নৌকোর উপরে গিয়ে উঠে বসলুম। বানরমানুষরা যখন হ্রদের ধারে এসে দাঁড়াল, আমাদের নৌকোগুলো তখন তাদের নাগালের বাইরে গিয়ে পড়েছে। নিষ্ফল আক্রোশে আমাদের লক্ষ করে তারা কতকগুলো বড় বড় পাথর বৃষ্টি করলে, কিন্তু সেগুলো আমাদের কাছ পর্যন্ত এসে পৌঁছল না। উত্তরে আমরাও বন্দুক ছুড়লে বানরমানুষদের আরও কিছু শিক্ষা হত বটে, কিন্তু আমাদের আর বন্দুকের টোটা নষ্ট করতে প্রবৃত্তি হল না!
