রামহরি হঠাৎ সেইখানে শুয়ে পড়ে দণ্ডবৎ হয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করলে।
আমি বললুম, ও কী রামহরি, প্রণাম করলে কাকে?
রামহরি উঠে বসে বললে, আজ্ঞে, দেবতাকে!
দেবতা। কোথায় দেবতা?
সম্ভ্রমের সঙ্গে পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে রামহরি বললে, ওই যে, দেবতা ওইখানে আছেন।
আমি হেসে ফেলে বললুম, ওটা তো আগ্নেয়গিরি। তোমার প্রণামটা যে বাজে খরচ হল রামহরি।
কিন্তু রামহরি আমার কথায় বিশ্বাস করলে না। তাড়াতাড়ি জিভ কেটে বললে, ছি, ছি, অমন কথা বলবেন না বাবু! ইংরিজি কেতাব পড়ে আপনারা সব ক্রিশ্চান হয়ে গেছেন, দেবতা টেবতা মানেন না, সেই পাপেই তো এত বিপদে পড়ছেন। ওখানে, মহাদেব আছেন, ও আগুন যে তারই চোখের আগুন–ওই আগুনেই তো মদন ভস্ম হয়েছিল, হে বাবা মহাদেব, তুমি আমার বাবুদের অপরাধ নিও না বাবা। বলেই আবার সে মাটির উপরে ভক্তিভরে কপাল ঠুকতে লাগল।
বিমলের কিন্তু এসব কিছুই ভালো লাগছিল না, সে অস্থির ভাবে বারকয়েক এদিকে ওদিকে ঘোরাঘুরি করে আমার কাছে এসে বললে, এখনও তো কুমার আর কমলের কোনওই খোঁজ পাওয়া গেল না।
আমি বললুম না, না। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তারা এই বনের ভেতরেই আছে।
বিমল নিরাশ কণ্ঠে বললে, আমার বিশ্বাস, তারা আর বেঁচে নেই। বিনয়বাবু তাদের এই অকাল মৃত্যুর জন্যে আমরাই দায়ী। গুহার ভেতরে নিরস্ত্র অবস্থায় তাদের যদি ফেলে না রেখে যেতুম, তাহলে কখনওই এমন দুর্ঘটনা ঘটত না–
আচম্বিতে বাঘা চেঁচিয়ে উঠল, আমি চোখের পলকে ফিরে দাঁড়ালুম। ও আবার কি দৃশ্য? প্রকাণ্ড এক গাছের তলায় সারি সারি ওরা কারা এসে দাঁড়িয়েছে? মানুষের মতো তারা দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের মতোই তাদের হাত-পা দেহ কিন্তু তারা মানুষ নয়। জাদুঘরে আমি গরিলার মূর্তি দেখেছি, এদেরও দেখতে অনেকটা সেইরকম, কিন্তু এরা গরিলাও নয়! এদের রং কালো, পায়ে বড় বড় লোম, হাতগুলো এত লম্বা যে প্রায় হাঁটুর কাছে এসে পড়েছে। দেহের তুলনায় এদের মাথাগুলো ছোট ছোট, মুখশ্রী প্রায় মানুষের মতো বটে, কিন্তু ভয়ানক কুৎসিত, নাক চ্যাপ্টা, আর মুখের আধখানা দাড়ি-গোঁপে ঢাকা। এদের চেহারা মানুষ আর বনমানুষের মাঝামাঝি। পণ্ডিতেরা যে বানরমানুষের কথা লিখেছেন, তবে কি এরা তাই?
পাশের আর একটা গাছের ডালপাতার ভিতর থেকে ঝুপঝুপ করে আরও অনেকগুলো বানরমানুষ পৃথিবীর উপরে অবতীর্ণ হল–প্রত্যেকেরই হাতে এক এক গাছা মোটা লাঠি। তারপর আর একটা গাছ থেকে আরও কতকগুলো জীব মাটির উপরে এসে দাঁড়াল–এমনি করে তারা ক্রমেই দলে ভারী হয়ে উঠতে লাগল।
আমি বললুম, বিমল, এরাই হচ্ছে মানুষের পূর্বপুরুষ। কিন্তু এরা বোধহয় আমাদের আক্রমণ করতে চায়।
বিমল কোনও জবাব না দিয়ে বন্দুকটা কাঁধের উপর থেকে নামিয়ে বেশ করে বাগিয়ে ধরল।
.
অতিকায় শ্লথ
এই বানরমানুষরা যে আমাদের আক্রমণ করতে চায় সে বিষয়ে আর কোনওই সন্দেহ রইল না। ক্রমে ক্রমে দলে ভারী হয়ে তারা আমাদের একেবারে ঘিরে ফেলবার চেষ্টা করলে। তারা নানান রকম অঙ্গভঙ্গি ও চিৎকার করে কীসব বলতে লাগল,–সেগুলো অর্থহীন শব্দ, অথবা তাদের ভাষা, তাও বুঝতে পারলুম না।
আমি বললুম, বিমল যদি বাঁচতে চাও, দৌড়ে ওই হ্রদের ধারে চলো। নইলে এরা আমাদের একেবারে ঘিরে ফেলে আর বাঁচবার উপায় থাকবে না।
বিমল বললে, হুঁ।
কিন্তু বানরমানুষরাও বোধহয় আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে ফেললে। কারণ আমরা হ্রদের দিকে ফিরতে না ফিরতেই ভয়ানক চিৎকারে আকাশ কাঁপয়ে তারা আমাদের আক্রমণ করলে।
সঙ্গে সঙ্গে বিমলও কিছুমাত্র ইতস্তত না করে বন্দুক ছুড়লে, আমিও আমার বন্দুকের ঘোড়া টিপলুম-অব্যর্থ লক্ষ্যে দুটো জীব তৎক্ষণাৎ মাটির উপরে হাত-পা ছড়িয়ে আছড়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল।
বন্দুকের গর্জনে আর সঙ্গী দুজনের অবস্থা দেখে বাকি বানরমানুষগুলো হতভম্ব ও মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। জীবনে তারা আগ্নেয় অস্ত্র কখনও তো চোখে দেখেনি, কোন মায়ামন্ত্রে আমরা যে তাদের দুই সঙ্গীর অমন দুরবস্থা করলুম এটা বুঝতে না পেরে ভয়ে ও বিস্ময়ে নিশ্চয় তারা অবাক হয়ে গেল।
সেই ফাঁকে আমরা হ্রদের দিকে ছুট দিলুম। প্রায় যখন জলের কাছাকাছি এসে পড়েছি, তখন আবার আর এক বিপদ। হ্রদের উপরে কয়েকখানা ছিপের মতো লম্বা নৌকো ভাসছে এবং প্রত্যেক নৌকোর মধ্যে মানুষের মতো দেখতে অনেকগুলো করে লোক!
নৌকোগুলো তিরের বেগে অর্থাৎ আমাদের দিকে ছুটে আসছে। নিশ্চয়ই আরও একদল বানরমানুষ জলপথ আগলে আছে। ভেবেছিলুম সাঁতরে হ্রদের ওই দ্বীপে গিয়ে উঠে প্রাণ বাঁচাব, কিন্তু এখন তো দেখছি সে পথও বন্ধ।
পিছনে ফিরে দেখি মাঠের উপরের বানরমানুষদের দল আরও পুরু হয়ে উঠেছে। আহত সঙ্গী দুজনের চারপাশ ঘিরে তাদের অনেকে উত্তেজিত ভাবে অঙ্গভঙ্গি করছে,–অনেকে আবার আমাদের লক্ষ করে বিকট স্বরে চিৎকার ও লাঠি আস্ফালন করতেও ছাড়ছে না।
আমাদের তরফ থেকে বাঘাও লাঙ্গুল আস্ফালন করে তাদের চিৎকারের উত্তর দিতে লাগল।
রামহরি বললে, বাবু, এখন আমরা কোনদিকে যাই?
বিমল বললে, আবার বনের ভেতর চলো। সেখানে হয়তো লুকোবার একটা জায়গা পাওয়া যেতে পারে!
তা ছাড়া আর উপায়ও নেই। বিশেষত বনের ভিতরে আত্মরক্ষারও সুবিধা বেশি। বন খুব কাছেই ছিল, আমরা আবার ছুটে তার মধ্যে গিয়ে ঢুকলুম–মাঠ ও নৌকো থেকে শত্রুরা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল।
