বিমল বললে, ভূত কি তোমার ঘাড় থেকে কখনও নামবে না, রামহরি। পথ ছাড়ো, আমাকে দেখতে দাও।
আমি বললুম, বিমল, এই ভরসন্ধেবেলায় তুমি আর গোঁয়ারতুমি কোরো না। জঙ্গ লের ভেতরে কী আছে, আজ আর তা দেখবার দরকার নেই। এসো, এইবেলা আলো থাকতে থাকতে পাহাড়ের ওপরে উঠে রাত কাটাবার ব্যবস্থা করি!
অগত্যা বিমলকে আমার প্রস্তাবে রাজি হতে হল! আমরা সকলে পাহাড়ে চড়তে শুরু করলুম। পাহাড়টা বেশি উঁচু নয়, তার মাথায় উঠতে আমাদের বিশেষ বেগ পেতে হল না। উপরে গিয়ে একটা জায়গায় শ্রান্ত দেহে আমরা বসে পড়লুম। পৃথিবীর বুকের উপরে সন্ধ্যা তখন তার আঁধার অঞ্চল ধীরে ধীরে বিছিয়ে দিতে শুরু করেছে–অদূরে সমুদ্রের নীল রং। ছায়ার মায়ায় ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে। আকাশ এখানে ঠিক আমাদের দেশের মতোই সুন্দর এই দ্বীপের কোনও বিভীষিকার আভাস তার নীলিমাকে ম্লান করে দেয়নি। তবে বাংলাদেশে সন্ধ্যার সাড়া পেয়ে বকের দল তেমন নীলসায়রে শ্বেতপদ্মের মালার মতো দুলতে-দুলতে ভেসে যায়, সে ছবি এখানে কেউ দেখতে পায় না।
পাহাড়ের পাশের বনের দিকে তাকিয়ে একটি নতুনত্ব চোখে পড়ল। এই বনের যেমন বড় বড় গাছ আছে, দ্বীপের আর কোথাও তা নেই। অনেক গাছ আমাদের পাহাড়েরও মাথা ছাড়িয়ে চারিদিকে ডাল-পাতা বিস্তার করে শূন্যের দিকে উঠে গেছে–গাছ যে এত উঁচু হতে পারে আগে আমার সে ধারণা ছিল না। এসব গাছের নাম বা জাতও আমার জানা নেই।
রাতটা নিরাপদেই কেটে গেল জলাভাব ছাড়া আর কোনও কষ্ট আমাদের ভোগ করতে হল না।
সকালবেলায় পূর্বাকাশের নীলমুখ সবে যখন রাঙা হয়ে উঠেছে আমরা তখন পাহাড় থেকে আবার নীচে নেমে এসে দাঁড়ালুম।
কাল যে জঙ্গলের ভিতরে সেই চোখ দেখেছিলুম, আগেই বাঘা তার কাছে ছুটে গেল! তারপর জঙ্গলের আশপাশ খুব সন্তপর্ণে গলা বাড়িয়ে দেখে এবং ভালো করে শুঁকে আবার সে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে আমাদের কাছে শান্ত ভাবে ফিরে এল–বাঘার হাবভাব দেখেই আমরা বুঝতে পারলুম যে, জঙ্গলের ভিতরে আজ আর কোনও শত্রু লুকিয়ে নেই।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আমরা সেই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করলুম। সে অরণ্য গভীর বটে কিন্তু খুব নিবিড় নয় তার উপরে দুধারের বড় বড় গাছের মাঝখান দিয়ে, সুন্দর একটি পায়ে-চলা পথের রেখা এঁকেবেঁকে বরাবর চলে গেছে। তারা এই বনের ভিতরে এমন পথের সৃষ্টি করেছে? নিয়মিত ভাবে আনাগোনা না করলে এমন পথ কখনও তৈরি হতে পারে না, কিন্তু কারা এখান দিয়ে আনাগোনা করে? আমাদের মনের ভিতরে কেবলই এই প্রশ্ন উঠতে লাগল, কিন্তু এ বিচিত্র রহস্যের কোনওই কিনারা করে উঠতে পারলুম না!
সেই পথ ধরেই অগ্রসর হতে লাগলুম। চারিদিকে গাছপালা আর বনজঙ্গল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঝে মাঝে অল্প হাওয়ায় ভোরের আলোতে চিকণ গাছের পাতাগুলো অস্ফুট আর্তনাদের মতো অস্পষ্ট আওয়াজ করে কেঁপে কেঁপে উঠছে মাত্র, তা ছাড়া আর কোনও দিকেই কোনও জীবের লক্ষণ নেই! এ নিস্তব্ধতা কেমন যেন অস্বাভাবিক। বনের আশেপাশে রোদের সোনালি আভা দেখে আমাদের মনে হতে লাগল, গভীর রাত্রির নীরবতার মাঝখানে সে যেন চোরের মতো চুপিচুপি ঢুকে পড়েছে। তার উপর আর এক অসোয়াস্তি। সেই অতিকায়। সেকেলে জীবের অরণ্যের মধ্যে ঢুকে আমাদের মনে যে অমানুষিক বিভীষিকার ভাব জেগে উঠেছিল, এখানেও বুকের ভিতরে তেমনি একটা আতঙ্কের আভাস জাগতে লাগল। কে যেন লুকিয়ে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আসছে, কারা যেন আড়াল থেকে আমাদের সর্বাঙ্গে ক্ষুধিত চোখের চাউনি বুলিয়ে দিচ্ছে। সামনে, পিছনে ডাইনে, বাঁয়ে, উপরে নীচে সব দিকেই তাকিয়ে দেখি, কিন্তু জনপ্রাণীকেও দেখতে পাই না,–অথচ ভয় যায় না, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, থেকে থেকে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। এ যে আমাদের মনের মিথ্যে ভ্রম তাও তো বলতে পারি কারণ অবোধ পশু বাঘা, সেও চলতে-চলতে হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কান পেতে কি যেন শুনছে আর মাঝে মাঝে গোঁ-গোঁ করে গজরে উঠছে! স্পষ্ট দিনের আলোতেও যে এমন একটা অজানা আতঙ্ক মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে দিতে পারে, আগে আমার সে বিশ্বাস মোটেই ছিল না।
এমনি ভয়েভয়ে প্রায় ক্রোশখানেক পথ পার হয়ে একটা ভোলা মাঠের ধারে এসে পড়লুম! সামনে থেকে গাছপালার সবুজ পরদা সরে গিয়ে দেখা দিলে এক অপূর্ব কল্পনাতীত দৃশ্য।
মাঠের একপাশে আবার এক বিশাল হ্রদ–প্রভাত-সূর্যের মায়াকিরণে তার অগাধ জলরাশি তরলিত মণিমাণিক্যের মতো বিচিত্র হয়ে উঠেছে। হ্রদের মাঝখানে ঠিক যেন ছবিতে আঁকা, তরুলতা দিয়ে ঢাকা ছোট্ট একটি ছায়া-মাখা দ্বীপ এবং সেই দ্বীপের শ্যামলতা ভেদ করে মাথা তুলে জেগে আছে পিরামিডের মতো একটি পাহাড়! সবচেয়ে অবাক ব্যাপার এই যে, পাহাড়ের বুকের ভিতর থেকে মাঝে মাঝে অসংখ্য আগুনের লকলকে শিখা হু হু করে বাইরে বেরিয়ে আসছে ঠিক যেন রাশি রাশি অগ্নিময় সৰ্প মহাক্রোধে কোনও এক অদৃশ্য শত্রুকে থেকে থেকে ছোবল মেরে আবার গর্তের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। হ্রদের জলে সেই অগ্নিলীলার ছায়া পড়ে দৃশ্যটাকে করে তুলছে আরও চমকপ্রদ।
আমরা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম–এমন অদ্ভুত দৃশ্য আর কখনও চোখে দেখিনি–এ দৃশ্য যেমন আশ্চর্য, তেমনি সুন্দর, তেমনি গম্ভীর।
