আমার ইচ্ছা ছিল আজ বিশ্রাম করে কাল ভোরবেলায় কুমার আর কমলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। কিন্তু এটুকু দেরিও বিমলের সইল না। অথচ সে একবারও ভেবে দেখলে না। যে, ঘণ্টায় পরে রাত হতেই আমাদের পথের মধ্যেই নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকতে হবে– কারণ বেলা থাকতে-থাকতে এই অল্প সময়ের মধ্যে নিশ্চয়ই আমরা কুমার আর কমলের কোনও খোঁজই পাব না!
সমুদ্রের তীরে গিয়ে বালির উপরে সেই পদচিহ্নগুলো দেখে আমরা অগ্রসর হতে লাগলুম। বাঘা কিছুতেই একলা গুহার ভিতরে থাকতে রাজি হল না, কাজেই তাকেও সঙ্গে নিতে হয়েছে। সে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে আমাদের আগে-আগে চলল।
পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে বালির উপরে অসংখ্য পায়ের দাগ বরাবর চলে গেছে। দাগগুলো এত স্পষ্ট যে অনুসরণ করতে আমাদের কোনওই কষ্ট হল না। দ্বীপের যেদিকে যাচ্ছি এদিকে আমরা আগে আর কখনও আসিনি, এদিকটায় যতদূর চোখ চলে দেখতে পাচ্ছি খালি পাহাড়ের পর পাহাড়! অধিকাংশ পাহাড়ই ছোট-ছোট–নব্বই কি একশো ফুটের বেশি উঁচু নয়। সেই সব পাহাড়ের মাঝে মাঝে ছোটবড় বনজঙ্গল। চলতে-চলতে আমার মনে হতে লাগল দ্বীপের এই অজানা অংশে হয়তো সেকালের আরও কতরকমের ভীষণ জীব বাস করে। আজ রাত্রেই হয়তো তাদের অনেকের সঙ্গে দেখাশুনো হয়ে যাবে, কালকের মতো আজ রাত্রেও হয়তো প্রতিমুহূর্তেই চোখের সামনে মৃত্যু এসে মূর্তি ধরে দাঁড়াবে! এসব কথা ভাবতেও মন। হাঁপিয়ে উঠতে লাগল–এমন নিত্য নব বিপদের সঙ্গে যুঝে যুঝে বেঁচে থাকাও আমার কাছে। যেন মিথ্যা বলে মনে হল না আছে আনন্দ, না আছে শান্তি, না আছে দু-দণ্ড বিশ্রাম–একে কি আর জীবন বলে? এই তো আমাদের দুজনকে আর দেখতে পাচ্ছি না, আর দেখতে পাব কিনা তাও জানি না, এমনি বিপদের মধ্যে দিয়ে যেতে-যেতে একে একে আমাদেরও লীলাখেলা সাঙ্গ হয়ে যাবে–দেশের কেউ আমাদের কথা জানতেও পারবে না, মরবার সময়ে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের মুখ পর্যন্ত দেখতে পাব না!
ভাবতে-ভাবতে পথ চলছি। বিমল আর রামহরির মুখেও কোনও কথা নেই, তারাও বোধহয় আমারই মতো ভাবনা ভাবছে! ঘণ্টা-দুই পরে সূর্য পশ্চিম আকাশের মেঘের দরজা খুলে অদৃশ্য হয়ে গেল, সমুদ্রের নীলজলের উপরে আসন্ন সন্ধ্যার ছায়া ধীরে-ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
আরও খানিকক্ষণ চলবার পরে আমরা যে জায়গায় এসে দাঁড়ালুম তার দুদিকে দুটো পাহাড় আর মাঝখানে অরণ্য। পায়ের দাগ বেঁকে সেই বনের ভিতরে চলে গেছে।
আমি বললুম, বিমল সামনেই রাত্রি এখন এ-বনের ভিতরে যাওয়া কি উচিত?
বিমল বললে, না গেলেও তো চলবে না।
আমি বললুম, কিন্তু গিয়েও তো কোনও লাভ নেই। অন্ধকারে পায়ের দাগ দেখা যাবে না, আমরা যদি নিজেরাই কালকের মতো আবার পথ হারিয়ে ফেলি, তা হলে কুমার আর কমলকে উদ্ধার করবে কে?
বিমল বললে, তাহলে উপায়?
আমার মতে আজকের রাতটা এই পাহাড়ের উপরে উঠে কোনওরকমে কাটিয়ে দেওয়া উচিত। তারপর কাল ভোরে বনের ভিতরে ঢুকলেই চলবে।
রামহরিও আমার মতে সায় দিলে।
বিমল একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, আচ্ছা।
ঠিক সেই সময়ে বাঘা হঠাৎ গোঁ-গোঁ করে গর্জে উঠল। আমি সচমকে চারিদিকে তাকালুম কিন্তু কোথাও কিছু দেখতে পেলুম না। বাঘার মাথায় একটা চাপড় মেরে আমি বললুম, চুপ কর বাঘা, চুপ কর।
সে কিন্তু চুপ করলে না, আরও কয় পা এগিয়ে গিয়ে তেমনি গজরাতে লাগল।
রামহরি বললে, বাঘা নিশ্চয় কিছু দেখেছে, ও তো মিথ্যে চ্যাঁচায় না।
কিন্তু কি দেখেছে বাঘা? এদিকে-ওদিকে তাকাতে-তাকাতে হঠাৎ জঙ্গলের এক জায়গায় আমার নজর পড়ল কারণ সেখানকার গাছপালা অল্প অল্প কাঁপছিল।
দু-পা এগিয়েই আমি চমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। সভয়ে দেখলুম গাছের পাতার ফাঁকে অন্ধকারের ভিতর থেকে দুটো ভীষণ চোখ জুলজুল করছে। সে ক্রুর চোখের দৃষ্টি কী নিষ্ঠুর কী তীব্রতার মধ্যে লেশমাত্র দয়ামায়ার ভাব নেই! কে ওখানে গাছের আড়ালে বসে অমন লোলুপ নেত্রে আমাদের পানে তাকিয়ে আছে–সে কি জানোয়ার, মানুষ, না পিশাচ?
সে চোখ দুটোর মধ্যে কি সাংঘাতিক আকর্ষণ ছিল জানি না, কিন্তু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও আমি পায়ে-পায়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলুম। শুনেছি সাপেরা কেবল চোখের চাউনি দিয়ে গাছের ডাল থেকে পাখিদের মাটির উপরে টেনে এনে ফেলে–আমারও সেই অবস্থা হল নাকি?
সেই ভয়ানক চোখের আকর্ষণে আচ্ছন্নের মতো এগিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ পিছনে থেকে বিমল ডাকলে, বিনয়বাবু, বিনয়বাবু!
.
রামহরির মহাদেব বন্দনা
বিমলের চিৎকারে আমার সাড় হল আমার চমক ভেঙে গেল, শিউরে উঠে আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। বুঝতে পারলুম সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাচ্ছিলুম।
বিমল তাড়াতাড়ি এসে আমার হাত চেপে ধরে বললে, অমন করে বনের ভেতরে ঢুকেছিলেন কেন?
বনের ভেতরে, গাছের ফাঁকে দুটো ভয়ানক চোখ দেখছি। তোমরা কি কিছুই দেখতে পাওনি?
বিমল আশ্চর্য স্বরে বললে, চোখ। কই, কোথায়?
ওই যে ওইখানে! আঙুল তুলে বিমলকে জায়গাটা দেখিয়ে দিতে গিয়ে দেখি সেই নিষ্ঠুর চোখদুটো আর সেখানে নেই। কিন্তু বাঘা তখনও জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছিল।
আচ্ছা, আমি জঙ্গলের ভেতরটা একবার দেখে আসি! বলেই বিমল অগ্রসর হল, কিন্তু রামহরি তাড়াতাড়ি বিমলের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বললে, না, না, সে কিছুতেই হবে না! জঙ্গলের ভেতরে নিশ্চয়ই ভূত আছে!
