আমরা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই সৃষ্টিছাড়া জীব দুটোকে অবাক হয়ে দেখতে লাগলুম। বৈজ্ঞানিকরা যে কি দেখে এদের পাখি বলে স্থির করেছেন তা শুধু তারাই জানেন, কারণ পাখিদের সঙ্গে এই বীভৎস জীবগুলোর কিছুই মেলে না, তাদের দেহ পালকহীন ও সরীসৃপের মতো, দাঁতওয়ালা চঞ্চ আর পা হচ্ছে চারখানা ও লেজ হচ্ছে দড়ির মতো। কিম্ভুতকিমাকার!
এমন সময় বাঘার চিৎকার শুনলুম–ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ। মুখ তুলে দেখলুম, চাঁচাতে চেঁচাতে সে আমাদের দিকেই বেগে ছুটে আসছে।
সত্যিই তো! বাঘা ছুটে আসছে বটে, কিন্তু খোঁড়াতে-খোঁড়াতে, পিছনের একখানা পা তুলে! তার চিৎকারেও আজ যেন কেমন কাতরতা মাখানো।
বাঘা ছুটে এসে একেবারে আমাদের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল।
বিমল হেঁট হয়ে পড়ে বিস্মিত কণ্ঠে বললে, বিনয়বাবু, বিনয়বাবু দেখুন! বাঘার গায়ে রক্ত।
হ্যাঁ, বাঘার সর্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত!
বিমল পাহাড়ের দিকে ছুটতে ছুটতে বললে, শিগগির আসুন, কুমার আর কমল বোধ হয় কোনও বিপদে পড়েছে।
আমি আর রামহরিও পাহাড়ের দিকে ছুট দিলুম।
পাহাড়ের উপরে উঠেও কোনও গোলমাল শুনতে পেলুম না। কিন্তু গুহার সামনে গিয়ে দেখলুম, সেখানে পাহাড়ের পাথর রক্তে একেবারে রাঙা হয়ে উঠেছে।
বিমল ঝড়ের মতো গুহার ভিতরে ঢুকে, আবার বেরিয়ে এসে বললে, গুহার ভিতরে তো কেউ নেই। কুমার, কুমার।
কেউ সাড়া দিলে না।
আমিও চেঁচিয়ে ডাকলুম, কুমার। কমল।
কোনও সাড়া পেলুম না!
বিমল করুণস্বরে বললে, এত রক্ত কীসের বিনয়বাবু, এত রক্ত কীসের? তবে কি তারা আর বেঁচে নেই?
আমি বললুম, হয়তো তারা সমুদ্রের ধারে গিয়েছে! এস পাহাড় থেকে নেমে খুঁজে দেখি গে।
সকলে আবার পাহাড় থেকে নেমে গেলুম। কিন্তু নীচে গিয়ে দেখলুম, সমুদ্রের ধারে জনমানব নেই।
বিমল মাথায় হাত দিয়ে সেইখানেই বসে পড়ল, রামহরি চিৎকার করে কেঁদে উঠল, বাঘাও সেই সঙ্গে যোগ দিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে কাঁদতে লাগল, কেঁউ, কেঁউ, কেঁউ।
হঠাৎ বালির উপর আবার চোখ পড়ল। তাড়াতাড়ি বিমলকে ডেকে আমি বললুম, দেখো এ আবার কী ব্যাপার?
কী বিনয়বাবু, কি?
পায়ের দাগ।
পায়ের দাগ। কার পায়ের দাগ?
মানুষের।
তাই তো, একটা দুটো নয়, এ যে অনেকগুলো। এ আবার কি রহস্য বিনয়বাবু?
বেশ বোঝা যাচ্ছে এখানে একদল মানুষ এসেছিল।
কিন্তু আমরা ছাড়া এ দ্বীপে তো আর মানুষ নেই।
নিশ্চয় আছে, নইলে মানুষের পায়ের দাগ এখানে এল কেমন করে? বিমল কাল রাত্রে আমরা ভুল শুনিনি, বনের ভিতরে কাল নিশ্চয়ই মানুষ আর্তনাদ করেছিল।
বিমল নিষ্পলক নেত্রে বালির উপরে আঁকা সেই পদচিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে নির্বাকভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
.
চোখের মায়া
এ দ্বীপেও তাহলে মানুষ আছে!
কাল রাত্রেই, সেই ভয়ানক বনের নিবিড় অন্ধকারের ভিতরে বসে এই সন্দেহটা প্রথমে আমার মনের ভিতরে জেগে উঠেছিল। তারপর আজকে বালির উপরে এই পায়ের দাগ! এ দাগগুলো যে মানুষেরই পায়ের ছাপ, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই!
এতদিন যে দ্বীপকে জনহীন বলে মনে করতুম আজ সেখানে মানুষ আছে জেনে প্রথমটা আমার মন পুলকিত হয়ে উঠল! কিন্তু তারপরেই মনে হল এখানে মানুষ থাকলেও তারা কি আমাদের বন্ধু হবে? তারা কি আমাদেরই মতো সভ্য? এই যে কমল আর কুমারের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, এ ব্যাপারের সঙ্গে কি তাদের কোনওই সম্বন্ধ নেই?
কুমার আর কমল কোথায় গেল? বাঘার সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত, গুহার সামনেটা রক্তে ভেসে গেছে, এখানে অজানা মানুষের পায়ের দাগ, এসব দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে যে এখানকার মানুষরা হয় তাদের বন্দি, নয় হত্যা করেছে।
রামহরি আকুল কণ্ঠে বললে, বাবু, বাবু! নিশ্চয় কোনও রাক্ষুসে জানোয়ার এসে কুমার আর কমলবাবুকে খেয়ে ফেলেছে।
বিমল এতদূর অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে, সে আর কোনও কথাই কইতে পারলে না, দুই হাতে মুখ ঢেকে বালির উপরে হেঁটে হয়ে বসে রইল।
আমি তার হাত ধরে নাড়া দিয়ে বললুম, বিমল, ওঠো, ওঠো!
বিমল মুখ তুলে হতাশ ভাবে বললে, উঠে কী করব বিনয়বাবু?
আমি বললুম, কুমার আর কমলকে খুঁজতে যেতে হবে যে!
অশ্রুপূর্ণনেত্রে বিমল বললে, আর কি তারা বেঁচে আছে!
আমি বললুম, আমার বিশ্বাস তারা মরেনি, এই বালির ওপরে যাদের পায়ের দাগ। রয়েছে, তারাই তাদের ধরে নিয়ে গেছে।
শুনেই বিমলের হতাশ ভাব চলে গেল। একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে সে বললে, এ কথা তো এতক্ষণ আমার মনে হয়নি! চলুন তবে! তারা যদি বন্দি হয়ে থাকে তাহলে তাদের উদ্ধার করতেই হবে!
আমি বললুম, দাঁড়াও বিমল এতটা ব্যস্ত হলে চলবে কেন? আগে আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে নি?
বিমল বললে, বন্ধুরা শত্রুর হাতে এখন আমরা পেটের ভাবনা ভাবব!
আমি বললুম, না ভাবলে তো উপায় নেই ভাই! কাল থেকে অনাহারে আছি, আজ কিছু না খেলে শরীর আমাদের ভার বইতে রাজি হবে কেন? কুমার আর কমলের খোঁজে পথে পথে এখন কদিন কাটবে কে বলতে পারে?
অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে বিমল আমাদের সঙ্গে আবার গুহার ভিতরে ফিরে এল। রামহরি সেকেলে ডানাহীন হাঁসগুলোর পালক ছাড়িয়ে তাড়াতাড়ি উনুনে আগুন দিলে…।
যেমন তেমন করে খানিকটা সিদ্ধ মাংস খেয়ে এবং পথে খাবার জন্যে আর খানিকটা মাংস সঙ্গে নিয়ে আমরা তিনজনে যখন আবার বেরিয়ে পড়লুমসূর্য তখন পশ্চিমে নামতে শুরু করেছে।
