সর্দার হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে-ঘুরে দাগগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। লক্ষ করলুম, তার মুখে-চোখে বিস্ময়ের আভাস ফুটে উঠেছে! সর্দারের পরীক্ষা যখন শেষ হল তার মুখ তখন গম্ভীর।
কী সর্দার, ব্যাপার কী?
সর্দার হতাশভাবে কেবল দুবার মাথা নাড়লে।
কিছু বুঝতে পারলে না? কিন্তু আমি বলছি, এগুলো মানুষের পায়ের দাগ। আর এ দাগগুলো যার পায়ের, সে নিশ্চয়ই কুলিদের দলে আছে। আমরা শেষ গ্রাম থেকে বিশ মাইল দূরে এসে পড়েছি। রাত্রে এই বিপজ্জনক বন পার হয়ে সেখান থেকে কোনও চোর আসতে পারে না, এ কথা তুমি মানো তো?
হ্যাঁ হুজুর, মানি।
তাহলে আমাদেরই কোনও কুলি এই চুরি করেছে।
সর্দার আবার প্রবল ভাবে মাথা নাড়া দিয়ে বললে, না হুজুর, আমাদের কোনও কুলিই এ চুরি করেনি।
সর্দার, তাহলে তুমি কী বলতে চাও শুনি?
হুজুর, আমি যা বলতে চাই, তা শুনলে হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না!
কেন?
আপনি ভাববেন আমি অসম্ভব মিথ্যা কথা বলছি।
আচ্ছা, তোমার কী বিশ্বাস বলো। আমি বিশ্বাস করব।
হুজুর, কাল রাতে আপনার তাঁবুতে যে চুরি করতে ঢুকেছিল, সে পুরুষমানুষ নয়।
তার মানে?
অন্তত এই পায়ের দাগগুলো যে স্ত্রীলোকের, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই!
সর্দার, সর্দার! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? যে বন গ্রাম থেকে বিশ মাইল দুরে, যে বনে গরিলা, হাতি, বুনোমোষ আর বাঘের বাস, সেখানে রাত্রে চুরি করতে আসবে স্ত্রীলোক?
সর্দার দৃঢ়ভাবে বললে, ওসব কথা আমিও ভেবে দেখেছি। কিন্তু এগুলো স্ত্রীলোকের পায়ের দাগ।
আমি স্তম্ভিত ও স্তব্ধ হয়ে রইলুম। তারপর সর্দার চলে যাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি তাকে ডেকে বললুম, শোনো। এসব কথা যেন কুলিদের কাছে জানিও না!
সর্দার অল্প হেসে বললে, আপনি মানা না করলেও আমি বলতুম না। এ গল্প শুনলে। তারা পেতনির ভয়ে এখনই আমাদের ছেড়ে পালিয়ে যাবে!
সর্দারের কথা নিয়ে যতই নাড়াচাড়া করি, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না। ভয়াবহ কিভু–অরণ্য, যার চতুঃসীমানায় লোকালয় নেই, যার ভিতর দিয়ে দিনের বেলায় পথিকরা দলবদ্ধ ও সশস্ত্র হয়েও সভয়ে পথ চলে, মানুষের জীবন যেখানে প্রতিমুহূর্তেই হিংস্র জন্তুর দুঃস্বপ্ন দেখে, সেখানে গভীর রাত্রে একাকিনী স্ত্রীলোক,–এ কল্পনা হাস্যকর। সর্দার নিশ্চয়ই ভুল করেছে।
দুপুরবেলায় একটা বন্দুক নিয়ে বাইরে গেলুম। কাছাকাছি যদি কোথাও দুই একটা শিকারের পাখি পাওয়া যায় তাহলে আজকের নৈশ আহারটা সুসম্পন্ন হবে, এই ভেবে নদীর ধার ধরে গাছে গাছে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখে অগ্রসর হলুম।
নদীর জলধারায় ঝরে ঝরে পড়ছে উজ্জ্বল রৌদ্রধারা এবং তার সঙ্গে বাতাসে বাতাসে বয়ে যাচ্ছে শত-শত পাখির গানের আনন্দ-ধারা! চারদিকের জীবন্ত স্নিগ্ধতাটুকু আমার এত ভালো লাগল যে, জীবহিংসা করতে আর সাধ হল না। বড় জাতের একরকম বনপায়রা আমায় দেখে কাছের গাছ থেকে দূরের গাছে উড়ে গিয়ে বসল, কিন্তু আমি তাকে অনুসরণ করলুম না। মন যেন আমাকে ডাক দিয়ে বললে,–আজকের এই উত্তপ্ত সূর্যালোকের আনন্দ সভায় তোমাদের যতটুকু বাঁচবার অধিকার, ওরও অধিকার তার চেয়ে একটুও কম নয়!
খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার তাঁবুর দিকে ফিরলুম।
হঠাৎ নদীর তীরে কী একটা চকচকে জিনিস আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, সূর্যালোক তার ওপরে পড়ে জ্বলে-জ্বলে উঠছে!
কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দেখি, আমার বিস্কুটের টিনটা সেখানে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে।
তাড়াতাড়ি সেটা তুলে নিলুম! টিন একেবারে খালি!
নদীতীরের বালির ওপরে মানুষের পায়ের অনেকগুলো দাগ!
যে আমার টিন চুরি করেছে, সে লোকালয়ে ফিরে যায়নি, বৃষ্টিসিক্ত গভীর রাত্রে, এই ভীতিসঙ্কুল বন্য নদীর তীরে বসে জমাট অন্ধকারে নির্ভয়ে নিশ্চিন্ত প্রাণে উদরের ক্ষুধানিবৃত্তি করেছে। কে সে? সে যে আমার কোনও কুলি নয় স্ত্রীলোক নয়, এটা ঠিক! কিন্তু পুরুষ হলেও সে কী রকম পুরুষ? তার কি কোনও মাথা গোঁজবার আশ্রয়ও নেই? তার মনে। কি মানুষের স্বাভাবিক ভয়ও নেই?
এমনি সব কথা ভাবতে-ভাবতে ছাউনিতে ফিরে এসে দেখি, সর্দার একটা গাছতলায় চুপ করে বসে আছে।
তাকে আমার নতুন আবিষ্কারের কথা জানালুম। শুনে তার মুখে নতুন কোনও বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল না। সে আবার খালি হতাশ ভাবে মাথা নাড়লে।
তার ব্যবহার রহস্যজনক। যেন সে কোনও গুপ্তকথা জানতে পেরেছে, কিন্তু আমার কাছে প্রকাশ করতে চায় না!
আমিও জানবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করলুম না। তার মনে একটা ভ্রমাত্মক বিশ্বাস জন্মেছে, হয়তো আবার একটা কোনও উদ্ভট কথা বলে বসবে।
কেবল বললুম, সর্দার, এই অদ্ভুত চোরকে ধরতে হবেই। আজ রাত্রে আমি ঘুমোব না, তুমি জেগে সতর্ক হয়ে থাকতে পারবে কি?
সর্দার বললে, আমি স্থির করেছি, আজ রাত্রে এই গাছের ওপরে উঠে পাহারা দেব।
আমি তাকে ধন্যবাদ দিলুম।
সে রাত্রে আহারদির পর আলো নিবিয়ে আমি শুয়ে পড়লুম। কিন্তু ঘুমোলুম না। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলুম, আজ রাত্রে মেঘ ও বৃষ্টি নেই, চাঁদের আলো আছে,–আর বাইরের গাছের টঙে জেগে আছে সতর্ক সর্দার। চোরকে সে অনায়াসেই দেখতে পাবে! আর বিছানায় শুয়ে জেগে আছি আমি–চোরকে অনায়াসেই ধরতে পারব!
বাইরে নিশুত রাতের বুকে দুলছে আর দুলছে একতালে ঝিল্লির ঝঙ্কার! মাঝে মাঝে দূর বন থেকে ভেসে-ভেসে আসছে হস্তির চিৎকার! আমার তাঁবুর ওপর থেকেও দু-তিন বার একটা পঁাচা ডাক দিয়ে যেন বলে বলে গেল হুঁশিয়ার, হুশিয়ার!
