বিমল বললে, আপনার কথাই ঠিক! কালকে আমাদের কে আক্রমণ করেছিল, তা আর দেখবার দরকার নেই, এ সর্বনেশে বন থেকে এখন প্রাণ নিয়ে বেরুতে পারলে বাঁচি!
পূর্বদিকে বনের মাথায় সূর্যকে দেখা গেল, প্রদীপ্ত কাঁচা সোনার অপূর্ব মুকুটের মতো! কিন্তু এখানে বনের পাখি তার আবাহন-গান গাইলে না। সূর্য শুধু নিরানন্দ নীরবতার মাঝে পৃথিবীর বুকে সোনার হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
আমরা এসেছি পশ্চিম দিক থেকে, তাই সেই দিকেই যাত্রা শুরু করে দিলুম।
.
নতুন বিপদের সূচনা
ক্ষুধার জন্যে যত না হোক, তৃষ্ণার তাড়নায় চলতে-চলতে আমাদের প্রাণ হয়ে উঠল ওষ্ঠাগত। জলের অভাব যে কি ভয়ানক অভাব, জীবনে আজ প্রথম তা কল্পনা করতে পারলুম। চলতে চলতে প্রতি পদই মনে হতে লাগল, এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে যায়, এই বুঝি মাথা ঘুরে মাটিতে পড়ে গেলুম। মাথার মধ্যে যেন আগুনের আংরা জ্বলছে, মুখের ভিতর থেকে জিভটা বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, আর মন চাইছে পথ চলা বন্ধ করে সেইখানেই শুয়ে জীবনের সব লীলা সাঙ্গ করতে।
সেই ভোর থেকে হাঁটছি আর হাঁটছি সূর্য এখন মাঝ আকাশে, তবু এই অভিশপ্ত অরণ্য যেন আর আমাদের মুক্তি দিতে চায় না। এ অরণ্য যেন অনন্ত–এ অরণ্য যেন এক রাত্রের মধ্যে সারা পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে।
রামহরি ঠিক মাতালের মতো টলতে টলতে চলেছে, তার চোখ দুটো ঠিক পাগলের মতো হয়ে উঠেছে, আমারও প্রায় সেই অবস্থা কিন্তু ধন্য বটে বিমল ছেলেটি, সে-ও যে ভিতরে ভিতরে আমাদেরই মতো কষ্ট পাচ্ছে তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই, কিন্তু তার মুখে-চোখে বা ভাবভঙ্গিতে সেকষ্টের কোনও লক্ষণই ফুটে ওঠেনি, ধীর প্রশান্তভাবে হাসিমুখে সে আমাদের আগে-আগে অগ্রসর হচ্ছে।
শেষটা রামহরি একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ল।
বিমল বললে, ও কী রামহরি বসলে কেন?
রামহরি কাতর ভাবে বললে, খোকাবাবু, জল না খেলে আমি আর চলতে পারব না।
আর একটু পরেই জল পাব, ওঠো রামহরি, ওঠো!
না খোকাবাবু, না রাজ্যের সব জল শুকিয়ে গেছে, জল আর পাব না। জল না পাই, আমাকে শান্তিতে মরতে দাও। তোমরা চলে যাও, আমার জন্যে ভেব না।
বিমল আর কিছু বললে না, হেঁট হয়ে রামহরিকে ঠিক শিশুর মতো নিজের কাঁধের উপরে তুলে নিয়ে অনায়াসেই আবার হাঁটতে শুরু করলে। আমি তো দেখেশুনে অবাক। বলবান বলে আমার নিজের যথেষ্ট খ্যাতি আছে, কিন্তু আজ দু-দিনের অনাহার, পথশ্রম ও তৃষ্ণার তাড়না সহ্য করবার পর রামহরির মতো একজন বৃহৎ লোককে ঘাড়ে করে পথ চলার শক্তি যে কতখানি বল ও বিক্রম ও কষ্টসহিষ্ণুতার কাজ, তা বুঝতে পেরে মনে মনে বিমলকে আমি বারবার ধন্যবাদ দিতে লাগলুম।
তারপর যখন নিরাশার চরম সীমায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি এবং প্রাণের আশা ছেড়ে আমিও রামহরির মতো শুয়ে পড়ব বলে মনে করছি তখন আচম্বিতে বনের ফাঁকে জেগে উঠল, ও কী কল্পনাতীত দৃশ্য!
চোখের সামনে স্পষ্ট দেখলুম, বিশাল হ্রদের নীল জল অদূরেই টলটল ঢলঢল করছে– সূর্যকিরণে বিদ্যুতের মতো চমকে-চমকে উঠছে।
কিন্তু এ চোখের ভ্রম নয় তো? সত্যিই কি বন শেষ হয়েছে, আমরা আবার হ্রদের তীরে এসে পড়েছি?
বিমলের হাত ছাড়িয়ে রামহরি মাটির উপর লাফিয়ে পড়ল, তারপর পাগলের মতো চাঁচাতে চাঁচাতে হ্রদের দিকে দৌড় দিলে, আমিও তার পিছনে-পিছনে ছুটতে লাগলুম–তারই মতো আনন্দে উদভ্রান্ত হয়ে।…আমরা তিনজন মিলে যতক্ষণ পারলুম প্রাণ ভরে জল পান করলুম। আহা, সে যে কি তৃপ্তি, কি আনন্দ, কেমন করে তা বর্ণনা করব? শেষটা পেটে যখন আর ধরল না, তখন আমরা বাধ্য হয়ে ক্ষান্ত হলুম।
রামহরি আহ্লাদে নাচতে নাচতে বললে, আঃ, আর আমার কোনও কষ্ট নেই, এখন আবার আমি একশো ক্রোশ হাঁটতে পারি।
আমারও সমস্ত শক্তি আবার ফিরে পেলুম।
বিমল ইতিমধ্যে গোটাকয়েক সেকেলে ডানাহীন হাঁস শিকার করে ফেললে, আমরা সাঁতার দিয়ে তাদের দেহগুলো জল থেকে ডাঙায় এনে তুললুম।
রামহরি মুখ চোকলাতে চোকলাতে বললে, খোকাবাবু, আমার আর দেরি সইবে না, চলো, চলো, তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে রান্না শুরু করে দি।
আমি বললুম, হ্যাঁ বিমল, আমাদের আর দেরি করা উচিত নয়, কুমার আর কমল এতক্ষণে আমাদের জন্যে ভেবে হয়তো আকুল হয়ে উঠেছে।
বিমল উঠে দাঁড়িয়ে বললে, হ্যাঁ, চলুন এইবার! আমরা তো বাসায় প্রায় এসে পড়েছি– ওই যে আমাদের পাহাড় দেখা যাচ্ছে!
সবাই আবার অগ্রসর হলুম। একবার জলপানের পরে আমাদের দেহে আবার নতুন শক্তির সঞ্চার হয়েছিল, তাই এবারে পথ চলতে কোনওই কষ্ট হল না। কিন্তু এ দ্বীপে বিপদ দেখছি পদে-পদে! আমরা যখন পাহাড়ের খুব কাছেই এসে পড়েছি মাথার উপরে তখন হঠাৎ শুনতে পেলুম এক বিশ্রী চিৎকার! উপরে চেয়ে দেখি দুটো হাড়কুৎসিত গরুড় পাখি চক্রাকারে ঘুরতে-ঘুরতে আমাদের দিকে নেমে আসছে!
তাদের উদ্দেশ্য যে ভালো নয়, তা বুঝতে আমাদের কিছুমাত্র বিলম্ব হল না। বিমলের বন্দুক তখনই গর্জন করে উঠল, সঙ্গে-সঙ্গে একটা পাখি গুলি খেয়ে মাটির উপর এসে পড়ল। পাখিটা সাংঘাতিকরূপে আহত হয়েছিল, কিন্তু সেই অবস্থাতেই করাতের মতো দাঁতওয়ালা চঞ্চ তুলে সে আমাদের আক্রমণ করতে এল। বিমল বন্দুকের কুঁদো দিয়ে প্রবল এক আঘাতে তার মাথাটা চূর্ণ করে দিলে। ততক্ষণে আমার বন্দুকের গুলিতে দ্বিতীয় পাখিটারও ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল।
