আমি বললুম, আমারও তাই মনে হল। কিন্তু বন্দুকের বিদ্যুতের মতো আলোতে আমি এক পলকের জন্যে যে জুলন্ত চোখ আর যে ধারাল দাঁতগুলো দেখতে পেয়েছি, তা তো মানুষের নয়! তার গায়ে যে জানোয়ারের মতো বড় বড় লোম ছিল তাও আমি জানতে পেরেছি, কিন্তু আর কিছু জানবার সময় আমি পাইনি–সে জীবটা এসেছে আর পালিয়েছে দুই সেকেন্ডের মধ্যেই।
সেই মুহূর্তের অরণ্যের অন্ধকার ভেদ করে আবার এক তীব্র আর্তস্বর জেগে উঠল। ঠিক যেন কোনও মানুষ মর্মভেদী যাতনায় চিৎকার–স্বরে ক্রন্দন করছে।
.
অরণ্যের গর্ভে
সেই আর্তনাদ! কিছুতেই আমরা তা ভুলতে পারলুম না, তার প্রতিধ্বনি যেন আরও ভীষণ হয়ে আমাদের বুকের ভিতর ঘুরে বেড়াতে লাগল।
এই সেকেলে জীবের রাজ্যে, অমন মানুষের মতো স্বরে কেঁদে উঠল কে? আমি এখানে একলা থাকলে ভাবতুম, এ আমার কানের ভ্রম। কিন্তু আমাদের তিন জনেরই তো শোনবার ভুল হতে পারে না। অথচ এ বনে মানুষ থাকা সম্ভব নয়, কারণ এই দ্বীপের কোথাও আজ পর্যন্ত আমরা মানুষের চিহ্নমাত্র দেখতে পাইনি।
অন্ধকারে অবাক হয়ে বসে বসে আমি ভাবতে লাগলুমআর ওদিকে বনের মধ্যে তেমনি নানা রকম অদ্ভুত শব্দ ক্রমাগত শোনা যেতে লাগল। ভয়ে আমরা কেউ আর কারুর সঙ্গে কথা পর্যন্ত কইতে সাহস করলুম না কি জানি, আবার যদি কোনও ভয়ানক জীব শুনতে পেয়ে আমাদের আক্রমণ করতে আসে!
বনের ভিতরে সেই সব অজানা শব্দ শুনে আমার মনে হতে লাগল যে, অন্ধকারে যেন আমাদের বিরুদ্ধে কারা ষড়যন্ত্র করছে। ধুপ-ধুপ, দুম-দুম, খসখস, মড়মড়, সোঁ-সো, সর-সর। শব্দগুলো যেন চারিদিক থেকে ক্রমাগত বলছে–আমরা তোমাদের হত্যা করব, আমরা তোমাদের হত্যা করব, আমরা তোমাদের হত্যা করব! নিবিড় অন্ধকারে দেহ ঢেকে চারিদিকে কারা যেন ওৎ পেতে বসে আছে, তাদের রক্তলোলুপ জ্বলন্ত দৃষ্টি আমরা যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে অনুভব করতে লাগলুম। মাঝে-মাঝে কাদের আনাগোনার পায়ের শব্দ শুনি আর মনে হয়। ওই ওরা এসে পড়ল–ওই ওরা এসে পড়ল।…ওঃ, রাত যেন আর পোয়াতেই চায় না।
আমরা যেন চির-অন্ধকারের কারাগারের মধ্যে আজীবনের জন্যে বন্দি হয়ে আছি আর চারিদিক থেকে শুধু সেই একই শব্দ শোনা যাচ্ছে–আমরা তোমাদের হত্যা করব, আমরা তোমাদের হত্যা করব, আমরা তোমাদের হত্যা করব।
আর একটা মারাত্মক বিপদ থেকে কোনও গতিকে বেঁচে গেলুম।…হঠাৎ কার মাটি কাঁপানো পায়ের শব্দ শুনলুম, তারপরেই মনে হল, এক জায়গায় অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। সেই জ্বলন্ত ঘনীভূত অন্ধকারের মধ্যে ঠিক বাতাবি লেবুর মতো বড় দুটো আগুনের ভঁটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে–মাটি থেকে অনেক অনেক উঁচুতে। নিশ্চয় সে দুটো কোনও অতিকায় জীবের চোখ। জীবটা যে কোন জাতের তা বোঝা গেল না বটে, তবে তার নিশ্বাসের হু-হু শব্দ আমরা স্পষ্ট শুনতে পেলুম। তার পরেই মড়মড় করে গাছ ভাঙার শব্দ হল এবং সঙ্গে-সঙ্গে সেই আগুনের আঁটা দুটো ও জুলন্ত অন্ধকারটা গভীরতর অন্ধকারের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। রোমাঞ্চিত দেহে একেবারে মাটির সঙ্গে গা। মিশিয়ে মড়ার মতো স্তব্ধ হয়ে আমরা শুয়ে রইলুম। আর চারিদিক থেকে যেন সেই একই শাসানি শুনতে লাগলুম-হত্যা, হত্যা আমরা তোমাদের হত্যা করব।…
দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কে আমরা যখন পাগলের মতো হয়ে উঠেছি, পূর্ব-আকাশ তখন উষার ভোরের প্রদীপ ধীরে-ধীরে জ্বলে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে অরণ্যের মধ্যে অন্ধকারের জীবদের আনাগোনার শব্দ আশ্চর্যরূপে থেমে গেল। আমরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে উঠে বসলুম।
বিমল বললে, কাল যে জীবটা আমাদের আক্রমণ করতে এসেছিল, এই দেখুন তার রক্তের দাগ। এতক্ষণে নিশ্চয় সে মরে গেছে। আসুন বিনয়বাবু, এইবারে দেখা যাক, সেটা কি জীব।
আমি আপত্তি করে বললুম, না, না, ক্ষুধাতৃষ্ণা আর পরিশ্রমে আমরা মরমর হয়ে পড়েছি, এখন কেবল বন থেকে বেরুবার চেষ্টা করা ছাড়া আর কোনওদিকেই যাওয়া উচিত নয়–কি জানি, আবার যদি কোনও নতুন বিপদে পড়ি!
বিমল আমার আপত্তি শুনলে না, সে মাটির উপর শুকনো রক্তের দাগ ধরে অগ্রসর হয়ে বললে, না বিনয়বাবু, মানুষের মতো কাঁদে কোন জীব, সেটা দেখতেই হবে। সে তো আর বেঁচে নেই, তবে আর কীসের ভয়!
বিমলের কথা শেষ হতে না হতেই বনের ভিতরে ভয়ানক এক গর্জন শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে বিমলও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
রামহরি বললে, এ যে বাঘের ডাক!
আবার সেই গর্জন–এবারে আরও কাছে! তার পরেই ভারী ভারী পায়ের শব্দ– যেন মস্তবড় একটা জীব দৌড়ে আসছে।
আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, সাবধান, বিমল সাবধান।
হাতির মতো প্রকাণ্ড একটা জানোয়ার বনের ভিতর থেকে তিরবেগে বেরিয়ে এল, তারপরেই চোখের নিমেষে পাশের জঙ্গলের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল! জীবটা হাতির মতো বড় বটে, কিন্তু দেখতে ঠিক ষাঁড়ের মত।
বিমল আর রামহরির মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন দেখে আমি বললুম, ও হচ্ছে সেকালের ষাঁড়।
বিমল বিস্ফারিত চোখে বললে, হাতির মতো বড়!
হ্যাঁ। হাজার দুই বছর আগেও রোমানরা ওইরকম ষাঁড় জার্মান দেশে দেখেছিল।
রামহরি বললে, কিন্তু ওই ষাঁড় কি বাঘের মতো ডাকে!
না, বাঘের ডাক শুনেই ষাঁড়টা পালিয়ে গেল। এ বনে সেকেলে বাঘ আছে। সেকেলে বাঘের গায়ে এখনকার বাঘের মতো দাগ নেই, আকারেও তারা অনেক বড়, আর তাদের মুখের উপর-চোয়ালে ছোরার মতো লম্বা দুটো দাঁত আছে। বিমল, এ বাঘের বিক্রম কীরকম বুঝছে তো! এতবড় একটা ষাঁড় তার ভয়ে প্রাণপণে পালিয়ে গেল, আমাদের এখনই এ বন ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।
