কিন্তু একটু পরেই তার অভিপ্রায় বেশ বোঝা গেল। সে তেমনি সন্তর্পণে বুকে হেঁটে বন থেকে বেরিয়ে মাঠের ভিতর গিয়ে পড়ল, তারপর ডাইনসরের দলের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে লাগল।
আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললুম, বিমল, এখনই আমরা সেকেলে বিয়োগান্ত নাটকের একটা আধুনিক অভিনয় দেখতে পাব। এই কুমির কাঙারু যাচ্ছে ওই ডাইনসরদের আক্রমণ। করতে!
বিমল আশ্চর্য স্বরে বললে, ডাইনসরদের আক্রমণ করতে! কিন্তু কুমির কাঙারু পারবে কেন? একে ডাইনসররা আকারে ওর চেয়ে দু-গুন বড়, তার ওপরে গুণতিতেও তারা নব্বইটার কম নয়!
আমি বললুম, বাঘের চেয়ে ঘোড়া বা জিরাফ তো ঢের বড় কিন্তু ঘোড়া বা জিরাফের দলে যদি বাঘ পড়ে, তাহলে তাদের কি অবস্থা হয় জানো তো? কুমির-কাঙারু মাংসাশী আর হিংস্র, নিরামিষভক্ত ডাইনসরের চেয়ে আকারে ছোট হলেও তার গায়ের জোরও ঢের বেশি।
রামহরি উৎসাহিত কণ্ঠে বললে, দেখুন, দেখুন!
চেয়ে দেখলুম কুমির কাঙারুটা তখন ডাইনসরদের খুব কাছে গিয়ে পড়েছে। হঠাৎ ডাইনসররাও তাকে দেখতে পেলে এবং পর মুহূর্তেই আর্তনাদে সারা বন কাঁপয়ে লাফাতে লাফাতে বেগে পিছতে লাগল। কুমির কাঙারুও ভীষণ এক গর্জন করে তাদের পশ্চাৎ অনুসরণ করলে এবং দেখতে-দেখতে একটা ডাইনসরকে ধরে ফেললে।
তারপর যে ভয়াবহ দৃশ্যের অভিনয় হল তা আর বর্ণনীয় নয়। মানুষের চোখ এমন দৃশ্য বোধহয় আর কখনও দেখেনি। ডাইনসরটা যদিও আকারে অনেক বড় তবু কুমির কাঙারুটা মস্ত এক লাফ মেরে বিষম বিক্রমে তার গলার তলাটা কামড়ে ধরে তাকে মাটির উপরে পেড়ে ফেললে। তাদের গর্জনে ও আর্তনাদে আমাদের কান যেন কালা হয়ে গেল, লাঙ্গুল আস্ফালনে এবং লাফালাফির চোটে চারদিকে রাশি রাশি ধুলো উড়তে লাগল ও পৃথিবীর বুক থরথর করে কাঁপতে লাগল,–এদিকে ওদিকে তিন-চারটে প্রকাণ্ড বৃক্ষ মাটির উপরে ভেঙে লুটিয়ে পড়ল। ঘণ্টাখানেক পরে সেই অদ্ভুত যুদ্ধ সমাপ্ত হল। তখন দেখা গেল, ডাইনসরের বিপুল দেহ মাঠের উপরে স্থির হয়ে পড়ে আছে এবং কুমির-কাঙারু পিছনের দুই পা ও ল্যাজের উপর ভর দিয়ে বসে হাঁ করে হাঁপাচ্ছে এবং তার মুখের দুই পাশ ও দেহ দিয়ে হু-হু করে রক্তের স্রোত ছুটছে। খানিক বিশ্রামের পর মাটির উপরে ল্যাজ আছড়াতে-আছড়াতে সে আকাশপানে মুখ তুলে কয়েকবার গগনভেদী জয়নাদ করলে, তারপর মৃত ডাইনসরের দেহটা ভক্ষণ করতে প্রবৃত্ত হল। সে এক বীভৎস দৃশ্য এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের ভীত চক্ষের সামনে সেই দৃশ্যের অভিনয় চলল!
সন্ধ্যার অন্ধকারে চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে গেল, আমরা কিন্তু তখনও বাইরে পা বাড়াতে সাহস করলুম না।
বিমল উদ্বিগ্ন স্বরে বললে, কী হবে বিনয়বাবু। খাবারের খোঁজে এসে এদিকে অনাহরে প্রাণ যে যায়!
আমি মনের দুশ্চিন্তা গোপন করে বললুম, কোনওই উপায় নেই! আজকের রাত এই বনের ভেতরে আমাদের কাটাতে হবে। এখন বন থেকে বেরুলেই মৃত্যু!
রামহরি বললে, কিন্তু কালও হয় তো আমরা পথ খুঁজে পাব না।
আমি বললুম, আমরা এসেছি পূর্বদিকে। কাল সূর্য উঠলে পর আমরা পশ্চিম দিকে অগ্রসর হব। তা হলে আমরা যে পথে এসেছি সে পথ না পেলেও খুব সম্ভব হ্রদের ধারে গিয়ে পড়তে পারব।
বনের ভিতরে রাত ঘনিয়ে এল, সঙ্গে সঙ্গে নানারকম বিভীষিকার সূত্রপাত হল! এতক্ষণ যে বিশাল অরণ্যে কেবল পত্রমর্মর ছাড়া আর কোনও শব্দই শোনা যাচ্ছিল না, এখন তার চারিদিকেই নানারকম অদ্ভুত আওয়াজ শোনা যেতে লাগল! নিবিড় অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না; শোনা যাচ্ছে খালি শব্দ! গাছের উপরে শব্দ, জঙ্গলের ভিতরে শব্দ, আমাদের আশেপাশে শব্দ! কোনও শব্দ গাছের উপরে ওঠানামা করছে, কোনও শব্দ চারিদিকে আনাগোনা করছে, কোনও শব্দ যেন এক জায়গাতেই স্থির করে দাঁড়িয়ে আছে। বেশ বুঝতে পারলুম আমাদের খুব কাছ দিয়েই অনেকগুলো অতিকায় জীব আসা যাওয়া করছে, কারণ তাদের পায়ের চাপে পৃথিবীর মাটি থেকে থেকে কেঁপে উঠছে! সেইসব জীবের আকার যে কত ভয়ানক, তা ভগবানই জানেন! আমরা তিনজনে আতঙ্কে ও ক্ষুধাতৃষ্ণায় প্রায় মরমর হয়ে চুপ করে সেইখানেই বসে রইলুম জড় পাষাণের মতো!
হঠাৎ রামহরি চেঁচিয়ে উঠল এবং পরমুহূর্তেই কে এক ধাক্কা মেরে আমাকে মাটির উপরে ফেলে দিলে এবং আমি উঠে বসবার আগেই একটা প্রকাণ্ড ভারী দেহ আমার বুকের উপর চেপে বসল! কে যে আমাকে এমন অতর্কিতে আক্রমণ করলে, অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলুম না, কিন্তু তার দেহের চাপে আমার দেহের হাড়গুলো যেন ভেঙে যাওয়ার মতো হল। সৌভাগ্যক্রমে বন্দুকটা তখন আমার হাতেই ছিল, কোনওরকমে বন্দুকের নলটা আক্রমণকারীর দেহে লাগিয়ে এক হাতেই আমি ঘোড়া টিপে দিলুম, সঙ্গে সঙ্গে বিকট এক আর্তনাদ করে সে জীবটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে মাটির উপরে পড়ে গেল এবং তারপরেই পায়ের শব্দ শুনে বুঝলুম, সে বেগে পলায়ন করছে!
হঠাৎ রামহরি আর্তনাদ করে উঠল।
বিমল বললে, কী হল, কী হল রামহরি?
রামহরি বললে, কে আমার পা মাড়িয়ে দিয়ে গেল।
আমি উঠে বসে বললুম, কি একটা জানোয়ার আমার বুকের উপরে চেপে বসেছিল, কিন্তু আমার বন্দুকের গুলি খেয়ে সে পালিয়ে গেছে।
বিমল বললে, কিন্তু এখনই যে বিরাট আর্তনাদ শুনলুম সে তো জানোয়ারের চিৎকার নয় সে যে মানুষের চিৎকার!
