সব আগে বাঘা, তারপর বিমল, তারপর আমি আর রামহরি–এইভাবে আমরা শুকরটার পিছনে ছুটতে লাগলুম। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই শূকরটা বনের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রামহরি চেঁচিয়ে বললে, বনের ভেতরে ঢুকো না থোকাবাবু, বনের ভেতরে ঢুকো না।
কিন্তু বিমলের মাথায় তখন শিকারির গোঁ চেপেছে স্যিদিব্য জ্ঞান হারিয়ে সেই নিবিড় অরণ্যের মধ্যে সে প্রবেশ করলে। কাজেই তার পিছনে যাওয়া ছাড়া আমাদেরও আর উপায়ান্তর রইল না।
বন যখন ক্ৰমে অত্যন্ত ঘন হয়ে উঠল, তখন আমিও বলতে বাধ্য হলুম, বিমল আর নয়, এইবারে আমাদের ফেরা উচিত।
বিমল বললে, এই যে শুয়োরের রক্তের দাগ এখনও দেখা যাচ্ছে।
এমনি করে ঘণ্টা দুয়েক ছুটাছুটির পর রক্তের দাগও আর পাওয়া গেল না। বিমল হতাশ ভাবে একটা গাছের তলায় বসে পড়ল। আমরাও বিষম হাঁপিয়ে পড়েছিলুম, সেখানেই এক-একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বিশ্রাম করতে লাগলুম।
প্রায় আধ ঘণ্টা বিশ্রামের পর আমি দাঁড়িয়ে উঠে বললুম, চলো, এইবারে ফেরা যাক।
বিমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, কাজেই।
খানিকদূর অগ্রসর হয়ে বুঝলুম, আমরা ভুল পথ ধরে চলেছি। সেদিকে থেকে ফিরে এসে আবার অন্য পথ ধরলুম, কিন্তু তবু বন থেকে বেরুবার পথ খুঁজে পেলুম না।
তখন বেলা দুপুর হবে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে উপরে নীচে, চারপাশে এমন বিষম জঙ্গল আর গাছপালা যে, দুপুরের সূর্যালোকও সে বনের ভিতরে ঢুকতে সাহস করেনি!
আমি দমে গিয়ে বললুম, বিমল আমরা পথ হারিয়েছি।
বিমল বললে, পথ আমাদের খুঁজে বার করতেই হবে। এইদিকে আসুন।
বিমলের পিছনে পিছনে আবার চললুম। কিন্তু মিনিট কয়েক পরেই হঠাৎ চমকে বিমল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি শুধোলুম, কী হল বিমল, হঠাৎ দাঁড়ালে কেন?
কোনও জবাব না দিয়ে, বিমল শুধু হাত তুলে ইশারায় বললে, চুপ।
আমি পা টিপে এগিয়ে গিয়ে যা দেখলুম, তাতে আমার পাদুটো যেন অসাড় হয়ে মাটির ভিতরে বসে গেল! তেমন অভাবিত দৃশ্য জীবনে আর কখনও আমি দেখিনি!
পথের পাশেই জঙ্গলের ভিতর থেকে খানিকটা ভোলা জমি দেখা যাচ্ছে, সেই জমির ভিতরে দলে দলে ভীষণ দর্শন জীব বিচরণ করছে তাদের অধিকাংশই মাথায় প্রায় ষাট সত্তর ফুট–অর্থাৎ তালগাছের সমান উঁচু।
সেদিন যে কুমির কাঙারু আমাদের তাড়া করেছিল, এ জানোয়ারগুলোকে দেখতে প্রায় তারই মতো; তফাত খালি এই যে, এগুলো লম্বা চওড়ায় তার চেয়েও প্রায় দুগুন বড়।
আমি তাড়াতাড়ি গুণে দেখলুম, দলের ভিতরে প্রায় নব্বইটা জানোয়ার রয়েছে। কোন কোনটা ল্যাজ ও পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, মস্ত উঁচু গাছের আগডাল সামনের দুই পা বা হাত দিয়ে ভেঙে নিয়ে চর্বণ করছে। কোনও কোনওটা কাঙারুর মতো লাফিয়ে এদিকে ওদিকে যাচ্ছে আসছে। আবার কোন কোনওটা চুপ করে বসে আছে। কতকগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট জীব পরস্পরের সঙ্গে খেলা করছে নিশ্চয়ই সেগুলো বাচ্চা। কিন্তু বাচ্চা হলেও মাথায় তারা প্রায় হাতির মতো উঁচু।
আমি চুপিচুপি বললুম, বিমল, এগুলো ডাইনসর।
বিমল বললে, বন থেকে বেরুতে গেলে এদের সমুখ দিয়ে যেতে হয়, এখন উপায়
যতক্ষণ না এরা বিদায় হয়, ততক্ষণ আমাদের বনের ভেতরেই বসে থাকতে হবে। তা ছাড়া আর কোনও উপায় তো দেখি না।
বাঘা এতক্ষণ ভয়ে বোবা হয়ে পেটের তলায় ল্যাজ গুটিয়ে জীবগুলোকে দেখছিল– হঠাৎ বনের ভিতর দিকে ফিরে গোঁ গোঁ করে উঠল। আমরাও পিছন ফিরে দেখলুম বনের অন্ধকারের ভিতর থেকে বড় বড় গাছ দুলিয়ে আর একটা প্রকাণ্ড কি জানোয়ার আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
রামহরি মড়ার মতো ফ্যাকাশে মুখে বললে, খোকাবাবু, এবার আর আমাদের রক্ষা নেই।
সত্য কথা বনের ভিতরে আর বাইরে দু-দিকেই সাক্ষাৎ মৃত্যু আমাদের চোখের সামনে বিরাজ করছে, পালাবার কোনও পথই আর ভোলা নেই। এবারে বন্দুকের সাহায্যেও আত্মরক্ষা। করতে পারব না, কারণ বন্দুকের শব্দে সমস্ত জীবগুলোই খেপে গিয়ে একসঙ্গে আমাদের আক্রমণ করতে পারে।
হতাশ হয়ে মরণের অপেক্ষায় আমরা তিনজনে দাঁড়িয়ে রইলুম পাথরের মূর্তির মতো।
.
অরণ্যের বিভীষিকা
বনের ভিতর থেকে যে শব্দটা আসছিল, হঠাৎ তা থেমে গেল। তারপর খানিকক্ষণ আর কোনও সাড়া নেই।
আমরা তখনও তেমনি আড়ষ্ট হয়েই দাঁড়িয়ে রইলুম প্রাণের আশা ছেড়ে দিয়ে।
রামহরি হঠাৎ আমার গা টিপলে। তার দিকে ফিরতেই সে বনের উপর পানে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে।
মাথা তুলে যা দেখলুম, তাতে আমার দেহের রক্ত যেন জল হয়ে গেল।
আমাদের কাছ থেকে মাত্র হাত-পনেরো তফাতেই বনের ফাঁকে একখানা ভয়ঙ্কর বিশ্রী এবং প্রকাণ্ড মুখ জেগে আছে।
আমরা তিনজনেই আস্তে আস্তে সেইখানে গুঁড়ি মেরে বসে পড়লুম।
বিমল চুপিচুপি বললে, আবার সেই কুমির কাঙারু।
রামহরি বললে, কিন্তু ও আমাদের দিকে তো তাকিয়ে নেই।
হ্যাঁ, সে তাকিয়ে আছে বনের বাইরের দিকে।
বিমল বললে, ডাইনসরের দিকে চেয়ে আছে আমাদের দেখতে পায়নি।
ডাইনসরগুলো তখনও নিশ্চিন্ত মনে মাঠের ভিতরে বিচরণ করছিল।
সেই ভীষণ মুখখানা আবার গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু তারপরেই দেখলুম, তার বিরাট দেহ গুঁড়ি মেরে জঙ্গলের ভিতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।
কী যে তার অভিপ্রায় কিছুই বুঝতে না পেরে মনে-মনে আমরা ভগবানকে ডাকতে লাগলুম।
