যা হোক, প্রায় দিন পনেরো ভুগে কুমার সে যাত্রা প্রাণে-প্রাণে বেঁচে গেল, আমরাও আস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।
.
ডাইনসরের পাল
গুহার বাইরে একখানা পাথরের উপরে আমি আর বিমল চুপ করে বসেছিলুম।
সন্ধ্যা হয় হয়। পশ্চিমের মেঘে মেঘে থরে থরে আবির সাজিয়ে সূর্যদেব আজকের মতো ছুটি নিয়েছেন এবং সেই রঙিন মেঘগুলির ছায়া সমুদ্রের নীলপটের উপরে দেখাচ্ছিল যেন ঠিক জলছবির মতো।
চারিদিকের স্তব্ধতার ভিতরে আমার মন আজ কেমন কেমন করতে লাগল। কোথায় আমাদের শ্যামলা বাংলাদেশ, আর কোথায় আমরা পড়ে আছি। এমন শান্ত সন্ধ্যার সময়ে বাংলাদেশের পল্লিতে-পল্লিতে কত শঙ্খের সাড়া জেগে উঠেছে, বধূরা তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করছে, ছেলের দল ঠাকুরঘরে ভিড় করে আরতির কঁসর বাজাবার জন্যে পরস্পরের সঙ্গে কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিয়েছে!
এমন সময়ে বিমল হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে, বিনয়বাবু একটা কথা ভেবে দেখেছেন কি?
আমার চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ল। মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, কি বিমল?
কাছিমের ডিম আর মাংস দুই-ই ফুরিয়ে গেছে। এবার কি খেয়ে আমরা বাঁচব?
আবার কাছিম ধরতে হবে।
বিমল খানিকক্ষণ পূর্বদিকে তাকিয়ে রইল। সেখানকার নিবিড় অরণ্য তখনও অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছিল।
বিমল আঙুল দিয়ে সেই দিকটা দেখিয়ে বললে, তার চেয়ে ওই দিকে চলুন।
কেন?
ওখানে কোনও নতুন শিকার মেলে কিনা দেখা যাক। রোজ রোজ কাছিমের মাংস আর ভালো লাগে না। সেদিন পাহাড়ে উঠে দেখেছিলেন তো, ওই বনের পাশে মস্ত একটা হ্রদ আছে? ওই হ্রদের আশেপাশে নিশ্চয়ই নতুন কোনও শিকারের সন্ধান পাওয়া যাবে।
সঙ্গে সঙ্গে নতুন কোনও বিপদেরও সন্ধান মিলতে পারে!
বিনয়বাবু, বিপদ এ-দ্বীপের কোথায় নেই? কাছিম ধরতে গেলেও তো আবার সাগর দানবের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ, এ-দ্বীপের কোথায় কি আছে না আছে, সেটা আমাদের জেনে নেওয়া দরকার। নইলে এখানে আমাদের বেঁচে থাকা সহজ হবে না!
বিমলের কথা যুক্তিসঙ্গত বটে! কাজেই আমি সায় দিয়ে বললুম, আচ্ছা বিমল, তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি!
পরদিন সূর্য ওঠবার আগেই আমি, বিমল আর রামহরি গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়লুম। কুমার তখনও ভালো করে সেরে ওঠেনি বলে তাকে কমলের তত্ত্বাবধানে গুহাতেই রেখে গেলুম। বাঘা আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই চলল। কুমারের বন্দুকটা নিলুম আমি।
সমুদ্রের জলে স্নান করে ভোরের ঠান্ডা হাওয়া সেই নিস্তব্ধ মাঠের ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, সে হাওয়া আমার বড়ই মিষ্টি লাগল। খানিক পরেই সুদূরের সবুজ বনের মাথায় স্বর্গীয় মুকুটের মতো সূর্যের মুখ জেগে উঠল।
রামহরি বললে, খোকাবাবু, তুমি কি আবার ওই মায়নামতীর মায়াকাননে যেতে চাও?
বিমল হেসে বললে, যদি যাই, তাহলে কি হবে রামহরি?
রামহরি মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, এবারে ওখানে গেলে তুমি আর প্রাণে বাঁচবে না।
কেন রামহরি, তুমি থাকতে আমাকে প্রাণে মারে কে?
আমি বেঁচে থাকলে তবে তো তোমাকে বাঁচাব? ও বনে ঢুকলে আমরা কেউ আর জ্যান্ত ফিরব না।
ভয় নেই রামহরি আজ আমরা বনের ভেতরে আর ঢুকব না। বনের পাশে একটা হ্রদ আছে, আমরা সেইখানেই যাচ্ছি।
এমনি নানা কথা কইতে খানিক দূর এগিয়ে যেতেই দেখলুম হ্রদের জল সূর্যের কিরণে ইস্পাতের মতো চকচক করে উঠছে!
আর কিছু দূর অগ্রসর হয়েই বুঝলুম, সেই হ্রদের আকার কি বিপুল! তার এপার থেকে ওপারের বিস্তার অন্তত কয়েক মাইলের কম হবে না। তার জলের ভিতরে মাঝে মাঝে কতকগুলো ছোট-বড় পাহাড় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেই পাহাড়গুলোর উপরে সাদা সাদা পাখির মতো কি যেন ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে আর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে।
তারপর আমরা যখন একেবারে হ্রদের ধারে গিয়ে পড়লুম তখন দেখা গেল, সেগুলো হাঁস ছাড়া আর কিছুই নয়!
বিমল আশ্চর্য হয়ে বললে, কিন্তু এ কি রকম হাঁস? এদের একটারও যে ডানা নেই।
আমি বললুম, বিমল, এ-দ্বীপের কোনও জীব দেখেই তুমি আর আশ্চর্য হোয়ো না! কারণ তোমাকে আগেই বলেছি যে এ হচ্ছে সেকেলে জীবের রাজ্য।
সেকেলে হাঁসের কি ডানা ছিল না?
না। দরকার হয়নি বলে সেকেলে হাঁসের ডানা গজায়নি। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মই হচ্ছে এই, দরকার না থাকলে কোনও কিছুই সৃষ্টি হয় না। বিশেষ, প্রকৃতির পরীক্ষা কার্য তখনও ভালো করে জমে উঠেনি, কোনও জীবের কি আবশ্যক আর কি অনাবশ্যক প্রকৃতি তাও তখনও তা নিশ্চিতরূপে বুঝতে পারেনি, তাই সেকেলে জীবজন্তুদের দেহে অনেক বাহুল্য, আবার অনেক অভাব আর অপূর্ণতাও থেকে গিয়েছিল। এই, মানুষের কথা ধরো না কেন। সেকেলে মানুষদের মস্তিষ্ক, চোখ, মুখ, নাক, দাঁত, ঘাড়, বুক, হাত, পা–কিছুই একেলে মানুষদের মতো ছিল না, সেকালে–
হঠাৎ আমার কথায় বাধা দিয়ে বাঘার গর্জনের সঙ্গে রামহরি চেঁচিয়ে উঠল–ও কি
ফিরে দেখি, খানিক তফাতে মহিষের চেয়েও উঁচু একটা জীব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের লক্ষ করছে।
আমি বলে উঠলুম–এন্টেলোডন্ট, এন্টেলোডন্ট!
বিমল বললে, এন্টেলোড়ন্ট! সে আবার কি?
সেকেলে দানব-শূকর!
বিমল তখনই বন্দুক ছুড়লে এবং পর মুহূর্তেই শূকরটা মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ল।
আমরা সবাই তার দিকে দৌড়ে গেলুম। কিন্তু শূকরটা মরেনি, আহত হয়েছিল মাত্র। কারণ আমরা তার কাছে যাওয়ার আগেই সে আবার দাঁড়িয়ে উঠে তাড়াতাড়ি সামনের জঙ্গলের দিকে ছুটল।
