হঠাৎ তারাও আমাদের দেখতে পেলে। বিশ্রী এক চিৎকার করে তারা তখনই ডানা ছড়িয়ে উড়তে শুরু করলে। তাদের দুই ডানার বিস্তার অন্তত পনেরো হাতের কম হবে না– আমার মনে হতে লাগল, যেন এক-একটা চতুষ্পদ প্রকাণ্ড জন্তু চার পায়ে ডানা বেঁধে শূন্যে উড়ছে। তাদের দীর্ঘ চঞ্চর ভিতর থেকে ধারালো ও বড় বড় দাঁতের সারিও আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলুম।
রামহরি বলে উঠল, এ কি গরুড় পাখি?
রামহরির নাম দেওয়ার শক্তি আছে বটে! এই কিম্ভুতকিমাকার উড়ন্ত জীবগুলোকে সত্য সত্যই অনেকটা গরুড়ের মতোই দেখাচ্ছিল।
প্রথমটা তারা আমাদের মাথার উপর চক্র দিয়ে একবার ঘুরে গেল,–তারপর হঠাৎ তাদের একটা তিরের মতো নীচের দিকে ঝাঁপ দিলে।
আমরা সাবধান হওয়ার আগেই সে হুস করে বিমলের ঘাড়ের উপরে এসে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে তার প্রকাণ্ড ডানা ও দেহের ধাক্কায় বিমল পাহাড়ের একদিকে ঠিকরে চিত। হয়ে পড়ে গেল।
কাছেই কুমার ছিল, সে তার বন্দুকের কুঁদো দিয়ে সেই জীবটার গায়ের উপরে এক ঘা বসিয়ে দিলে। জন্তুটা কর্কশ চিৎকারে চারিদিক কাঁপয়ে সেই মুহূর্তে ফিরে তাকে আক্রমণ করলে, কুমার আবার তাকে মারবার জন্যে বন্দুক তুললে, সে কিন্তু তার আগেই কুমারের একখানা হাত কামড়ে ধরলে এবং চোখের পলক না ফেলতেই কুমারকে মাটি থেকে টেনে তুলে শূন্যের দিকে উঠল।
এত শীঘ্র ব্যাপারটা ঘটল যে, আমরা সাহায্য করবার জন্যে একখানা হাত পর্যন্ত তোলবার সময় পেলুম না।
কুমার আর্তনাদ করে উঠল, বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও!
.
উড়ন্ত সরীসৃপ
ঠিক আমার মুখ দিয়েই কুমারের দেহটা শূন্যে উঠে যেতে লাগল!
কুমার আবার আর্তস্বরে চিৎকার করলে, বাঁচাও, বাঁচাও!
আমার বিস্ময়ের চমকটা ভেঙে গেল। তখনও কুমারের দেহ নাগালের বাইরে গিয়ে পড়েনি সামনের দিকে একলাফে এগিয়ে হাত বাড়াতেই আমি কুমারের পা দুটো মুঠোর ভিতরে পেলুম এবং প্রাণপণে তাই ধরে টানতে লাগলুম।
কিন্তু এই গরুড় পাখির গায়ে কি ভয়ানক জোর! সে কুমারের সঙ্গে আমাকেও প্রায় উপরে টেনে তোলবার উপক্রম করলে ভাগ্যে আমি বাম হাতে পাহাড়ের একটা গাছের ডাল চেপে ধরে আর ডান হাতে কুমারের পা ধরে দেহের সমস্ত শক্তি এক করে টানতে লাগলুম, নইলে আমাকেও কম মুশকিলে পড়তে হত না।
এদিকে আবার বিপদের উপর নতুন বিপদ! আমি যখন কুমারকে আর নিজেকে নিয়ে এমনি বিব্রত হয়ে আছি, তখন আর একটা গরুড় পাখি হঠাৎ তিরের মতো আমার উপরে ছোঁ মেরে পড়ল। সে তার প্রকাণ্ড ডানা দিয়ে আমাকে এমন প্রচণ্ড এক ঝাঁপটা মারলে যে, কুমারের পা তো আমার হাত থেকে ফসকে গেল বটেই, তার উপরে আমি নিজেও দুই চোখে সর্ষেফুল দেখে তিন-চার হাত দূরে ছিটকে গিয়ে পড়লুম।
সেই সঙ্গেই গুডুম করে বন্দুকের আওয়াজ হল।
তাড়াতাড়ি উঠে বসে দেখি খানিক তফাতেই একটা গরুড় পাখি দুই ডানা ছড়িয়ে পাহাড়ের উপরে নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে আছে এবং তার পাশেই রয়েছে কুমারের দেহ। সে দেহ মড়ার মতো স্থির।
বিমল আর রামহরি তাড়াতাড়ি কুমারের কাছে ছুটে গেল। বিমল তাকে পরীক্ষা করে বললে, না, কোনও ভয় নেই। কেবল অজ্ঞান হয়ে গেছে।
মাথার উপরে তাকিয়ে দেখলুম, বাকি তিনটে গরুড় পাখি তখনও শূন্যে চক্র দিয়ে আমাদের কাছে কাছেই ঘুরছে ফিরছে।
কুমারের বন্দুকটা আমার সামনেই পড়েছিল আমি তখনি সেটা তুলে নিয়ে লক্ষ্য স্থির করে ঘোড়া টিপলুম। লক্ষ্য ব্যর্থ হল না! আর একটা পাখি ঘুরতে ঘুরতে নীচে পড়ে পাহাড়ের ভিতর কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। বাকি পাখি দুটো ভয় পেয়ে বিশ্রী চিৎকার করতে করতে ক্রমেই উপরে উঠে যেতে লাগল।
খানিক পরেই কুমারের জ্ঞান হল। গরুড় পাখির কামড়ে তার বাম হাতখানা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল, এছাড়া তার আর বিশেষ কিছু অনিষ্ট হয়নি।
বিমল মরা গরুড় পাখিটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে বললে, কী আশ্চর্য জীব!
আশ্চর্য জীবটা! অতি বড় দুঃস্বপ্নেও এমন কিম্ভুতকিমাকার চেহারা দেখা যায় না!
কুমার বললে, এটা কি জীব বিনয়বাবু? এর ডানা আছে বটে, কিন্তু দেহের আর কোনও জায়গাই পাখির মতো নয়! এর চঞ্চতে কত বড় বড় দাঁত দেখুন। দেহটা গিরগিটির মতো, যার গায়ের কোথাও পালকের চিহ্নমাত্র নেই।
বিমল বললে, আকারেও এ জীবগুলো প্রায় মানুষের মতোই বড় আর ডানা দুখানা প্রায় পনেরো হাত লম্বা। সিন্দাদের গল্পে রকপাখির কথা পড়েছি, সে-ও মানুষকে ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারত। এটা রকপাখি নয় তো?
আমি বললুম, না। আসলে এটা পাখিই নয়। এদের উপরে দুখানা হাত আর নীচে দুখানা পা আছে। প্রত্যেক হাতে চারটি করে আঙুল। চতুর্থ আঙুলটা লম্বা হয়ে গেছে, আর তাতেই জালের মতো ডানাখানা ঝুলছে। পাখির ডানার গড়ন এরকম হয় না!
কুমার বললে, পাখি নয় তো এটা কি?
আমি বললুম, উড়ন্ত সরীসৃপ! এ-ও একরকম সেকেলে জীব। পণ্ডিতেরা এর নাম দিয়েছেন Pterodactyl। কিন্তু আমরা একে গরুড় পাখি বলেই ডাকব।
সেইদিন সন্ধেবেলাতেই কুমারের কম্প দিয়ে জ্বর এল। গরুড় পাখির দাঁতে নিশ্চয়ই কোনওরকম বিষ আছে। তার হাতখানাও বিষম ফুলে উঠল। একে এই অজানা দেশ, তাই সঙ্গে কোনও ঔষধ নেই, কাজেই কুমারের জন্যে প্রথমটা আমাদের মনে বড় ভাবনা হল।
