বিমল, বিমল, আমার জন্যে তুমি মরবে কেন? এখনও সময় আছে, এখনও পালাও।
বিমল দৃঢ়স্বরে বললে, মরতে হয়তো দুজনেই একসঙ্গে মরব, কিন্তু আপনাকে ফেলে কিছুতেই আমি পালাতে পারব না–এই বলেই সে বন্দুক তুলে ফিরে দাঁড়াল।
তার অদ্ভুত সাহস ও বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে আমি বললুম, কিন্তু, বিমল, তোমার ওই সামান্য বন্দুকের গুলিতে এতবড় ভীষণ জন্তুর কোনও ক্ষতি হবে না,–এখনও পালাও, নইলে আমরা দুজনেই একসঙ্গে মরব।
দেখা যাক বলে সে বন্দুকের লক্ষ্য স্থির করতে লাগল।
সেই ভয়াবহ কুমির কাঙারু তার পিছনের দুই পা ও ল্যাজে ভর দিয়ে লাফের পর লাফ মারতে মারতে তখনও এগিয়ে আসছে। সেই অতি বিপুল দেহের উপরে একটা পাহাড় ভেঙে পড়লেও তার কোনও আঘাত লাগে কিনা সন্দেহ, বিমলের এতটুকু বন্দুকের গুলিতে তার আর কি অনিষ্ট হবে?
এ যাত্রা আর বোধহয় রক্ষা নেই–আমি তো মরবই, আমার জন্যে বিমলকেও প্রাণ দিতে হবে!
ভাবছি, এমন সময়ে বিমলের বন্দুক গর্জন ও অগ্নি উদ্গার করলে।
সঙ্গে সঙ্গে দানবটাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বিমল আবার বন্দুক ছুড়লে।
দানবটা আকাশের দিকে মুখ তুলে বজ্রনাদের মতো দুইবার গর্জন করলে, তারপর লাফাতে লাফাতে আবার যে-পথে এসেছিল সেইদিকেই বেগে পলায়ন করতে লাগল।
বিমল মহা উল্লাসে বলে উঠল, বিনয়বাবু, আর আমাদের ভয় নেই।
আমি হাত বাড়িয়ে তাকে বুকের ভিতরে টেনে নিয়ে বললুম, বিমল, তোমার সাহসেই আমাদের প্রাণ রক্ষা হল।
বিমল বললে, কিন্তু দুটো গুলি খেয়ে ওই জানোয়ারটা যদি ভয় পেয়ে না পালাত তাহলে আমরা কেউই বাঁচতুম না। আপনি ঠিক কথাই বলছেন, বন্দুকের গুলিতে ওর বিশেষ কিছুই ক্ষতি হবে না।
আমি বললুম, কিন্তু ওকে দেখে বুঝতে পারছ কি, ও একালের জীব নয়। প্রাগৈতিহাসিক কালের যে যুগকে পণ্ডিতরা সরীসৃপ-যুগ বলেন, এর আকার সেই যুগের জীবের সঙ্গে অবিকল মিলে যাচ্ছে। বিমল, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা পৃথিবীর এমন কোনও স্থানে এসে পড়েছি, যেখানে কোনও অজানা কারণে পৃথিবীর সেকালের জীবরা এখনও বর্তমান আছে। এ এক অভাবিত আবিষ্কার! এ সংবাদ জানতে পারলে সারা পৃথিবীতে মহা আন্দোলন জেগে উঠবে!
বিমল বললে, কিন্তু এই আবিষ্কারের বার্তা নিয়ে আমরা কি আবার সভ্য জগতে ফিরে যেতে পারব?
আমি বললুম, আজ যে জীবটার বিরুদ্ধে তুমি একাই দাঁড়াতে ভরসা করলে, ও জীবটা যদি হঠাৎ পৃথিবীর কোনও শহরে গিয়ে হাজির হয় তবে ওর ভয়ংকর মূর্তি দেখে শহরশুদ্ধ লোক নিশ্চয়ই শহর ছেড়ে পলায়ন করবে। তোমার মতো বীর যখন আমাদের মধ্যে আছে, তখন আমরা এদেশ থেকে বিজয়ীর মতো ফিরতে পারব না কেন বিমল?
বিমল সলজ্জ কণ্ঠে বললে, বিনয়বাবু আপনি বারবার ওই কথা তুলে আমাকে লজ্জা দেবেন না। দেখি আপনার পায়ের কোনখানটা মুচকে গেছে?
.
গরুড় পাখি
সেদিন গুহায় ফিরে এসে দেখলুম, কুমার, কমল আর রামহরি রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে আছে।
রামহরি ভিজে মাটির তাল দিয়ে কতকগুলি ছোট-বড় পাত্র তৈরি করে সেগুলোকে পুড়িয়ে শক্ত করে নিয়েছিল। উনুন তৈরি করতেও ভোলেনি। সমুদ্রের জল যখন আছে, তখন লবণেরও অভাব হয়নি। কাজেই অন্য কোনও মশলা না থাকলেও এত বিপদের পরে কচ্ছপের সিদ্ধ মাংস আর ডিম আজ বোধহয় নিতান্ত মন্দ লাগবে না!
সত্যিই মন্দ লাগল না। বেশি আর কি বলব, রামহরির রান্না আজ এত ভালো লাগল যে আমার মনে হল শহরে নিশ্চিন্ত ভাবে বসেও এর চেয়ে ভালো সুস্বাদু খাবার আর কখনও খাইনি।
দিনতিনেক আমরা কেউ আর পাহাড় থেকে নীচে নামলুম না, বেশিরভাগ সময়েই গুহার ভিতর বসে-বসে গল্পগুজবে আর পরামর্শেই কাটিয়ে দিলুম।
আজ বৈকালে আমরা ঠিক করলুম, পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু শিখরে উঠে দেখে আসব, যে-দেশে আমরা এসে পড়েছি তার চারিদিকের দৃশ্য কীরকম দেখতে!
যথাসময়ে উপত্যকার ভিতর দিয়ে আমরা পাহাড়ের উপরে উঠতে শুরু করলুম। তখনও আমার পায়ের ব্যথা সারেনি, কাজেই বেশ কষ্ট হতে লাগল। কিন্তু সে কষ্ট মুখে প্রকাশ করলুম না।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে, উপত্যকার গর্ভ ছেড়ে আমরা পাহাড়ের একটা উঁচু শিখরের উপরে গিয়ে দাঁড়ালাম।
চারিদিকে চেয়ে দেখলুম, সমস্ত দেশটা আমাদের পায়ের তলায় ঠিক যেন রিলিফ ম্যাপের মতো পড়ে রয়েছে।
সর্বপ্রথমই একটি সত্য আমাদের চোখের সামনে জেগে উঠল। আমরা যেখানে এসে পড়েছি, সেটি একটি দ্বীপ। কারণ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ,–আমাদের সব দিকেই আকাশের সীমারেখা পর্যন্ত অনন্ত সাগরের নীল জল খেলা করছে!
দ্বীপের প্রায় পূর্বদিকে সেই বিশাল ও নিবিড় বন–যেখানে এসে আমরা প্রথমে অবতীর্ণ হয়েছিলুম। আমরা বেশ বুঝলুম, দ্বীপের সমস্ত বিভীষিকা ওই নিবিড় অরণ্যের ভিতরেই লুকানো আছে, কিন্তু এখান থেকে তার সুন্দর শ্যামলতা ছাড়া আর কিছুই আমাদের নজরে পড়ল না।
অরণ্যের একপাশে মস্ত একটা হ্রদ। তার তীরে তীরে নানাজাতীয় পাখি বিচরণ করছে। দূর থেকে সেগুলো কি পাখি, তা কিন্তু বোঝা গেল না।
বিমল উৎসাহভরে বললে, কালকেই আমি বন্দুক নিয়ে ওখানে গিয়ে দু-একটা পাখি শিকার করে আনব।
কুমার হেঁট হয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে বললে, দেখো দেখো, এখানে আবার কি একটা বিটকেল জীব বসে আছে!
পাহাড়ের ধারে গিয়ে দেখি, আমাদের ঠিক নীচেই চারটে অদ্ভুত আকারের জীব পাথরের মূর্তির মতো নিথর হয়ে চুপ করে পাশাপাশি বসে আছে। তাদের গায়ের রং ধূসর, চোখগুলো ভঁটার মতো গোল গোল, রক্তবর্ণ। তাদের আকার প্রায় পাঁচ ছয় ফুট লম্বা এবং তাদের দেহের দুপাশে দুখানা করে ডানা ও তলার দিকে একটা দড়ির মতো ল্যাজ ঝুলছে! মুখ দেখলে তাদের পাখি বলেই মনে হয় বটে, কিন্তু কারুর গায়েই পালকের চিহ্নমাত্র নেই। তাদের দেখতে এমন বীভৎস যে, আমার বুকের কাছটা থরথর করে কেঁপে উঠল।
