.
আবার বিপদ
পরদিন সকালবেলায় আমরা ভয়ে ভয়ে আবার সমুদ্রের ধারে গেলুমবন্দি কচ্ছপগুলোকে ধরে আনবার জন্যে।
সৌভাগ্যের কথা, সাগর-দানবের আর কোনও উদ্দেশ পাওয়া গেল না। কেবল যে স্থানে দাঁড়িয়ে সে লাঙ্গুল আস্ফালন করেছিল সেখানটায় দেখা গেল বালির ভিতরে মস্ত একটা গর্ত হয়েছে। সেই গর্তের ভিতরে অনায়াসেই দশ-বারো জন লোককে কবর দেওয়া যায়। যার ল্যাজেই এত জোর, তার গায়ের জোর যে কত, আমরা তা কল্পনাও করতে পারলুম না।
বালির উপরে সাগর-দানবের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পায়ের দাগও আমাদের চোখে পড়ল।
হঠাৎ কমল বলে উঠল, একী! মোটে তিনটে কচ্ছপ রয়েছে। অন্যগুলো গেল কোথায়?
মোটে তিনটে কচ্ছপ! বেশ মনে আছে দশটা কচ্ছপ ধরে ছিলুম। তারা যে বাঁধন খুলে সমুদ্রে পালায়নি তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। কারণ তাদের পিঠের শক্ত খোলগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে ছিল, কোনও জীব এসে যে তাদের মাংস খেয়ে গেছে, এটা বুঝতে আমাদের কিছুমাত্র বিলম্ব হল না।
আমি ভাবলুম নিশ্চয়ই এ সাগর-দানবের কীর্তি।
কিন্তু বিমল চেঁচিয়ে বললে, বিনয়বাবু, বিনয়বাবু দেখে যান।
বিমলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে নীচের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলে। চেয়ে দেখলুম বালির উপরে বড় বড় পায়ের দাগ।
বিমল বললে, দেখছেন, এগুলো সাগর-দানবের পায়ের দাগ নয়।
হ্যাঁ এ পায়ের দাগ একেবারে অন্যরকম। তবে এ-ও নিশ্চয় আর একটা বিরাট দেহ দানবের পদচিহ্ন কারণ প্রত্যেকটি পায়ের দাগ লম্বায় অন্তত তিনফুটের চেয়ে কম নয়। উঃ, না জানি এ জীবটার আকার কী প্রকাণ্ড। প্রতি চারটে করে পায়ের দাগের মাঝখানে আবার আর একটা করে লম্বা-চওড়া অদ্ভুত দাগ রয়েছে! ভালো করে দেখে বুঝলুম এটা সেই অজানা দানবেরই বিপুল লাঙ্গুলের চিহ্ন।
বিমল সেই পায়ের দাগ অনুসরণ করে অগ্রসর হল। রামহরি, কুমার আর কমলকে সেখানেই অপেক্ষা করতে বলে আমিও বিমলের পিছনে-পিছনে চললুম।
যেতে-যেতে বিমল বললে, বিনয়বাবু যার পায়ের দাগ আমরা দেখছি সেই-ই নিশ্চয়। কচ্ছপগুলোকে খেয়ে ফেলেছে।
আমারও তাই বিশ্বাস।
কিন্তু অত বড় বড় সাত-সাতটা কচ্ছপ একসঙ্গে খাওয়া তো যে সে জীবের কর্ম নয়!
তা তো নয়ই। কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছ বিমল?
জীবটা কোথায় থাকে তাই দেখতে। কোন দিক থেকে বিপদ আসবার সম্ভাবনা সেটা। জেনে রাখা ভালো।
আমি আর কিছু না বলে বিমলের সঙ্গে-সঙ্গে যেতে লাগলুম।
আমরা প্রায় এক মাইল পথ পার হয়ে এলুম! পায়ের দাগের রেখা তখনও ঠিক সমানই চলেছে! খানিক তফাতেই একটা ছোটখাটো বন রয়েছে, পায়ের দাগ গেছে সেই দিকেই।
আমি বললুম, বিমল, জন্তুটা যে ওই বনের ভেতরেই থাকে তো বেশ বোঝা যাচ্ছে, আমাদের আর অগ্রসর হওয়ার দরকার নেই।
বিমল কি একটা জবাব দিতে গিয়ে হঠাৎ থেমে পড়ল, তারপর বিস্ময় বিস্ফারিত নেত্রে একদিকে তাকিয়ে রইল।
একটু দূরেই হাড়গোড় ভাঙা দ-য়ের মতো একটা গাছ একলা দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং তারই তলায় বসে বিচিত্র এক জানোয়ার তাকিয়ে আছে আমাদের দিকেই।
চোখের সামনে দেখলুম যেন ভীষণতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি! এ জীব যেন ভগবানের সৃষ্টির বাইরেকার! তার মুখখানা অনেকটা কুমিরের মতো, সামনের পা দুটো ছোট, পিছনের পা দুটো বড়, আর তার মোটাসোটা ল্যাজটা দেখতে কাঙারুর মতো।
তার দেহ অন্তত ত্রিশ হাতের চেয়ে কম হবে না!
হঠাৎ সে ল্যাজ আর পিছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তারপর বিকট এক অপার্থিব চিৎকার করে ঠিক কাঙারুর মতোই মারলে এক লাফ! অতবড় দেহ নিয়ে কোনও জীব যে অমন করে লাফ মারতে পারে, না দেখলে আমি তা বিশ্বাস করতে পারতুম না।
বিমল সভয়ে বলে উঠল, ও যে আমাদের দিকেই আসছে। পালান-পালান!
আমরা দুজনে প্রাণপণে ছুটলুম–আর সেই কুমির কাঙারুও ঠিক তেমনি করেই শূন্যে লাফ মারতে মারতে আমাদের অনুসরণ করলে। মাঝে-মাঝে তার ভীষণ চিৎকার শুনে আমার গায়ের রক্ত যেন জল হয়ে যেতে লাগল।
.
বিমলের বীরত্ব
আমরা দুজনেই ছুটছি, আর ছুটছি।
আমাদের পিছনে লাফাতে-লাফাতে আসছে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতো সেই ভয়ানক জানোয়ারটা!
প্রতি লক্ষ্যেই সে আমাদের বেশি কাছে এসে পড়ছে।
ছুটতে ছুটতে চেয়ে দেখলুম, তার সেই কুমিরের মতো প্রকাণ্ড মুখখানা একবার খুলছে আর একবার বন্ধ হচ্ছে এবং তার ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে, লাল টকটকে হলহলে একখানা জিভ ও দুইসার দাঁত! অত বড় দেহের পক্ষে তার চোখ দুটো খুব ছোট বটে, কিন্তু কি কুর, কি নিষ্ঠুর সেই চোখের দৃষ্টি!
হঠাৎ কীসে হোঁচট খেয়ে আমি ঘুরে পড়ে গেলুম। দারুণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে তখনই আমি দাঁড়িয়ে উঠলুম বটে, কিন্তু ছুটতে গিয়ে আর ছুটতে পারলুম না।
বিমলও দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, ও কী বিনয়বাবু হল কি?
যাতনায় মুখ বিকৃতি করে আমি বললুম, আমি আর ছুটতে পারছি না বিমল! আমার ডান পা মুচড়ে একেবারে এলিয়ে পড়েছে।
বিমল সভয়ে বললে, তা হলে উপায়?
আমি আবার পিছনে চেয়ে দেখলুম। সেই দানবটা তখন একেবারে আমাদের কাছে এসে পড়েছে, আর কয়েকটা লাফ মারলেই সে একেবারে আমাদের ঘাড়ের উপরে এসে পড়বে।
আমি প্রাণের আশা জলাঞ্জলি দিয়ে বললুম, বিমল, শিগগির পালাও।
বিমল বললে, আপনাকে এখানে ফেলে? এমন কাপুরুষ আমি নই।
