তারপরেই আমাদের আক্রমণ। আমরা বেগে গিয়ে তাদের এক একটাকে ধরে বালির উপরে চিত করে ফেলে দিলুম। কাজটা অবশ্য খুব সহজ নয়, কারণ তাদের অনেকেই ওজনে প্রায় একমণ, কি আরও বেশি।
আমরা প্রায় গোটা দশেক কচ্ছপ বন্দি করলুমবাকিগুলো জলে পালিয়ে গেল। আগেই কতকগুলো শুকনো লতা সংগ্রহ করে এনেছিলুমবন্দিদের বাঁধবার জন্যে। সেই লতা দিয়ে আমরা তখনই তাদের বেঁধে ফেললুম।
বিমল বললে, যাক এখন কিছুদিনের জন্যে আমাদের পেটের ভাবনা আর রইল না। এইবারে এ-দেশ থেকে পালাবার কথা ভাবতে হবে!
বিমলের কথা শেষ হতে না হতেই ভীষণ এক বিকট চিৎকারে সমস্ত পৃথিবী যেন পরিপূর্ণ হয়ে গেল! উঃ তেমন উচ্চ চিৎকার আমি জীবনে আর কখনও শুনিনি–যেন হাজারটা সিংহ একসঙ্গে একস্বরে গর্জন করে উঠল।
সে অমানুষিক চিৎকারে আমাদের সমস্ত শরীর এলিয়ে পড়ল, কেউ আমাদের আক্রমণ করলেও তখন আমরা সেখান থেকে এক পা নড়তে পারলুম না।
আবার–আবার–আবার–সেই আকাশ-ফাটানো গর্জন, একবার, দুইবার, তিনবার।
সমুদ্রের জল থেকে কী ওটা উঠে আসছে কী ওটা কী ওটা?
অস্পষ্ট আলোয় তাকে ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু তার মাথা প্রায় তালগাছের সমান উঁচু, আর তার দেহের তুলনায় হাতির দেহও বিড়ালের সামনে নেংটি ইঁদুরের মতো নগণ্য। সেই ভয়ানক সমুদ্র-দানবের চোখ দুটো আলো-আঁধারির মধ্যে অগ্নিশিখার মতো জ্বলে জ্বলে উঠছে।
আমি সভয়ে বললুম, পালাও, পালাও।
বিমল কাতর স্বরে বললে, আমার পা-দুটো যে অসাড় হয়ে গেছে, পালাবার যে উপায় নেই।
রামহরি একটা আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
কুমার আর কমল দুই হাতে কান চেপে বালির উপরে বসে পড়ল।
আমার দুই চোখ যেন অন্ধ হয়ে গেল।
এখন উপায়?
.
ডিটপ্লোডোকাস?
জলের ভিতর থেকে সেই সৃষ্টিছাড়া জীবটা যখন প্রথম মাথা তুললে, তখন তাকে মনে হল একটা বিষম মোটা অজগর সাপের মতো। কিন্তু এক মুহূর্ত পরেই আবছায়ার মতো দেখা গেল তার বিরাট দেহ। তার চারটে পা এবং পা-গুলো তার দেহের তুলনায় খুব ছোট হলেও প্রত্যেক পা-খানা অন্তত ছয়-সাত ফুটের চেয়ে কম উঁচু হবে না।
আমরা স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম সেই সাগর-দানব ডাঙায় উঠে তার প্রায় পঁচিশ-তিরিশ ফুট লম্বা ল্যাজ বারকতক বালির উপরে আছড়ালে, তারপর হঠাৎ নিজের হাতির চেয়ে দ্বিগুণ লম্বা, চওড়া ও উঁচু দেহের উপরে একটা বিশফুট লম্বা অজগরের মতো গলা শূন্যে তুলে আবার তেমনি বাজের মতো চিৎকার করতে লাগল। সেসময় তার মাথাটা এত উর্ধ্বে উঠল যে পাশে কোনও তিনতালা বাড়ি থাকলেও তার ছাদের উপর থেকে সে অনায়াসে শিকার ধরতে পারত।
তার ভীষণ চিৎকারে রামহরির মূৰ্ছা আপনি ছুটে গেল। সে চিৎকারে মৃতের চিরনিদ্রাও বোধহয় ভেঙে যায়। রামহরির মূৰ্ছা তো সামান্য কথা!
তবু আমরা কেউ পালাতে পারলুম না–যেন এক অসম্ভব দুঃস্বপ্ন দেখে আচ্ছন্নের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম।
তারপরেই আচম্বিতে চিৎকার থামিয়ে সেই ভীষণ জীবটা ঝপাং করে আবার সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল–দেখতে-দেখতে দেহের সমস্তটা আবার অদৃশ্য হয়ে গেল, জলের উপরে জেগে রইল শুধু তার অজগরের মতো মাথা এবং গলার খানিকটা। ওই মাথা ও গলার তলায় যে কি প্রকাণ্ড ও অদ্ভুত দেহ আছে তাকে তখন দেখলে কেউ তা কল্পনা করতে পারত না।
.
এতক্ষণে আমাদের সাড় হল। আমি বললুম, জীবটা বোধকরি আমাদের দেখতে পায়নি,–এইবেলা পালাই চলো।
তারপরেই আমরা সবাই একসঙ্গে তিরের মতো পাহাড়ের দিকে ছুট দিলুম–একেবারে গুহার সামনে না গিয়ে দাঁড়াতে ভরসা করলুম না। বিমল রুদ্ধশ্বাসে বললে, বিনয়বাবু একি দেখলুম।
আমিও তাই ভাবছি।
রামহরি দুই হাত কপালে চাপড়ে বললে, আর ভেবে কি হবে, এখানে আর আমাদের নিস্তার নেই।
কুমার হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞাসা করলে, বিনয়বাবু মঙ্গল ছাড়া আর কোনও গ্রহে কি জীবের বসতি আছে?
আমি বললুম, থাকতেও পারে।
আমরা তাহলে অন্য কোনও গ্রহে এসে পড়েছি।
কেন তুমি এ অনুমান করছ?
পৃথিবীতে এরকম জীবের কথা কেউ কখনও শুনেছে?
কমল বললে, উঃ! ভাবতেও আমার বুক ঢিপঢিপ করছে।
আমি বললুম, আমরা যে পৃথিবীতে এসেছি, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নাই। এরকম সাগর-দানবের কথা আমরা আর কখনও শুনিনি বটে, কিন্তু এই বিপুলা পৃথিবীর কোথায়। কি আছে, মানুষ তার সব রহস্য তো জানে না। তবে যে-জীবটাকে আমরা এখনি দেখলুম, এটি নিশ্চয়ই প্রাগৈতিহাসিক জীব। প্রাগৈতিহাসিক কি জানো তো? যে-যুগের ইতিহাস পাওয়া যায় না, সেই-যুগকে ইংরাজিতে Prehistoric যুগ বলে। এই Prehistoric কথাটিকে বাংলায় বলে প্রাগৈতিহাসিক।
বিমল বললে, হ্যাঁ, সে-যুগের কথা আমি কেতাবে পড়েছি। পৃথিবীর সেই আদিম যুগে, যখন মানুষেরও জন্ম হয়নি, তখন জলে, স্থলে, আকাশের নানান অদ্ভুত আকারের জীবজন্তু বিচরণ করত। তখনকার অনেক জলচর আর স্থলচর জীবের আকার ছিল ছোটখাটো পাহাড়েরই মতো বড়। তাদের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কঙ্কাল এখনও মাটি খুঁড়লে পাওয়া যায়। কিন্তু বিনয়বাবু, সেসব জীব তো মানুষ জন্মাবার আগেই পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে?
আমি বললুম, এ কথা জোর করে বলা যায় না। পৃথিবীতে এখনও এমন অনেক স্থান আছে, মানুষ যেখানকার কথা কিছুই জানে না। সেসব জায়গায় কি আছে আর কি না আছে, কে তা বলতে পারে? মাঝে মাঝে ভ্রমণকারীদের বর্ণনায় পড়া যায়, পৃথিবীর স্থানে স্থানে কেউ কেউ সেকেলে জানোয়ারদের মতো অসম্ভব আকারের জানোয়ার স্বচক্ষে দর্শন করেছে। সে কথা অনেকেই বিশ্বাস করেন না বটে, কিন্তু কথাটা যে মিথ্যা এমন প্রমাণও তো নেই। এই যে আমরা আজ একটা অদ্ভুত জীব দেখলুম, এটাকে তো চোখের ভ্রম বলে উড়িয়ে দেওয়া চলবে না। প্রাগৈতিহাসিক বা সেকেলে জীবদের অনেক কাহিনি আমি পড়েছি। সেকালে ডিপ্লোডোকাস বলে এক প্রকাণ্ড জানোয়ার ছিল। আজ যে সাগর-দানবকে আমরা দেখেছি। তার সঙ্গে ওই ডিপ্লোডোকাসের চেহারা আশ্চর্যরকম মিলে যায়। কিন্তু আজ অনেক রাত হয়েছে, এসব কথা এখন থাক। ভেবেচিন্তে এসম্বন্ধে আমার যা ধারণা পরে তা তোমাদের কাছে জানাব। এখন এসো, ঘুমের চেষ্টা করে দেখা যাক গে।
