বিমল প্রথমে কথা কইলে। বললে, বিনয়বাবু, এখন উপায়?
কীসের উপায়?
আমরা যে পৃথিবীতেই এসেছি, তাতে আর সন্দেহ নাই। কিন্তু এ কোন দেশ, এখান থেকে কোন দিকে, কতদূরে মানুষের বসতি আছে, তা আমরা জানি না। এখানে থাকাও সম্ভব নয়, কারণ কি খেয়ে বেঁচে থাকব?
আমি বললুম, চেষ্টা করলে বনের ভেতরে শিকার মিলতে পারে। বিমল বললে, হা, মিলতে পারে, কিন্তু তাও বন্দুকের টোটা না ফুরানো পর্যন্ত।
বিমল, টোটা ফুরোবার আগেই আমরা যে এ-দেশ থেকে পালাবার পথ খুঁজে পাব না, এমন মনে করবার কোনও কারণ নেই।
কিন্তু শিকার পেলেও আমরা রাঁধব কী করে? আমাদের সঙ্গে দেশলাই নেই, আগুন জ্বালতে পারব না।
তা হলে আমাদের কাঁচা মাংস খাওয়াই অভ্যাস করতে হবে। মন্দ কি, সে-ও এক নতুনত্ব!
রামহরি বললে, বাবু ভয় নেই, আপনাদের কাঁচা মাংস খেতে হবে না, আমি আপনাদের রেঁধে খাওয়াব।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, তুমি কোথা থেকে আগুন পাবে?
রামহরি বললে, কেন ওই পাহাড়ের পাশ দিয়ে আসতে আসতে আপনারা কি দেখেননি কত ছোট-বড় চকমকি পাথর পড়ে রয়েছে।
আমি আশ্বস্ত হয়ে বললুম, যাক তাহলে আমাদের একটা বড় ভাবনা দূর হল। ইস্পাতের জন্যে ভাবতে হবে না, আমাদের সঙ্গে ছোরাছুরি আছে, তাই দিয়েই কাজ চালিয়ে নেব।
বিমল পেটের উপরে হাত বুলোতে বুলোতে বললে, ও বিনয়বাবু, শুনেই যে আমার খিদে পেয়ে গেল। এখন খাই কি?
আমি হেসে বললুম, শিকার না পেলে আমাদের হাওয়া খেয়েই বেঁচে থাকবার চেষ্টা করতে হবে।
কুমার বললে, কেন বিনয়বাবু, খাবার তো আমাদের সামনে রয়েছে, হাত বাড়িয়ে নিলেই হয়!
বিমল বললে, সামনে! কোথায়?
কুমার বললে, ওই দেখো!
চেয়ে দেখলুম আমাদের সুমুখে বালির উপরে, অনেকখানি জায়গা জুড়ে হাজার হাজার গর্ত আর প্রত্যেক গর্তের সামনে বসে রয়েছে এক-একটা লাল রঙের কঁকড়া।
বিমল মহা উল্লাসে এক লাফ মেরে বলল, কী আশ্চর্য, এতক্ষণ আমি দেখতে পাইনি!
আমরা সকলেই কাঁকড়া ধরতে ছুটলুম। কিন্তু খানিকক্ষণ ছুটাছুটি করেই বুঝলুম, কাজটা মোটেই সহজ নয়। তাদের কাছে যেতে না যেতেই তারা বিদ্যুতের মতো গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে, কিছুতেই ধরা দেয় না। তারা কেউ আত্মসমর্পণে রাজি নয় দেখে আমরা শেষটা গর্ত খুঁড়ে তাদের গোটাকতককে অনেক কষ্টে বন্দি করলুম। গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে কমল হঠাৎ একরাশ ডিম আবিষ্কার করলে। মোট একশোটা ডিম।
আমি সানন্দে বললুম, ব্যস আর আমাদের খাবারের ভাবনা নেই। এগুলো কাছিমের ডিম।
কমল বললে, কাছিমের ডিম কি মানুষে খায়?
নিশ্চয়ই খায়। দক্ষিণ আমেরিকার কোন স্থানে কাছিমের ডিম আর মাংসই হচ্ছে মানুষের প্রধান খাবার। এখানে যখন কাছিমের ডিম পাওয়া গেছে, তখন আজ রাত্রে আমরা কাছিমও ধরতে পারব।
বিমল বললে, তাহলে দেখা যাচ্ছে ভাগ্যদেবী এখনও আমাদের উপরে একেবারে বিমুখ হননি!
কুমার বলল, আর তো তর সইছে না–আগুন জ্বাল আগুন জ্বাল।
.
সাগর-দানবের পাল্লায়
পাহাড়ের উপরে এখানেও একটা গুহা খুঁজে নিতে আমাদের বেশি দেরি লাগল না। এ গুহাটির সবচেয়ে সুবিধা এই যে, এর ভিতরটা বেশ লম্বা-চওড়া হলেও মুখটা এমন ছোট যে হামাগুড়ি না দিয়ে ভিতরে ঢুকবার উপায় নেই। কাজেই আত্মরক্ষার পক্ষে গুহাটি খুবই উপযোগী।
সমুদ্রতীরে যেখানে কাছিমের ডিম পাওয়া গিয়েছিল, সন্ধ্যার পর আমরা আবার সেইখানে গিয়ে একখানা বড় পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রইলুম কাছিম ধরবার জন্যে।
দক্ষিণ আমেরিকার যেভাবে কচ্ছপ শিকার করা হয়, আমি কেতাবে তা পড়েছি। কচ্ছপদের স্বভাব হচ্ছে, ডাঙায় উঠে বালির ভিতরে ডিম পাড়া। রাত্রে দলে দলে তারা ডাঙায় ওঠে। স্ত্রীকচ্ছপ ডিম পেড়ে বালির ভিতর লুকিয়ে রাখে। এক-একটা কচ্ছপ একসঙ্গে আশি থেকে একশো-বিশটা পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তারপর ভোর হওয়ার আগেই আবার তারা জলে ফিরে যায়।
শিকারিদের কাজ হচ্ছে কচ্ছপদের ধরে উলটে দেওয়া! তা হলে আর তারা পালাতে পারে না। উলটে দেওয়ার সময় একটু সাবধান হওয়া দরকার যাতে কাছিমের ডানা বা মুখের কাছে শিকারি হাত না পড়ে। কচ্ছপের কামড় বড় সুখের নয়, আর তার ডানার আঘাতও এমন জোরালো যে এক আঘাতে মানুষের পায়ের হাড় মট করে ভেঙে যায়।…এই সব কথা আমি সবাইকে বুঝিয়ে দিতে লাগলুম।
আকাশে তখন একফালি চাঁদ দেখা দিয়েছে, কিন্তু তার আলো এত ক্ষীণ যে, অন্ধকার দূর হচ্ছে না। যে ভয়ানক বন থেকে আমরা পালিয়ে এসেছি অনেক দূরে একটা জমাট কালো ছায়ার মতো তাকে দেখা যাচ্ছে। তার দিকে যতবার তাকাই আমাদের বুক অমনি দুরুদুরু করে উঠে। ও বনে যে কী আছে ভগবান তা জানেন!
এমন সময়ে সাদা বালির উপরে একটা কালো রেখা টেনে, প্রকাণ্ড একটা কচ্ছপ আমাদের খুব কাছে এসে চারিদিকে একপাক ঘুরে এল।
বিমল তাকে তখনই ধরতে যাচ্ছিল আমি বাধা দিয়ে চুপিচুপি বললুম, থাম থাম! ওটা হচ্ছে কাছিমদের কর্তা। ও আগে এসে চারিদিকে গণ্ডি কেটে রেখে যাচ্ছে। কর্তা গিয়ে খবর দিলে পর আর সব কাছিম এসে এই গণ্ডির ভেতরে আড্ডা গাড়বে। তারপর আমরা আক্রমণ করব।
রামহরি বললে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই যে কাছিম-ভায়া ফিরে যাচ্ছেই তো বটে।
আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, কাছিমকর্তা ফিরে যাওয়ার পরেই দলে-দলে ছোট বড় কচ্ছপ ডাঙার উপরে এসে উঠল।
