একদিন পথ চলতে-চলতে হঠাৎ দেখলুম, এক জায়গায় বড় বড় গাছের তলায় মাটির ওপরে পর পর অনেকগুলো বাসা সাজানো রয়েছে। গুনে দেখলুম, ত্রিশটা বাসা। লতা, ডাল ও শুকনো পাতা দিয়ে প্রত্যেকটি বাসা তৈরি।
জিজ্ঞাসা করাতে আমার কুলিদের সর্দার জানালে, এগুলো গরিলাদের বাসা।
আমি বললুম, শুনেছি গরিলারা এক বাসায় দুদিন শোয় না?
সে জানালে,–না, তবে তারা নিশ্চয়ই খুব কাছে আছে। কারণ ও বাসাগুলো টাটকা।
চারিদিকে তাকিয়ে দেখলুম। বাঁশবন ও অন্যান্য নানা জাতের গাছের স্নিগ্ধ ছায়া নরম ঘাসের বিছানার উপরে ঝিলমিল করছে। গাছের ডালে ডালে দাঁড়কাক, কাঠঠোকরা, ঘুঘু, মধুপায়ী সূর্যপাখি ও একরকম গীতকারী চড়াইপাখি বন-মর্মরের সঙ্গে নিজেদের কণ্ঠ মিশিয়ে দিয়ে মিশ্রসংগীত সৃষ্টি করেছে। উঁচু গাছের ঘন পাতার পর্দা সরিয়ে মাঝে-মাঝে মুখ বাড়িয়েই পালিয়ে যাচ্ছে সোনালি বানররা! একপাশ দিয়ে ছোট্ট একটি নদী রুপোর লহর দুলিয়ে এঁকেবেঁকে চোখের আড়ালে চলে গেছে।
সূর্য অস্ত যেতে দেরি নেই। দূর থেকে একটা শব্দ কানে এল কারা যেন মড়মড় করে গাছ ভাঙছে।
কুলির সর্দারের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলুম, কারা গাছ ভাঙছে?
গরিলারা।
আমি বললুম, তাহলে এইখানেই ছাউনি ফ্যালো। জায়গাটি আমার ভালো লাগছে। কাল আমরা গরিলা শিকারে যাব।
কিন্তু সেই রাত্রেই আমার জ্বর এল–পরদিন আর শিকারে যাওয়া হল না। পাঁচ দিন জ্বরে ভুগে উপোস করে এমন দুর্বল হয়ে পড়লুম যে, আরও দিন তিনেক সেইখানেই বিশ্রাম করতে হল।
ইতিমধ্যে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটল।
সেদিন সকালে সবে আমি পথ্য করেছি, শরীর বড় দুর্বল। সঙ্গে করে রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলি নিয়ে গিয়েছিলুম, মাঝে-মাঝে তার পাতা ওলটাই এবং মাঝে-মাঝে তাঁবুর বাইরে গিয়ে একখানা ক্যাম্পচেয়ার পেতে বসি। নদীর নাচ দেখি আর পাখিদের গান শুনি। এমনি ভাবে সারাদিন কাটল। সন্ধ্যার কিছু আগে একদল হাতি বনের ভিতরে মহা শোরগোল তুলে মড়মড়িয়ে গাছ ভাঙতে-ভাঙতে খানিক তফাত দিয়ে চলে গেল–তারা আমাদের দিকে চেয়েও দেখলে না। এসব দৃশ্য এখন আমার চোখেও সহজ হয়ে এসেছে। হাতির পাল কেন, বনের ভিতর দিয়ে যেতে-যেতে মাঝে-মাঝে দুরে সিংহদেরও খেলা করতে দেখেছি এবং তারাও আমাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টিও দেয়নি বা আক্রমণ করতেও আসেনি।
সন্ধ্যার অন্ধকার যখন ঘনিয়ে এল, পাখিদের কনসার্ট ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে থেমে গেল। স্তব্ধ অরণ্যের অন্তঃপুর থেকে একটা চিতাবাঘের গলা জেগে উঠল। আমিও আস্তে আস্তে তাবুর ভিতরে এসে ঢুকলুম।
সেদিন গুরুপাক খাবার সইবে না বলে দু-টুকরো রুটি জেলি মাখিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়লুম।
আফ্রিকার বনের পাখিরা ভালো করে আলো ফোটবার আগেই এত বেশি চ্যাঁচামেচি শুরু করে যে, ভোর হতে না হতেই ঘুম ভেঙে গেল।
অত্যন্ত ক্ষুধাবোধ করলুম। চাকরবাকররা তখনও জাগেনি, কাজেই নিজেই উঠে কিঞ্চিৎ খাদ্যসংগ্রহের চেষ্টা করলুম।
প্রথমেই আবিষ্কার করলুম, আমার জেলির টিনটা টেবিলের ওপর থেকে অদৃশ্য হয়েছে। তারপর দেখলুম, কাল যে চারখানা রুটি আমি না খেয়েই শুয়ে পড়েছিলুম, টেবিলের ওপরে সেগুলোও নেই!
অত্যন্ত রাগ হল। নিশ্চয়ই কোনও চোর ও পেটুক কুলি কাল রাত্রে লুকিয়ে আমার তাবুর ভিতরে ঢুকেছিল ভেবে সর্দারকে ডাকলুম।
সব কথা শুনে সর্দার অন্যান্য কুলিদের আহ্বান করলে।
কিন্তু তাদের কেউ দোষ স্বীকার করলে না।
আমি ক্রুদ্ধ স্বরে বললুম, আচ্ছা, ভবিষ্যতে আমার তাঁবুর ভিতরে যদি কোনও চোরকে ধরতে পারি, তাহলে গুলি করে তাকে মেরে ফেলব!
সেদিন রাত্রে হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। ঘুমোবার সময়ে আমার বৃষ্টি ভারি মিষ্টি লাগে। পৃথিবী যখন ধারাজলে স্নান করছে, মাটি যখন কাদায় প্যাঁচ প্যাঁচ করছে এবং পথিকদের কাপড়চোপড় যখন ভিজে সঁাৎ সঁাৎ করছে, আমি যে তখন দিব্যি শুকনো ও উত্তপ্ত দেহে পরম আরামে বিছানায় শুয়ে আছি, এই পরিতৃপ্তির ভাবটুকু মনকে খুশি করে তোলে এবং চোখে তন্দ্রাসুখের আবেশ মাখিয়ে দেয়। গাছের পাতায় পাতায় বৃষ্টিবিন্দুর টুপুর টুপুর শব্দ শুনতে-শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।
পরদিন সকালে উঠে দেখা গেল, বিস্কুটের যে নতুন টিনটা সবে কাল সন্ধ্যায় ভোলা হয়েছিল, সেটা আর টেবিলের ওপরে নেই!
মন যে কীরকম খেপে গেল তা আর বলা যায় না। শহরে এমন খাবার চুরি হলে বিশেষ ভাবনা হয় না। কিন্তু সভ্যতা ও হাটবাজার থেকে এত দুরে এই গহন বনে যেখানে একটা মোহর দিলেও একখানা বিস্কুট কেনা যায় না, সেখানে নিত্য যদি এইভাবে খাবার চুরি যেতে থাকে তাহলে দু-দিন পরেই আমাকে যে পাততাড়ি গুটিয়ে মানে এখান থেকে সরে পড়তে হবে।
তাঁবুর বাইরে গিয়ে দাঁড়ালুম। সঙ্গে সঙ্গে চোখ পড়ল মাটির উপরে। কাল রাত্রে বৃষ্টি পড়ে তাবুর দরজার সামনেকার মাটি নরম করে দিয়েছে এবং সেইখানে কতকগুলো স্পষ্ট পায়ের দাগ। সে পদচিহ্ন মানুষের।
সেদিনও আগে সর্দারকে ডেকে চুরির কথা বললুম ও পায়ের দাগগুলো দেখালুম।
সর্দার খানিকক্ষণ ধরে দাগগুলো পরীক্ষা করলে। আফ্রিকায় বনে-বনে ঘোরা যাদের ব্যবসা, ভূমিতলে পদচিহ্ন দেখে ভালো ডিটেকটিভের মতন তারাও যে অনেক তথ্য আবিষ্কার করতে পারে, এ আমি জানতুম। সুতরাং এই পদচিহ্নগুলো দেখে সর্দার কী বলে তা শোনবার জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলুম।
