বিমল তার মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বললে, বাঘা তো কখনও ভয় পায় না। সে এমন কী দেখেছে?
আমি গম্ভীর স্বরে বললুম, বিমল, এ জায়গা বড় সুবিধের নয়। এসো, এখান থেকে আমরা চলে যাই–একটা মাথা গোঁজবার ঠাই খুঁজতে হবে তো!
বিমল একবার বাঘা, আর একবার বনের দিকে তাকিয়ে জড়িত স্বরে বললে, কিন্তু বনের ভিতরে কী আছে,বাঘা কী দেখে এত ভয় পেয়েছে?
.
বোম্বাই ফড়িং
আমরা সেই ভয়াবহ অরণ্য থেকে পালাবার জন্যে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হতে লাগলুম।
চলতে-চলতে বারবার পিছনে তাকিয়ে সেই একই দৃশ্য দেখলুম–বনের এক জায়গায় গাছপালা অত্যন্ত অস্বাভাবিকভাবে দুলছে আর দুলছে। কেন দুলছে, কে দোলাচ্ছে?
বাঘা আমাদের পায়ে পায়ে জড়িয়ে চলতে লাগল কিন্তু ভয়ে সে তখনও জড়সড় হয়ে আছে।
বনের ভিতরে কী যে বিভীষিকা লুকিয়ে আছে এবং বাঘা যে কী দেখে ভয়ে মুষড়ে পড়েছে, অনেক ভেবেও তার কোনও হদিস পেলুম না।
কুমার বললে, আমার বাঘা বাঘ দেখেও ভয় পায় না। কিন্তু এর অবস্থাই যখন এমন কাহিল হয়ে পড়েছে, তখন এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে যে বনের ভেতরে নিশ্চয়ই কোনও ভয়ঙ্কর কাণ্ড আছে!
বিমল দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, চুপিচুপি ওখানে গিয়ে আমি একবার দেখে আসব কি?
আমি তাড়াতাড়ি ডানপিটে বিমলের হাত চেপে ধরে বললুম, তুমি কি পাগল হলে বিমল? বিপদকে যেচে ডেকে আনবার কোনও দরকার নেই?
বিমল বললে, আচ্ছা আপনি যখন মানা করছেন তখন আর যাব না।
আমরা আবার অগ্রসর হলুম। আশেপাশে আরও অনেক ঝোপ-জঙ্গল আর বন রয়েছে। কেন জানি না, সেগুলোর পাশ দিয়ে যেতে-যেতে আমার বুকটা কেমন ছাৎ ছ্যাৎ করে উঠতে লাগল! প্রতি পদেই মনে হতে লাগল ওইসব বনজঙ্গলের মাঝখানে সাক্ষাৎ মৃত্যু যেন আমাদের অপেক্ষায় ওঁত পেতে বসে আছে। এক জায়গায় শুনতে পেলুম, বনের ভেতরে আবার সেইরকম ধপাস ধপাস করে শব্দ হচ্ছে এবং প্রতি শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই পৃথিবীর বুক কেঁপে-কেঁপে উঠছে– বনের ভিতরে যেন কোনও পর্বতপ্রমাণ দানব আপন মনে এধারে ওধারে ঘুরে ফিরে চলাফেরা করে বেড়াচ্ছে। যার পায়ের শব্দেই পৃথিবী কঁপে, না জানি তার আকার কি ভয়ানক! একবার সে যদি মানুষের গন্ধ পায়, তাহলে আর কি আমাদের রক্ষা আছে?
আরব্য উপন্যাসের সিন্দবাদ একবার এক দৈত্যের কবলে গিয়ে পড়েছিল। গালিভার সাহেবের ভ্রমণ-কাহিনিতেও দৈত্য-মুল্লুকের কথা আছে। তবে কি সে সব গল্প কাল্পনিক নয়, আমরা কি সত্যই কোনও দৈত্যদের দেশে এসে পড়েছি? কিন্তু এ কথায় আমার মন বিশ্বাস করতে চাইলে না। বিমল বললে, বিনয়বাবু, আমরা তো কেউ এখানকার কিছুই চিনি না। কোন দিক নিরাপদ কী করে আমরা তা জানতে পারব?
.
বিমলের কথা সত্য। কিন্তু খানিকক্ষণ ভেবে বুঝলুম দক্ষিণ দিক অর্থাৎ যেদিকে সমুদ্র আছে, সেদিকটা বেশ ফাঁকা,–সেদিকে জঙ্গল নেই, কাজেই কোনও লুকানো বিপদেরও ভয় নেই। তার উপরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে খুব বড় একটা পাহাড়ও রয়েছে। মঙ্গলগ্রহের মতো এখানেও আমরা ওই পাহাড়ের ভিতরে আশ্রয় নিতে পারব। সকলকে আমি সেই কথা বললুম। সকলেই আমার প্রস্তাবে রাজি হল। আমরা তখনই সেই পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হলুম।
পাখি নেই, প্রজাপতি নেই, মানুষের সাড়া নেই, চারিদিকে খালি বন আর পাহাড় আর সমুদ্র! আমার মনে হল, আমরা যেন বৈজ্ঞানিকদের পৃথিবীর সেই বাল্যকালে ফিরে এসেছি– যখন মানুষের নামও কেউ শোনেনি, যখন পৃথিবীতে বাস করত শুধু প্রকাণ্ড কিম্ভুতকিমাকার আশ্চর্য সব জানোয়ার!
আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, অনেক-অনেক উঁচুতে একঝাক পাখি উড়ে যাচ্ছে। তাহলে এদেশেও পাখি আছে। তাড়াতাড়ি আমি সকলের দৃষ্টি সেই দিকে আকর্ষণ করলুম।
বিমল বললে, কিন্তু ওগুলো কি পাখি?
কুমার বললে, চিল।
কমল বলল, ঈগল।
আমি বললুম, কিন্তু চিল কি ঈগলের ডানা তো অত বড় হয় না।
রামহরি বললে, ওদের ল্যাজ কীরকম দেখুন।
তাই তো, ওদের ল্যাজগুলো চতুষ্পদ জীবের মতো যে! কি পাখি ওগুলো?
ভালো করে দেখবার আগেই পাখির ঝক ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল।
হঠাৎ পিছন থেকে কমল আর্তনাদ করে উঠল। চকিতে ফিরে দেখি কমলের পিঠের উপরে একটা অদ্ভুত আকারের জীব এসে বসেছে আর কমল প্রাণপণে সেটাকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই পারছে না।
আমরা সকলে মিলে জীবটাকে মেরে ফেললুম। অদ্ভুত জীব? দেখতে মস্ত বড় একটা ফড়িংয়ের মতো প্রায় এক হাত লম্বা! কিন্তু তার মুখে সাঁড়াশির মতো দুখানা বড় বড় দাঁড়া রয়েছে আর তার দেহের দুই ধারেও রয়েছে দুখানা করে চারখানা হাত-দেড়েক লম্বা ডানা।
রামহরি বললে, ও বাবা এ যে বোম্বাই ফড়িং!
কমলের দিকে চেয়ে দেখলুম তার ঘাড়ের পিছনে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে।
কুমার হঠাৎ চেঁচিয়ে একদিকে আঙুল তুলে বললে, দেখো, দেখো!
সেই দিকে তাকাতেই দেখি গাছপালার ভিতর থেকে পালে পালে বোম্বাই ফড়িং বেরিয়ে আসছে।
আমি বললুম, পালাও, পালাও। ওরা আমাদের দেখতে পেলে আমরা কেউ বাঁচব না।
সবাই বেগে দৌড়োতে লাগলুম–ফড়িং দেখে এর আগে মানুষ বোধহয় আর কখনও পালায়নি।
.
পেটের ভাবনা
এই তো সমুদ্রতীর! উপরে নীলপদ্মের রং মাখানো অনন্ত আকাশ, নীচে পৃথিবী দেবীর পরনের নীলাম্বরীর মতো অনন্ত নীল সায়রের লীলা!
সমুদ্রের বুকের উপরে বসে সূর্যের আলো হাজার হাজার হিরা মানিক নিয়ে যেন ছিনিমিনি খেলছে, আমরা বসে বসে খানিকক্ষণ তাই দেখতে লাগলুম।
