ভোরের আলো তখন মাটির বুকেও নেমে এসেছে এবং অন্ধকার সরে যাচ্ছে বন-জঙ্গলের ভিতর দিকে।
আমি বললুম, বামনরা যে কী করে চম্পট দিলে কিছুই তো বুঝতে পারছি না, এতগুলো লোককে আমরা তো তাদের উপরে পাহারায় রেখে এসেছি।
বিমল বললে, বোধহয় বন্দুক নিয়ে আমরা চলে আসতেই বামনদের সাহস বেড়েছে, তারা মানুষদের আক্রমণ করেছে!
সম্ভব! কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ নেই। চলো, যেখানে উড়োজাহাজ এসে নেমেছিল, সেখানটা একবার দেখে আসি!
জায়গাটা বেশি দূরে নয়। আমরা যেদিক থেকে এসেছিলুম আবার সেই দিকেই এগিয়ে চললুম!
তখন চারদিক দিব্য ফরসা হয়ে এসেছে। কিন্তু চোখের সুমুখে যেসব দৃশ্য দেখছি তা একেবারে অভাবিত ও অপূর্ব!
পশ্চিমদিকে পাহাড়ের উপর পাহাড় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ভোরের আলোতে প্রাতঃস্নান করছে। পাহাড়গুলোর উপরে উদ্ভিদের চিহ্নমাত্র নেই কিন্তু তাদের তলাতেই অনাদিকালের নীল অরণ্য!
পূর্বদিকে মস্ত একটি প্রান্তর ধু-ধু করছে মাঝে মাঝে এক-একটা গাছের কুঞ্জ। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, অতবড় মাঠের কোথাও একগাছা ঘাসের নামগন্ধও নেই? মাঠের একপাশ দিয়ে একটা চিকচিকে রেখা এঁকেবেঁকে কোথায় চলে গেছে নিশ্চয়ই নদী।
উত্তরদিকেও বনজঙ্গল আর গাছপালা, অধিকাংশ গাছই ছোট ছোট, এবং তাদের আকার এমন অদ্ভুত যে পৃথিবীর কোনও গাছের সঙ্গেই মেলে না।
দক্ষিণদিকের গাছপালার ফাঁকে-ফাঁকে দেখা যাচ্ছে অনেক দূরে জলের উপরে সূর্য কিরণের ঝিকিমিকি। জলের নীল রং দেখে আন্দাজ করলুম সমুদ্র।
আমাদের পায়ের তলাতে যে জমি রয়েছে তা অত্যন্ত কঠিন, প্রায় পাথর বললেই চলে– সেখানেও ঘাসের চিহ্ন নেই। মাঝে-মাঝে এক একটা ঝোপের ভিতরে অজানা নানারকম আশ্চর্য ফুল ফুটে আছে সেসব ফুলের কোনওটারই আকার ছোট নয়। আর তাদের সকলেরই বোঁটায় বড় বড় কাটা!
বিমল কৌতূহলী চোখে চারিদিকে চাইতে-চাইতে বললে, কী আশ্চর্য বিনয়বাবু, এ আমরা কোন দেশে এলুম? এমন ভোরের বেলা, অথচ একটি পাখি পর্যন্ত ডাকছে না!
কুমার বললে, এমন বনজঙ্গল, অথচ একটা ফড়িং কি প্রজাপতি পর্যন্ত উড়ছে না!
বাস্তবিক, এ বড় অসম্ভব ব্যাপার! চারিদিকে কোথাও কোনও জীবের সাড়া বা চিহ্ন নেই।
আমি বললুম, এ যেন ময়নামতীর মায়াকানন! কমল বললে, সে আবার কী?
প্রাচীনকালে বাংলাদেশে মানিকচন্দ্র বলে এক রাজা ছিলেন। ময়নামতী তার রানি। প্রবাদ আছে ময়নামতী ডাকিনীবিদ্যা শিখে গুরুর বরে অমর হয়েছে। এখানে এসে আমার মনে হচ্ছে, এ যেন সেই ময়নামতীর মায়াপুরী কীটপতঙ্গ পশুপক্ষী পর্যন্ত ভয়ে এখানে দেখা দেয় না।
রামহরি এতক্ষণ সকলের আগে আগে পথ চলছিল, আমার কথা শুনেই সে মুখ শুকিয়ে সকলের পিছনে এসে দাঁড়াল।
আমি হেসে বললুম, কী হল হে রামহরি হঠাৎ পিছিয়ে পড়লে কেন?
আজ্ঞে, আপনার কথা শুনে।
কেন, কী কথা?
ওই যে বললেন এ বন হচ্ছে ময়নামতীর মায়াকানন। বুড়ি ময়নার গল্প আমিও জানি বাবু! সে বনকে শহর করত, শহরকে বন করত, ভেড়াকে মানুষ আর মানুষকে ভেড়া বানাত! যত ভূত-প্রেত আর ডাকিনী-যোগিনী তার কথায় উঠতবসত।
রামহরি, এত সহজে তুমি ভয় পাও কেন? আমি যা বললুম তা কথার কথা মাত্র!
ভয় কি পাই সাধে? যে বিপদ থেকে সবে পার পেয়েছি, আমি আর কিছুই অসম্ভব মনে করি না। কে জানে এ আবার কোন মুল্লুকে এলুম–পৃথিবীর সঙ্গে এর তো কিছুই মিলছে না। যেখানে পাখি নেই, প্রজাপতি নেই, ফড়িং নেই, সে কি পৃথিবী? এই শেষরাতে চোখের সমুখ দিয়ে পাহাড়ের মতো কী-একটা চলে গেল, পৃথিবীতে কি সেরকম কোনও জীব থাকে।
আমি আর কোনও জবাব দিলুম না। রামহরির ভয় হাস্যকর বটে, কিন্তু তার যুক্তি অসঙ্গত নয়। বিমল বললে, বিনয়বাবু আমাদের উড়োজাহাজ কোথায় এসে নেমেছিল, আমরা বোধ হয় তা আর ঠিক করতে পারব না।
আমি বললুম, আমারও তাই মনে হচ্ছে। অন্ধকারে আমরা কোথায় নেমেছিলুম এখন তা আর বোঝা শক্ত!
রামহরি দরদ ভরা গলায় বললে, আহা, উড়োজাহাজের ভেতরে যে মানুষগুলো ছিল, তাদের দশা কী হবে?
কমল বললে, যার অদৃষ্টে যা আছে! তাদের আবার মঙ্গল গ্রহে ফিরে যেতে হবে, আর কি!
কুমার বললে, এখন ওসব বাজে কথা রেখে নিজেদের কথা ভাব। আমাদের অদৃষ্টও খুব উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু ওকি! বিমল, বিমল!
আমরা সকলেই স্পষ্ট দেখলুম, অল্পদুরেই বনের এক অংশ উপর থেকে তলা পর্যন্ত দুলছে। তার পরেই দেখা গেল, বনের উপরে চূড়ার মতো খুব-উঁচু একটা গাছ বারদুয়েক দুলেই মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বিমল বিস্মিতভাবে বললে, অতখানি জায়গা জুড়ে বন দুলছে–কে ওখানে আছে।
কুমার বললে, এখন ঝড়ও নেই জোরে হাওয়া বইছে না। তবে অত বড় গাছ এত সহজে ভাঙলে কে?
বাঘা একবার ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠল, তারপর ছুটে সেই বনের ভিতর গিয়ে ঢুকল।
আমার গা কেমন শিউরে-শিউরে উঠতে লাগল। আমি বিজ্ঞানকে মানি এবং বিজ্ঞান যে অনেক অসম্ভব ব্যাপারকে সম্ভব করেছে তাও আমি জানি কিন্তু এখানে এসে যেসব কাণ্ড দেখছি তার কোনই হদিস পাচ্ছি না। এ আমাদের চোখের ভ্ৰম, মনের ভ্রম,না সত্যিই কোনও অলৌকিক ব্যাপার?
হঠাৎ দেখলুম বাঘা তিরের মতো বেগে বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। তার ল্যাজ পেটের তলায় গুটানো আর তার চোখ দুটো বিষম ভয়ে যেন ঠিকরে বেরিয়ে পড়তে চাইছে। সে এসেই বিমলের পায়ের তলায় মুখ খুঁজড়ে শুয়ে পড়ল।
