ময়নামতীর মায়াকানন (উপন্যাস)
পূর্ব কথা
বিনয়বাবুর ডায়ারিতে যে অতি আশ্চর্য ঘটনাটি তোলা আছে, তা পড়বার আগে একটুখানি পূর্ব-ইতিহাস জানা দরকার।
ইউরোপ-আমেরিকার পণ্ডিতরা যে আজকাল মার্স বা মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, এ খবর এখন বোধহয় পৃথিবীর কারুর কাছেই অজানা নেই।
পণ্ডিতদের মতে, মঙ্গল গ্রহে একরকম জীবের বসতি আছে তাদের চেহারা মানুষের মতো না হলেও মানুষের চেয়ে তারা কম বুদ্ধিমান নয়। অনেকের মতে তাদের বুদ্ধি মানুষেরও চেয়ে বেশি। কিন্তু পণ্ডিতদের কথা এখন থাক।
মঙ্গলগ্রহ থেকে আশ্চর্য এক উড়োজাহাজে চড়ে একদল বেয়াড়া বামন জীব একবার আমাদের পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছিল।
যাওয়ার সময়ে অদ্ভুত উপায়ে তারা অনেক মানুষকে মঙ্গলগ্রহে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
বন্দিদের ভিতরে ছিল বিমল, কুমার ও রামহরি–যাঁরা যকের ধন উপন্যাস পড়েছেন তাদের কাছে ওরা অপরিচিত নয়! বিনয়বাবু ও কমল বন্দি হয়েছিল–এবং সঙ্গে ছিল কুমারের বড় আদরের বাঘা কুকুর।
বিনয়বাবু বয়সে প্রৌঢ়–নানা বিষয়ে জ্ঞান তার অগাধ। অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য তাঁর নখদর্পণে! দলের সকলেই তাঁকে মানত ও শ্রদ্ধা করত।
বিমল, কুমার ও কমল বয়সে যুবক। বিমলের সাহস ও বাহুবল অসাধারণ।
রামহরি হচ্ছে বিমলের পুরোনো চাকর।
অন্যান্য বন্দিদের পরিচয় আপাতত অনাবশ্যক।
মঙ্গলগ্রহে যেসব রোমহর্ষক ও আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল, বিনয়বাবুর ডায়ারিতে তা লেখা আছে। ডায়ারির সেই কাহিনি মেঘদূতের মর্ত্যে আগমন নামে উপন্যাসে প্রকাশিত হয়ে গেছে।
ময়নামতীর মায়াকানন যদিও সম্পূর্ণ নতুন এক উপন্যাস, তবু এর আরম্ভ হয়েছে মেঘদূতের মর্ত্যে আগমনের শেষ পরিচ্ছদের শেষ অংশ থেকে।
বুদ্ধি ও শক্তিতে পরাস্ত হয়ে মঙ্গলগ্রহের বামনরা শেষটা বন্দি মানুষদের হাতেই বন্দি অবস্থায় উড়োজাহাজ নিয়ে পৃথিবীতে আসতে বাধ্য হয়েছিল।
বিনয়বাবুর ডায়ারির সেই স্থানটি মেঘদূতের মর্ত্যে আগমন থেকে আমি এখানে উদ্ধার করে দিলুম।
ওই ফুটে উঠছে ভোরের আলো–পূর্ব আকাশের তলায় আশার একটা সাদা রেখার মতো। আকাশের বুকে তখনও রাতের কালো ছায়া ঘুমিয়ে আছে এবং সামনের দৃশ্য তখনও অন্ধকারের আস্তরণে ঢাকা। তবে, অন্ধকার এখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে বটে।
মুখ বাড়িয়ে দেখলুম, পৃথিবীর সমস্তই আবছায়ার মতো, এখনও গাছপালার সবুজ রং চোখের উপরে ভেসে ওঠেনি!
বিমল, কুমার, কমল ও রামহরি আর থাকতে পারলে না, তারা তখনই উড়োজাহাজ ছেড়ে নেমে পড়ল। আমিও নীচে নামলুমবাঘাও আমাদের সঙ্গ ছাড়লে!
আঃ, কী আরাম! এতকাল পরে পৃথিবীর প্রথম স্পর্শ সে যে কি মিষ্টি! মাটিতে পা দিয়েই টের পেলুম, আমরা স্বদেশে ফিরে এসেছি!
কমল তড়াক করে এক লাফ মেরে বলল, হাঁ এ আমাদের পৃথিবীই বটে! এক লাফে আমি আর তিনতলার সমান উঁচু হতে পারলুম না তো।
খানিক তফাতে হঠাৎ কি একটা শব্দ হল–দুড়ুম দুড়ুম দুড়ুম যেন ভীষণ ভারী পায়ের শব্দ!
আমরা সচমকে সামনের দিকে তাকালুম। অন্ধকারের আবরণ তখনও সরে যায়নি, তবে একটু দূরে প্রকাণ্ড একটা চলন্ত পাহাড়ের কালো ছায়ার মতো কি যেন চলে যাচ্ছে বলে মনে হল।
বাঘা ভয়ানক জোরে ডেকে উঠল, আমাদের সবাই স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম।
নিজেদের চোখকে যদি বিশ্বাস করতে হয় তাহলে বলতে পারি আমাদের সমুখ দিয়ে যে জীবটা চলে যাচ্ছে সেটা তালগাছের চেয়ে কম উঁচু হবে না! তার পায়ের তালে দেহের ভারে পৃথিবীর বুক ঘন ঘন কেঁপে উঠছে..
মহাকায় জীবটা কোথায় মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার চলার শব্দ তখনও শোনা যেতে লাগল–দুড়ুম দুড়ুম দুড়ুম।
বিমল শুষ্ক স্বরে বললে, বিনয়বাবু।
আঁ?
ওটা কি?
অন্ধকারে তো কিছুই দেখতে পেলুম না।
কিন্তু যেটুকু দেখলুম, তাই-ই কি ভয়ানক নয়? এ আমরা কোথায় এলুম?
পৃথিবীতে!
কিন্তু এইমাত্র যাকে দেখলুম, সে কি পৃথিবীর?
আমিও অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম। ওদিকে আকাশের কোলে শুয়ে ঊষার চোখ ক্রমেই ফুটে উঠতে লাগল।
.
বিনয়বাবুর ডায়ারি
অপূর্ব পৃথিবী
ঊষার চোখ ক্রমেই ফুটে উঠছে!…কিন্তু পৃথিবী তখনও আপনার বুকের উপর থেকে আবছায়ার চাদরখানি খুলে রেখে দেয়নি।
যেদিকে সেই মহাকায় জীবটা চলে গেল, সেইদিকে হতভম্বের মতো তাকিয়ে আমরা কয়জনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি।
আচম্বিতে আর এক অপরিচিত শব্দে আমরা সকলেই চমকে উঠলুম! যেন হাজার হাজার শ্লেটের উপরে কারা হাজার হাজার পেনসিল টানছে আর টানছে!
এক লহমায় আমাদের আড়ষ্টভাব ঘুচে গেল।
কুমার সর্বাগ্রে চেঁচিয়ে উঠল, বামনদের উড়োজাহাজ।
বিমল বললে, সে কী কথা। উড়োজাহাজ তো বিকল হয়ে পৃথিবীতে এসে নেমেছে, মেরামত না করলে আর উড়তে পারবে না!
রামহরি আকাশের দিকে হাত তুলে বললে, ওই দেখো খোকাবাবু!
আমাদের চোখের সামনে দিয়ে বিপুল একটা কালো ছায়া ঠিক বিদ্যুতের মতো বেগে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এ মঙ্গলগ্রহের উড়োজাহাজই বটে!
কুমার বললে, কী সর্বনাশ! অনেক মানুষ যে ওর মধ্যে আছে।
কমল তাড়াতাড়ি বললে, কুমারবাবু, বন্দুক ছুড়ুন, বন্দুক ছুড়ুন!
বিমল হতাশভাবে বললে, আর মিছে চেষ্টা! বামনরা আমাদের চোখে ধুলো দিয়েছে, উড়োজাহাজ বন্দুকের সীমানার বাইরে চলে গেছে।
এরই মধ্যে উড়োজাহাজখানা আকাশের গায়ে প্রায় মিলিয়ে যাওয়ার মতো হয়েছে—না জানি কতই বেগে সে উড়ে চলেছে।
