ধরণীবাবু আর আমি দুজনেই রীতিমতো মুষড়ে পড়লুম, যদিও মুখে কিছু ভাঙলুম না।
পরে খবরাখবর নিয়ে জানা গেল, যামিনীর কথা মিথ্যা নয়–এ যে ইংরেজিতে যাকে বলে একেবারে লোহা-বাঁধানো অ্যালিবাই, এর বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করবার উপায় নেই।
ঘটনাস্থলে পাওয়া আঙুল ও হাতের ছাপের সঙ্গেও যামিনীর আঙুল ও হাতের ছাপ একটুও মিলল না।
আমরা যামিনীর চোখা চোখা টিটকারি শুনতে-শুনতে প্রায় অপোবদনে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।
জয়ন্ত, মানিক, তোমরা এমন সৃষ্টিছাড়া মামলার কথা কখনও শুনেছ?
জয়ন্ত জবাব দিলে না, দুই চক্ষু মুদে কী ভাবতে লাগল!
মানিক বললে, হুঁ, প্রথম দৃষ্টিতে সবদিক দিয়েই সন্দেহ ধাবমান হয় বটে যামিনীরই দিকে। প্রায় প্রতিদিন যারা তাকে দেখে এমন দুইজন স্বচক্ষে দেখলে পলায়মান যামিনীকে, তার কেনা ভেনাস-ছোরা পাওয়া গেল হত ব্যক্তির বক্ষে বিদ্ধ অবস্থায়; তার ওপরে জামাতারূপে তাকে গ্রহণ করতে নারাজ হওয়ার দরুণ সদানন্দবাবু নিশ্চয়ই তার বিরাগভাজন হয়েছিলেন। আচ্ছা সুন্দরবাবু, আপনি কি ঠিক জানেন, মন্দ্রা মনে-মনে যামিনীকে পছন্দ করত?
–লোকের মুখে তাই তো শুনেছি।
–তাহলে তো সহজেই যামিনীর বিশ্বাস হতে পারে, সদানন্দবাবুকে মাঝখান থেকে সরিয়ে দিলেই মা আর তার বিপুল সম্পত্তি নিশ্চয়ই সে অধিকার করতে পারবে।
–এ সব আমরাও ভেবে দেখেছি। কিন্তু খালি ভেবে-চিন্তে কী হবে ভায়া? পুলিশের চাই প্রমাণের মতো প্রমাণ।
আর একটা কথা। আপনাদের জামাই-আদর থেকে ছাড়ান পাবার পর যামিনী কি আবার মন্দ্রার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেনি?
করেনি আবার, খুব চেষ্টা করেছে। তাকে যে ভুল দেখা আর বোঝা হয়েছে, সেটা সবিস্তারে জানিয়ে যামিনী প্রথমে মাকে একখানা পত্র লেখে। কিন্তু মন্দার তরফ থেকে কোনও জবাব না পেয়ে সে সশরীরে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। মন্দা দেখা না করে লোকমুখে বলে পাঠায় নিজের চোখকে আমি অবিশ্বাস করতে পারি না। পিতৃহন্তার সঙ্গে আমি দেখা করব না। যামিনীকে তাই হাল ছাড়তে হয়েছে।
আচম্বিতে জয়ন্ত চোখ চেয়ে বললে, ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র! এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির ষড়যন্ত্র আছে।
সুন্দরবাবু কৌতূহলী কণ্ঠে বললেন, কেমন করে বুঝলে?
জয়ন্ত বললে, আমার বোঝাবুঝির মূল্য কতটুকু?
ধরণীবাবু বলবেন, কড়াক্রান্তিও নয়!
সুন্দরবাবু হেসে বললেন, কিন্তু আমি তো ধরণীবাবু নই।
জয়ন্ত বললে, তাহলে আপনাকে আমি গোটাকয়েক প্রশ্ন করতে পারি?
–তুমি অগুন্তি প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জরিত করে ফেললেও আমি একটুও বিরক্ত হব না।
–আমার সর্বপ্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, যামিনীর দেশ কোথায়?
মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে। কিন্তু আজ বিশ বৎসর আগে পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সমস্ত স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে যামিনী দেশের সঙ্গে যা কিছু সম্পর্ক তুলে দিয়ে চলে আসে, তারপর নানাস্থানী হয়ে ঘুরে বেড়ায়। জিয়াগঞ্জের কোনও লোকই তার কথা বিশেষ কিছুই জানে না। ভাসা-ভাসা কেবল শোনা যায়, কামিনীকান্ত নামে যামিনীর আর এক ছোটভাই ছিল, সে নাকি ক্রিমিন্যাল। ওয়ারেন্টে ধরা পড়বার ভয়ে আজ পনেরো বৎসর ধরে কোথায় কোন দেশে নিরুদ্দেশ হয়ে আছে, যামিনীও তার খোঁজখবর পায় না। সে বলে, তার ভাই নিশ্চয়ই বেঁচে নেই।
আমার পরের প্রশ্ন হচ্ছে : সদানন্দবাবুর সঙ্গে আমেরিকা থেকে ফিরে এসে যামিনী কোথায় বাসা বেঁধেছিল?
–আপার সারকুলার রোডের একখানা ছোট বাড়িতে। তার এক পুরোনো বন্ধু শ্যামাকান্তের সঙ্গে সেই বাড়িতেই বাস করত যামিনী।
বন্ধুটিকে দেখেছেন?
–দৈবগতিকে দেখেছি। মাস-পাঁচেক আগে ও পাড়ার একটা বড় চুরির মামলায় পুলিশের পক্ষে সে সাক্ষ্য দিতে আসে। মুখময় দাড়ি গোঁফের ঝোপ-ঝাঁপ, মাথায় কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে পড়া এলোমেলো চুলের জঙ্গল, চোখে মোটা কাচের কালো চশমাদস্তুরমতো বন্য চেহারা। পরনে গেরুয়া কাপড়-জামা, বিবাহ করেনি। সংসারের ধরাবাঁধার ধার ধারে না–ধর্মালোচনায় আর তীর্থভ্রমণেই তার দিন কাটে হুম, দুনিয়ায় কতরকম জীবই যে আছে, আমরা যেদিন বোকা বনবার জন্যে যামিনীকে গ্রেপ্তার করতে যাই, সেদিনও সে বাড়িতে ছিল না, শুনলুম তীর্থভ্রমণে গিয়েছে।
হঠাৎ গাত্রোত্থান করে জয়ন্ত বললে, ভো সুন্দরবাবু! আমাদের পানে তাকিয়ে এইবার বলুন–জাগো এবং ভাগো!
সুন্দরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, হুম, তোমার কথার অর্থ?
–আরে মশাই, আপনি ছুটি পেয়েছিলেন মাত্র আধঘণ্টাকাল। এতক্ষণে চল্লিশ মিনিট হয়ে গেছে। চলো মানিক, আমরা পালাইনইলে সুন্দরবাবুর কর্তব্যপালনে ত্রুটি হবে। আবার যথাসময়ে দেখা করব, নমস্কার!
সুন্দরবাবু হতভম্বের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
.
এক হপ্তা পরে। টেবিলের দুই প্রান্তে বিমর্ষের মতো উপবিষ্ট ধরণীধর ও সুন্দরবাবু। মাঝে-মাঝে চায়ের পেয়ালায় এক-একটা চুমুক দিচ্ছিলেন বটে, কিন্তু কেউ যেন চায়ের স্বাদ পাচ্ছিলেন না।
এমন সময়ে দ্বারপথে আবার জয়ন্ত ও মানিকের আবির্ভাব।
ধরণী চোখ তুলে একবার তাদের দেখলেন, তারপরেই বিরক্তভাবে মুখ ফিরিয়ে টেবিলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।
সুন্দরবাবু অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বললেন, সেদিন তোমরা অমন অসভ্যের মতো চলে গিয়েছিলে বলে আমি দুঃখিত হয়েছি?
