যামিনীর বয়স পঁয়তাল্লিশ বটে, কিন্তু অন্তরে-বাহিরে সে বয়োধর্মকে নিকটবর্তী হতে দেয়নি। তার হাবভাব, চালচলন ও কথাবার্তা সব তরুণের মতো, এমনকী চেহারা দেখলেও তার বয়স পঁয়ত্রিশ বৎসরের বেশি বলে সন্দেহ হয় না। তার এই তারুণ্যই আকৃষ্ট করেছিল সদানন্দবাবুকে এবং সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত মাকেও। অন্তত মা যে যামিনীকে পছন্দ করত এটুকু জানা গিয়েছে এবং তারই ফলে আশান্বিত ও উৎসাহিত হয়ে যামিনী সদানন্দবাবুর কাছে। তার জামাতা হবার বাসনা প্রকাশ করে।
আগেই বলেছি, সদানন্দবাবুর মন ছিল অতি আধুনিক। স্ত্রী-স্বাধীনতায় তাঁর ছিল প্রবল প্রত্যয়। নিজে কোনও মত জাহির করার আগে তিনি কন্যার মত জানতে চাইলেন। অতি আধুনিক কেতাদুরস্ত মা কিন্তু নিতান্ত সেকেলে বঙ্গবালার মতোই বললে, তোমার মতই আমার মত।
এ-বিবাহে সদানন্দবাবুর মত হল না প্রধানত দুটি কারণে : প্রথমত, পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে বয়সের ব্যবধান একুশ বৎসর। দ্বিতীয়ত, ইয়ার বন্ধুর সঙ্গে তিনি জামাতার সম্পর্ক স্থাপন করতে একান্ত নারাজ।
এই মতের অমিলে কিন্তু মনের অমিল হল না, বজায় রইল বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই। ব্যাপারটা যামিনী গ্রহণ করলে পয়লা নম্বরের দার্শনিকের মতো খুব সহজভাবেই। সদানন্দবাবু বাজারে মন্দ্রার যোগ্য পাত্র অন্বেষণ করতে লাগলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পাত্র আবিষ্কার করবার আগেই ইহলোক থেকে তাঁকে বিদায়গ্রহণ করতে হয়েছে।
গেল হপ্তার আঠারো তারিখে সদানন্দবাবুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, তিনি মারা পড়েছেন আততায়ীর অস্ত্রাঘাতে।
অস্ত্র একখানা ছোরা। অদ্ভুত ছোরা। ধরণীবাবুর মুখে শুনলুম, এরকম ছোরা এখনও বাজারে আসেনি। ছোরার একদিকে খুব ধারালো ফলা আর একদিকে গ্রিসের সৌন্দর্যের দেবী ভেনাসের নগ্ন মূর্তি। এই মূর্তিটাই হচ্ছে ছোরার হাতল। তা জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট-এর ছোরা নামে বিখ্যাত। আমেরিকায় বাজারেও তার চাহিদা যথেষ্ট। শিকারিরাই এই ছোরা ব্যবহার করে। সদানন্দবাবুর বুকের ওপরে ছোরাখানা বিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
হত্যাকাল হচ্ছে রাত্রি সাড়ে নয়টা। ঘটনাস্থল হচ্ছে সদানন্দবাবুর শয়নগৃহ। কেবল খুন নয়, সদানন্দবাবুর আলমারির ভিতর থেকে নগদ পাঁচ হাজার টাকার নোটের তাড়া আর পনেরো হাজার টাকার জড়োয়া গয়নাও অদৃশ্য হয়েছে।
বাবার আর্তনাদ শুনতে পেয়ে মন্দ্রা তাড়াতাড়ি নিজের ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলোতে স্পষ্ট দেখতে পায়, সদানন্দবাবুর শয়নগৃহ থেকে বেরিয়ে যামিনী দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। মা বারবার যামিনীবাবু বলে ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পায়নি।
একতলায় নিজের ঘর থেকে সদানন্দবাবুর ম্যানেজার হরিবাবুও স্বচক্ষে যামিনীকে বেগে রাস্তার দিকে ছুটে যেতে দেখেছেন।
মন্দ্রার মুখ থেকে আরও জানা গেছে, ব্ল্যাক ফরেস্ট-এর ওই ছোরাখানার অধিকারী হচ্ছে যামিনীই। আমেরিকায় মার সামনেই সে ছোরাখানা কিনেছিল।
সব শুনে আমাদের দৃঢ় ধারণা হল, খুনি যামিনী ছাড়া আর কেউ নয়। পাছে চম্পট দেয়, সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি তাকে গ্রেপ্তার করে ফেললুম। কিন্তু তার পরেই আমাদের চিত্ত বিভ্রম হবার উপক্রম। হুম, এ কী উদ্ভট মামলা!
হা হা করে হেসে উঠে যামিনী ধরণীকে বললে, খুলে দিন মশাই, খুলে দিন আমার নরম হাতে এই শক্ত লোহার বেড়ি সহ্য হবে না। আপনারাও হবেন অপদস্থ আর বিপদগ্রস্ত।
ধরণী চোখ রাঙিয়ে বললেন, চোপরাও ছুঁচো, শুয়োর! খুন করে আবার লম্বা-লম্বা বুলি কপচানো হচ্ছে? ঘুসি মেরে মুখ ভেঙে দেব জানিস?
–আমি খুন করেছি! প্রমাণ?
–মন্দ্রাদেবী আর তার ম্যানেজারবাবু স্বচক্ষে তোকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন।
–ওরা ভুল দেখেছে।
–এই ভেনাস-ছোরাখানা কার?
–আমার বলেই তো মনে হচ্ছে। আমেরিকায় কিনেছিলুম। কিন্তু ওখানা আজ ছ-মাস আগে আমার ঘর থেকে চুরি গিয়েছে। খবর নিয়ে দেখবেন যথাসময়ে থানায় ডায়েরি লেখানো হয়েছে।
বটে? কিন্তু জানিস কি এই ছোরার হাতলের ওপরে আছে খুনির আঙুলের স্পষ্ট ছাপ? ঘটনাস্থলেও পাওয়া গিয়েছে তার রক্তাক্ত হাতের ছাপ? এক জায়গায় নয়, তিন জায়গায়।
হাতের ছাপের নিকুচি করেছে! ফালতু হাতের ছাপ নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই!
–এই হাতের আর আঙুলের ছাপই প্রমাণ করবে খুন করেছিস তুই। পৃথিবীতে দুজন মানুষের হাতের ছাপ একরকম হয় না।
–বহুৎ আচ্ছা, দেখা যাবে। আপাতত আমার অ্যালিবাই নিয়ে মাথা ঘামান দেখি।
কী অ্যালিবাই?
–খুন হয়েছে আঠারো তারিখে। কিন্তু সতেরো থেকে উনিশ তারিখ পর্যন্ত তিনদিন আমি কলকাতাতেই হাজির ছিলুম না।
–কোথায় ছিলি?
–বর্ধমানে। আমার বিশেষ বন্ধু বিজয়গোপালের বাড়িতে।
–কে বিজয়গোপাল?
–তাকে আপনি খুব চেনেন,–সে হচ্ছে কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জির একমাত্র ভগ্নিপতি।
ধরণীবাবুর চোখ উঠল চমকে। একটু থতমত খেয়ে তিনি শুধোলেন, বিজয়বাবুর সঙ্গে তোর কী সম্পর্ক?
বললুম তো, বিজয় আমার বিশেষ বন্ধু। তার একমাত্র পুত্রের বিবাহে সে আমাকে সাহায্য করতে ডেকেছিল। গোটা তিনদিন আমাকে কলকাতায় ফিরতে দেয়নি। বিজয়ের কাছে খবর নিলেই জানতে পারবেন। আপনাদের ডেপুটি কমিশনার সাহেবের কাছেও খবর পেতে পারেন কারণ তিনিও ওই তিনদিন ছুটি নিয়ে বিয়েবাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।
