মানিক বললে, দুঃখিত? কেন দুঃখিত হয়েছেন? আমরা কি মামলাটার আনুপূর্বিক বিবরণ অতিশয় মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করিনি?
হুম, শুনেছ বটে। কিন্তু পরমুহূর্তেই হাঁ কি না কিছুই না বলে বেগে স্থানত্যাগ করোনি!
ধরণীর মুখের পানে একবার সকৌতুকে অপাঙ্গে তাকিয়ে নিয়ে মানিক বললে, তা ছাড়া আর কী করবার উপায় ছিল সুন্দরবাবু? শ্রদ্ধেয় ধরণীবাবু কি আমাদের স্পষ্টাস্পষ্ট বলে দেননি যে, পেশাদার পুলিশ শখের গোয়েন্দার সাহায্য অনাবশ্যক মনে করে?
ধরণী বললেন, হ্যাঁ, তখনও বলে দিয়েছি, আবার এখনও তাই বলছি–আমার এক কথা!
–নিশ্চয়-নিশ্চয়,ভদ্রলোকের এক কথা। তা আমরা তো মশায়ের কাছে গায়ে পড়ে সাহায্য করবার জন্যে আসিনি, আমরা এসেছি আমাদের প্রিয়বন্ধু সুন্দরবাবুকে একটা খবর দিতে।
সুন্দরবাবু শুধালেন, কী খবর?
এইবার জয়ন্ত বললে, আমরা গতকল্য জিয়াগঞ্জ থেকে ফিরেছি।
সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বললে, তোমরাও জিয়াগঞ্জে গিয়েছিলে? কেন হে? সেখানে তো যামিনীকে কেউ চোখেও দেখেনি।
জয়ন্ত বললে, আরও ভালো করে খুঁজলে আপনারাও দুই-তিনজন এমন বৃদ্ধ ব্যক্তির সন্ধান পেতেন, যারা যামিনী আর কামিনীকে জন্মাতে দেখেছে?
ধরণী তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বললেন,–আরও ভালো করে খোঁজবার কোনওই দরকার ছিল না–আমাদের যেটুকু জানবার তা জেনেছি! যত সব বাজে কথা। পঁয়তাল্লিশ বৎসর আগে যারা জিয়াগঞ্জে যামিনীকে জন্মাতে দেখেছে সেই সব বুড়োর বকুনি শুনে কলকাতায় বসে কোনও খুনের মামলায় ফয়সালা করা যায় না।
–বলতে বাধ্য হলুম আপনার ধারণা ভুল। বুড়োদের মুখে কী খবর পেয়েছি জানেন? যামিনী আর কামিনী যমজ ভাই। তাদের চেহারার মিল এতটা বেশি যে, দুজনকে একই পোশাক পরালে কে যামিনী আর কে কামিনী কেউ ধরতে পারত না। সুন্দরবাবু, এ তথ্যটুকু আপনার কোনও কাজে লাগবে কি?
সুন্দরবাবু প্রথমটা গম্ভীর বদনে চিন্তা করতে লাগলেন। তারপর সহসা লম্ফত্যাগ করে দাঁড়িয়ে উঠে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, মূল্যবান তথ্য, মূল্যবান তথ্য! খুন করলে কামিনী, লোহার বালা পরল যামিনী! বুঝতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি!
না সুন্দবাবু, এখনও বোধহয় ব্যাপারটা আপনি তলিয়ে বুঝতে পারেননি। যা কিছু ঘটেছে, তাবৎ ব্যাপারের মূলে আছে একমাত্র যামিনীরই মস্তিষ্ক। কামিনী করেছে তারই আদেশ পালন। যামিনী জানত, স্বাভাবিকভাবে পুলিশের সন্দেহ তারই ওপরে পড়বে। তাই পুলিশকে সে রীতিমতো নাকাল করতে চেয়েছিল। উপরন্তু প্রায় তারই মতো দেখতে কামিনীকে তার দরকার হয়েছিল, সদানন্দবাবুর বাড়িতে অবাধে প্রবেশ করবার সুবিধা হবে বলে।
কিন্তু কোথায় সেই কামিনী?
–তা আমি জানি না। তবে এক্ষেত্রেও একটা সন্দেহ প্রকাশ করতে পারি। ধর্মপরায়ণ, তীর্থপর্যটক শ্যামাকান্তকে আবিষ্কার করুন। তার মাথাটা দীর্ঘ কেশপাশ থেকে মুক্ত করুন, তার চোখের ওপর থেকে চশমার কালো কাচের আবরণ সরিয়ে ফেলুন, তার মুখ থেকে লম্বা দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দিন, তার গা থেকে গেরুয়া কাপড়-জামা কেড়ে নিন, হয়তো স্বচক্ষে দেখতে পাবেন যামিনীকান্তের যমজ ভাই কামিনীকান্তকে। হয়তো এ হচ্ছে আমার ভ্রান্ত ধারণা, কিন্তু এখানে আমি সঠিক কিছু বলতে পারব না।
সুন্দরবাবু হতাশভাবে বললেন, কিন্তু শ্যামাকান্তও যে খাঁচার বাইরে কোথায় উড্ডীয়মান হয়েছে, কে তার সন্ধান দেবে?
ধরণী গোঁ-ভরে নীরবে সব কথা শুনছিলেন, এতক্ষণ পরে মুখ খুলে বললেন, সুন্দরবাবু, ভুলে যাচ্ছেন কেন, আমাদের যে-সব সুযোগ-সুবিধা আছে, শখের গোয়েন্দাদের তা নেই। আমি ডাকঘরের সঙ্গে এমন ব্যবস্থা করতে পারি যে, যামিনীর বাড়ির সমস্ত চিঠিপত্র যেন বিলি করবার আগে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। জয়ন্তবাবুর সন্দেহ যদি সত্য হয় তবে আজ বা কাল না হোক, দুই কি চার কি ছয় মাসের মধ্যে কোনও না কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
সুন্দরবাবু বললেন, তোমাদের কী মত জয়ন্ত?
আমাদের আর কোনও মতামত নেই। এখন তবে আসি। চল মানিক।
.
তিনমাস পরের ঘটনা।
জয়ন্তদের প্রভাতী চায়ের আসর। সুন্দরবাবুর প্রবেশ–পিছনে-পিছনে ধরণীবাবু।
কেউ কিছু বলবার আগেই সুন্দরবাবু বললেন, জয়ন্ত আজ তোমাদের চায়ের আসরে ধরণীবাবু অনাহুত অতিথি হতে চান।
জয়ন্ত তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে বললে, এ আমার পরম সৌভাগ্য–পরম সৌভাগ্য। আসুন, বসুন,–ওরে মধু, জলদি চা নিয়ে আয় রে, টোস্ট আর এগপোচ আনতেও ভুলিসনে যেন।
ধরণীবাবু বললেন, আজ চা পান হচ্ছে গৌণ ব্যাপার, আমার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে আপনাদের অনেক কটু কথা শুনিয়েছি বলে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
–আমাকে আর লজ্জা দেবেন না মশাই, কিন্তু এতদিন পরে হঠাৎ আপনার ক্ষমা প্রার্থনার কথা মনে হল কেন? সঠিক আপনার অনুমান! যামিনী শ্যামাকান্ত ওরফে কামিনীকে চিঠি লিখেছিল বোম্বাই শহরে। সে গ্রেপ্তার হয়েছে। ছোরার আঙুলের ছাপ মিলে গেছে অবিকল। যামিনীর সঙ্গে তার চেহারার আশ্চর্য মিলছদ্মবেশের ভিতর থেকে লোকের চোখে যা ধরা পড়ত না। যামিনীও এখন হাজতে। আপনি গোয়েন্দা বটে, কিন্তু অসাধারণ আর অতুলনীয়। ধন্য, ধন্য।
ভৌতিক, না ভেলকি?
হ্যাঁ, আফ্রিকায় অনেক বিচিত্র ঘটনাই ঘটে।
তখন আমি ছিলুম কঙ্গো প্রদেশে। যেখানে গ্রিবিজুই ও চারি নদী পরস্পরের সঙ্গে মিলেছে, যেখানে পেয়েছিলুম একখানা খালি বাড়ি। সাধারণ বাড়ি, তার ওপরে ঘাসে-ছাওয়া চাল এবং তার চারিদিক বেষ্টন করে বারান্দা।
