ধরণী আগে দুই বন্ধুর আপাদমস্তকের ওপরে চোরধরা দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। তারপর ভারিক্কি চালে বললেন, শুনেছি গোয়েন্দাগিরি নাকি এদের খেয়াল বা শখ!
জয়ন্ত জোড়হাতে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, বিলাসও বলতে পারেন। আপনার মতো নামজাদা পেশাদারের কাছে আমরা হচ্ছি–পর্বতের তুলনায় নুড়ির মতো তুচ্ছাদপি তুচ্ছ!
ধরণী কিঞ্চিৎ খুশি হয়ে বললেন, দেখছি আপনি কথার ম্যাজিকেও কম নন। বসুন। চা খান। কিন্তু গোড়াতেই বলে রাখা উচিত, আজ আমি এখানে সুন্দরবাবুর সঙ্গে একান্তে কিছু পরামর্শ করতে এসেছি।
–একান্তে? অর্থাৎ গোপনে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মানিক বললে, তা হলে সুন্দরবাবু, আজ এখানে আমরা চা না খেলেও পৃথিবী উলটে যাবে না। তোমার কী মত জয়ন্ত?
–হ্যাঁ, আমাদের গাত্রোত্থান করাই উচিত।
সুন্দরবাবু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, আরে, আরে, তাও কি হয়? চা খেতে আর তোমাদের কতক্ষণ লাগবে? সেটুকু সময়ের মধ্যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না!
মানিক মাথা নেড়ে বললে, না মশাই, ঘড়ি ধরে চা খাওয়া আমাদের ধাতস্থ হয় না। চা খাওয়ার মানে কি এক নিঃশ্বাসে চা গলাধঃকরণ করা? ধীরে-সুস্থে কিছু গালগল্প হবে না, দুটো ফস্টিনস্টি করবার ফুরসত পাওয়া যাবে না, তর্কাতর্কির চোটে চায়ের পেয়ালায় তুমুল তরঙ্গ উঠবে না, তবে আর হল কী দাদা! না জেনে কোথায় এসে পড়েছি রে বাবা!
কাঁচুমাচু মুখে উঠে দাঁড়িয়ে সুন্দরবাবু বললেন, না ভাই, তোমরা চা না খেয়ে চলে গেলে আমার দুঃখের সীমা থাকবে না। বোসো। ওই দেখো চা এসে পড়েছে।
ধরণীধর বিরক্তমুখে নির্বাক। সুন্দরবাবুর নির্বন্ধ এড়াতে না পেরে অগত্যা জয়ন্ত ও মানিক হাত বাড়িয়ে চায়ের পাত্র গ্রহণ করলে।
সুন্দরবাবু বললেন, জয়ন্ত, ব্যাপার কী জানো ভায়া? একটা অদ্ভুত মামলা হাতে নিয়ে আমরা মস্ত সমস্যায় পড়ে গিয়েছি।
অদ্ভুত মামলা?
রীতিমতো। আসামিকে আবিষ্কার করেছি, অকাট্য সব প্রমাণ পেয়েছি, কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করতে পারছি না।
জয়ন্ত বললে, মামলাটার কিছু আঁচ পেলে আপনাদের সঙ্গে আমরাও না হয় খানিকটা মাথা ঘামাবার চেষ্টা করতুম।
দস্তুরমতো অসন্তুষ্ট কণ্ঠে ধরণী বলে উঠলেন, কে মশাইদের মাথা ঘামাতে বলছে? পেশাদার পুলিশ শখের গোয়েন্দার সাহায্য অনাবশ্যক মনে করে। আমরা যেখানে হাবুডুবু খাই আপনারা সেখানে তলিয়ে যাবেন।
জয়ন্ত বললে, অবশ্য, অবশ্য।
মানিক মাথা নেড়ে বললে, উঁহু!
ধরণী কুপিত কণ্ঠে বললেন, উঁহু মানে?
–জয়ন্ত সাঁতার জানে, তলিয়ে না যেতেও পারে।
কবজি ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করে ধরণী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তা হলে আপনারা সমস্যাসাগরে সাঁতার কাটুন আপাতত, আমার আর সময় নেই–অফিসে জরুরি কাজ আছে। সুন্দরবাবু, আধঘণ্টা পরেই যেন আপনার দেখা পাই।
–যে আজ্ঞে।
জয়ন্ত বললে, ভদ্রলোক রাগে ফুলতে-ফুলতে চলে গেলেন।
হো-হো করে হেসে উঠে সুন্দরবাবু বললেন, হুম। ধরণীবাবু শখের গোয়েন্দার নাম শুনলেই খেপে যান। তাঁর মতে, পয়লা নম্বরের ধাপ্পাবাজরাই শখের গোয়েন্দা বলে আত্মপরিচয় দেয়।
জয়ন্ত গম্ভীরভাবে বললে, এখন আপনার অদ্ভুত মামলার কথা বলুন।
সুন্দরবাবু বললেন, ফলাও করে বলবার সময় নেই, ছুটি পেয়েছি আধঘণ্টা মাত্র। সংক্ষেপে বলব।সদানন্দবাবু মস্ত ধনী–মোটা ব্যাঙ্কের খাতা আর স্থাবর সম্পত্তির মালিক। তার স্ত্রী স্বর্গে, পুত্রসন্তান নেই, মা তার একমাত্র কন্যা। সে একাধারে রূপবতী আর গুণবতী– সসম্মানে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
হাতে অঢেল টাকা থাকলে অনেকের অনেক রকম শখ বা নেশা বা খেয়াল হয়। সদানন্দবাবুর শখ ছিল দেশভ্রমণ। তিনি ভারতের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ কোথাও টহল দিতে বাকি রাখেননি। তারপর যান ইউরোপে। তারপর আমেরিকায়। সেখানে গিয়ে তিনি এক নতুন বন্ধু লাভ করেন–যামিনীকান্ত। তাঁর সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও দেশে ফিরে আসে আর প্রতিদিনই দুজনে মিলে নানা বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা বা তাস-দাবা-পাশা খেলা চলে। ধনী না হলেও বাপের দৌলতে তাকেও চাকরি করে খেতে হয় না।
সদানন্দবাবুর বয়স ষাট আর যামিনীর পঁয়তাল্লিশ। কিন্তু তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বয়সের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিল। দুই বৎসরের মধ্যে তাঁদের বন্ধুত্বের ভিত এমন পাকা হয়ে উঠেছিল যে, যামিনীকে না পেলে সদানন্দবাবুর অবসর-মুহূর্তগুলো অচল হয়ে পড়ত চাকা-ভাঙা গাড়ির মতোই।
সদানন্দবাবুর প্রকৃতির ওপরে পাশ্চাত্য প্রভাব পড়েছিল যথেষ্ট পরিমাণেই। নিজের একমাত্র সন্তান মাকেও তিনি মানুষ করে তুলেছিলেন সেইভাবেই। সে এমএ পাস দেবার পরেই তাকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় গিয়ে তিনি এক বৎসর কাল কাটিয়ে আসেন। তিনি জানতেন, তার বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হবে মন্দা, সুতরাং দুনিয়াদারির সঙ্গে পরিচয় ঘনিষ্ঠ না হলে তার চলবে না।
সুপটু শিল্পীর হাতে গড়া আলমারিতে সাজিয়ে রাখা মোমের পুতুলের মতো সুন্দরী নয় মন্দ্রা–তার আশ্চর্য সৌন্দর্য যেন গতিচঞ্চল দেহের ভিতর থেকে উপচে পড়তে চায় প্রাণের প্রাচুর্যে আর জীবনের উচ্ছ্বাসে। তাকে দেখলেই মুগ্ধ হতে হয়। যামিনীও মুগ্ধ না হয়ে পারেনি। খালি মুগ্ধ নয়, তাকে পাবার জন্যে সে হয়ে উঠল লুব্ধ। বরাবর এড়িয়ে এসেছে যে উদ্বাহবন্ধন, চল্লিশের কোঠা পেরিয়ে সে এখন ধরা দিতে চায় সেই কঠিন বাঁধনেই।
