বেত্রাঘাত ছিল তখন অত্যন্ত অপমানকর দণ্ড। আসামির মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। এমন দণ্ডের কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি, তাড়াতাড়ি আর্তস্বরে সে বলে উঠল, জরিমানা করুন– জেলে পাঠান, কিন্তু দয়া করে, বেতমারার হুকুম দেবেন না!
স্যার টমাস অটল ভাবে বললেন, আসামিকে নিয়ে যাও এখান থেকে! তার পিঠে সপাসপ ত্রিশ ঘা বেত মারা হোক!
চোরকে সবাই টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল। তারপর তাকে সকলকার সামনে এক প্রকাশ্য স্থানে দাঁড় করিয়ে তার দুই হাত বেঁধে, পিঠে বেতের পর বেত মারা হল।
সেদিন রক্তাক্ত দেহে মাথা নীচু করে চোর যখন বাড়িতে ফিরে এল, তখন পিঠের যাতনায় চেয়ে, মনের যাতনাই তাকে বেশি কাবু করে ফেলেছে। প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্যে তার সারা প্রাণ ছটফট করতে লাগল, কিন্তু মহাধনী মহা শক্তিশালী জমিদার স্যার টমাস লুসির বিরুদ্ধে কী প্রতিহিংসা সে নিতে পারে? তার সহায়ও নেই, সম্পদও নেই! আবার কি সে বনে ঢুকে হরিণ চুরি করবে? না, চারিদিকে সতর্ক পাহারা, এবারে ধরা পড়লে অপমানের আর অন্ত থাকবে না!
কিন্তু প্রতিশোধ প্রতিশোধ–যেমন করে তোক প্রতিশোধ নিতেই হবেধনী স্যার টমাসকে বুঝিয়ে দিতেই হবে, গরিবও প্রতিশোধ নিতে পারে। চোর বসে বসে অনেকক্ষণ ধরে আকাশপাতাল ভাবতে লাগল। হঠাৎ ছেলেবেলার ইস্কুলের কথা তার মনে পড়ল। ছেলেরা এক দুষ্ট মাস্টারের নামে পদ্য লিখে তাকে প্রায় পাগল করে ছেড়েছিল। হ্যাঁ, প্রতিশোধ নেওয়ার এই একটা সহজ উপায় আছে বটে। কিন্তু সে তো জীবনে কখনও পদ্য লেখেনি। সে তো পদ্য লিখতে জানে না। আচ্ছা, একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি?
চোর কাগজ নিলে, কলম নিলে এবং একমনে স্যার টমাসের নামে পদ্য লিখতে বসল। লিখতে লিখতে সবিস্ময়ে সে আবিষ্কার করলে যে, তার পক্ষে পদ্য লেখা মোটেই শক্ত ব্যাপার নয়। শেষ পর্যন্ত কবিতাটি যা দাঁড়াল, পাঠ করলে স্যার টমাস যে আহ্লাদে আটখানা হবেন না, এটুকু বুঝে চোরের মন অত্যন্ত পরিতৃপ্ত হল। সমস্ত পদ্যটি এখানে তুলে দেওয়ার সময় নেই, মাত্র কয়েকটি লাইনের নমুনা দেখলেই তোমরা তার কতকটা পরিচয় পাবে।
পার্লামেন্টের সভ্য সে যে,
আদালতের জজ সে হাঁদা,
ঘরের ভেতর জুজুবুড়ো,
বাইরে তাকে দেখায় গাধা।
কান ধরে তার নিয়ে গিয়ে।
গাধীর সঙ্গে দাও-গে বিয়ে—
প্রভৃতি।
আমাদের কবি তখনই তার এই অপূর্ব রচনাটি নিয়ে দৌড়ে গাঁয়ের সঙ্গীদের কাছে হাজির হল এবং সকলকে আগ্রহ ভরে পড়ে শোনালে। কবিতাটি তাদের এত চমৎকার লাগল যে, তখনই তারা মুখস্থ করে ফেললে। তাদের মধ্যে ছিল একজন গাইয়ে, সে আবার সুর দিয়ে কবিতাকে গানের মতন গাইতে আরম্ভ করলে। দুদিন যেতে-না-যেতেই সারা গাঁয়ের লোক মনের আনন্দে উচ্চস্বরে কবিতাটি আওড়াতে বা গাইতে শুরু করে দিলে। সে-অঞ্চলে স্যার টমাসকে কেউ পছন্দ করত না।
কিন্তু এতেও নবীন কবির মনের সাধ মিটল না। কারণ, স্যার টমাস হয়তো স্বকর্ণে এমন মূল্যবান কবিতাটি শ্রবণ করেননি। অতএব সে এক রাত্রে চুপিচুপি গিয়ে জমিদার বাড়ির ফটকের গায়ে কবিতাটি লটকে দিয়ে এল।
পরদিন সকালে ছেলে-মেয়ে-বউ নিয়ে স্যার টমাস খেতে বসেছেন, এমন সময়ে এক চাকর সেই কবিতার কাগজখানা নিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে বললে, হুজুর, এখানা ফটকে ঝুলছিল। আমরা পড়তে জানি না, দেখুন তো দরকারি কাগজ কিনা?
স্যার টমাস কাগজখানার উপরে চোখ বুলিয়েই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, হতভাগা, নিশ্চয়ই তুই পড়তে জানিস। কাগজখানা পড়েই আমাকে দেখাতে এসেছিস। দূর হ, বেরো এখান থেকে। চাবকে তোর বিষ ঝেড়ে দেব, জানিস?
চাকর তো এক ছুটে পালিয়ে বাঁচল,সত্যিই সে লেখাপড়া জানত না।
স্যার টমাস একটু ভেবেই চেঁচিয়ে উঠলেন, বুঝেছি, এ সেই পাজির পা-ঝাড়া চোরের কাণ্ড! আমি তার কান কেটে নেব–আমি তার কান কেটে নেব!
চোর-কবির কান অবশ্য কাটা যায়নি, কিন্তু স্যার টমাসের অত্যাচারে তাকে গ্রাম ছেড়ে পালাতে হল। তবে অনেক বছর পরে আবার যখন গ্রামে ফিরে এল, তখন সে একজন দেশ-বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার।
স্যার টমাস কবে মারা গিয়েছেন। আজ তাকে কেউ চিনত না! কিন্তু পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার তাকে নিয়ে প্রথম কবিতা রচনা করেছিলেন বলেই লোকে আজও তাঁর নাম ভোলেনি। চারশ বছর আগেকার সেই হরিণ-চোরের নাম কি তোমরা শুনতে চাও? তিনি উইলিয়ম শেকসপিয়র।
ভেনাস ছোরার রহস্য
বৈঠকখানা। দুজনে চা পান করছিলেন। কমিশনার ডিটেকটিভ ইনস্পেকটর সুন্দরবাবুর সঙ্গে গোয়েন্দা বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ধরণীধর রায়চৌধুরী। ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে আসছে বসন্তকালের বৈকালী রোদ।
হঠাৎ দ্বারপথে দুই মূর্তিকে দেখে সুন্দরবাবু উল্লসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, হু, জয়ন্ত আর মানিক যে! বঁধুয়া অসময়ে কেন হে প্রকাশ?
মানিক বললে, অসময় মানে? চায়ের সময়ই তো ঠিক সময়। পথ দিয়ে যাচ্ছিলুম। আচম্বিতে দ্বারপথ দিয়ে আপনার তৈলমার্জিত সমুজ্জ্বল টাক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আর অমনি আমাদের পদচালনা হল অবরুদ্ধ। তারপর
পাছে সে ফস করে কোনও বেতালা কথা বলে ফেলে সেই ভয়ে সুন্দরবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, থাক, আর ব্যাখ্যান করতে বলতে হবে না! এগিয়ে এস, বসে পড়ো। (ভৃত্যের উদ্দেশে সচিৎকারে)–ওরে, আর দু-পেয়ালা চা! (গলা নামিয়ে) জয়ন্ত, সুবিখ্যাত অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ধরণীধর রায়চৌধুরীর সঙ্গে বোধহয় তোমাদের আলাপ-পরিচয় নেই? ইনিই তিনি। ধরণীবাবু, এরা হচ্ছে জয়ন্ত আর মানিক। আমার মুখে এদের নাম শুনেছেন বোধহয়।
