আমাদের তখন আর কথা বলবার শক্তিও ছিল না। অভিভূত প্রাণে বিজেতা ও বিজিতের দেহ সেই নির্জন অরণ্যের মধ্যে ফেলে রেখে আমরা দুজনে পায়ে পায়ে চলে এলুম।
পশুদেহ হলেও সম্মুখ যুদ্ধে মৃত সেই দেহ দুটিতে হাত দেওয়া অধর্ম!
.
দ্বিতীয়। রাতের অতিথি
সিংহের চেয়ে গরিলা বধ করবার জন্যেই আমার ঝোঁক ছিল বেশি! আফ্রিকার বনে-বনে সিংহের অভাব নেই, তাদের দলে দলে বধ করেছে এমন লোকও অসংখ্য। কিন্তু গরিলা হচ্ছে দুর্লভ জীব। পৃথিবীর খুব কম চিড়িয়াখানায় গরিলা দেখতে পাওয়া যায়। আফ্রিকাতেও গরিলার সংখ্যা খুব কম। তার ওপরে দৈহিক শক্তিতে ও মানসিক বুদ্ধিতে তারা পশুরাজ্যে অতুলনীয় বলে অধিকাংশ শিকারি তাদের কাছে ঘেঁষতেও ভরসা পায় না।
কিভুর অরণ্য হচ্ছে গরিলাদের রাজত্ব। আমি এখন সদলবলে এইখানেই এসে হাজির হয়েছি।
একটি ছোট খাত দিয়ে জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে, স্থানীয় ভাষায় তাকে কানিয়ানামা গুফা বা মৃত্যু-খাত বলে ডাকা হয়। এর এমন ভয়ানক নাম কেন তা পরীক্ষা করবার সুযোগ পাইনি। এরই আশেপাশে রয়েছে প্রকাণ্ড বাঁশবন–এখানকার ভাষায় যাকে বলে রুগানো। এইখানেই সর্বপ্রথমে আমি গরিলার পদচিহ্ন দেখতে পেলুম।
কচি বাঁশের রসালো অঙ্কুর হচ্ছে গরিলার শখের খাবার। এখানে বন বলতে বুঝায় প্রধানত বাঁশের বন। মাইলের পর মাইল চলে গেছে কেবল বাঁশবনের পর বাঁশবন এবং তাদের ভিতর থেকে মেঘ-ছোঁয়া মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মিকেনো, কারিসিম্বি ও বাইশোক নামে তিনটি আগ্নেয়গিরি। ওই সব পাহাড়ের দুর্গম স্থানগুলিও বাঁশবনের অধিকারভুক্ত হয়েছে। সেখানে বাঁশের ঝাড় এত ঘন যে, গাছ না কেটে কিংবা হামাগুড়ি না দিয়ে তার ভিতরে ঢোকা বা নড়াচড়া করা যায় না। বাঁশবনের কাছে কাছে নীচে রয়েছে জলবিছুটি গাছ, লালাভ সাদা ফুসিয়া জাতীয় পুষ্পগুল্ম, অজস্র ফুলে ভরা দোপাটি গাছ, শ্বেতবর্ণ ভেরোনিকা গুল্ম এবং বেগুনি, হলদে ও আলতা রঙা রাশি রাশি অর্কিড!
এইসব বনে বেড়িয়ে বেড়ায় দলে দলে গরিলা, মহিষ ও হস্তি। চিতাবাঘ ও অন্যান্য হিংস্র জন্তুর অভাবও এখানে নেই। এক বনের কচি বাঁশ সাবাড় হয়ে গেলেই গরিলারা অন্য বনে গিয়ে আশ্রয় নেয়। মানুষের মতন অনেকটা দেখতে হলেও তারা মানুষের মতো সভ্য নয়, তাই উদর চিন্তায় তাদের ব্যতিব্যস্ত হতেও হয় না, খাবার কেনবার জন্যে পয়সা রোজগার করতেও হয় না! বনে গাছ আছে, ভেঙে খাও, নদীতে জল আছে, চুমুক দাও! তারপর গাছের ডাল পাতা ভেঙে নরম বিছানা তৈরি করো, এবং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিব্যি আরামে জোরসে নাক ডাকাও! গরিলারা কী সুখেই আছে!
কিভু-অরণ্যে দুরকম গাছ বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একরকম গাছের নাম দেশি ভাষায় মুসুঙ্গুরা। তার পাতাগুলি খুব ছোট এবং তাতে গোলাপের মতন দেখতে হলদে হলদে ফুল ফোটে। লম্বায় পঞ্চাশ-ষাট ফুট উঁচু হয়! আর একরকম গাছের নাম মুগেসী। তার পাতা আখরোট পাতার মতন এবং তার উচ্চতা একশো ফুট পর্যন্ত হয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসে তাতে ম্যাজেন্টার আভা মাখানো বেগুনি রঙের থোলো থোলো ফুল ফোটে। পূর্বোক্ত দুই গাছের উপরেই সবুজ ও সোনালি রঙের শৈবালের বিছানা পেতে জেগে থাকে সব রঙিন ও বিচিত্র অর্কিডরা! এখানে আরও যে কতরকম বাহারি ফুল দেখলুম তা আর বলা যায় না! এ যেন ফুলের দেশ!
কিন্তু এই ফুলের দেশেই আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি কবিতার খাতা নিয়ে নয়, হত্যাকারী বন্দুক ঘাড়ে করে!
গরিলা শিকারের একটা মস্ত সুবিধা আছে। অনেক খুঁজে কষ্ট পেয়ে তবে সিংহ বা বাঘের পাত্তা মেলে। কিন্তু একবার গরিলাদের দেশে আসতে পারলে তাদের দর্শন পেতে বেশি দেরি হয় না, তার কারণ, তারা থাকে দলবদ্ধ হয়ে। একে তো তাদের প্রত্যেকের গায়ে অসুরের মতন জোর, সিংহও জোরে তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে কি না সন্দেহ, তার ওপরে তারা যখন দল বেঁধে থাকে, তখন হাতি পর্যন্ত গরিলাদের কাছে তুচ্ছ বলে গণ্য হয়। তারা নিজেদের এই প্রতাপ ভালো করেই জানে, তাই কোনও শত্রু বোকার মতন কাছে এসে উঁকিঝুঁকি মারলে সেটার দিকে ভ্রূক্ষেপ মাত্র করে না! সিংহ বা মানুষ দেখলে প্রথমে তারা অবহেলা প্রকাশ করে, কাছে এগিয়ে এলে মুখ খিঁচিয়ে দু-চার বার ধমক দেয়, কিন্তু যে শত্রু তাতেও সাবধান না হয়, তার কপাল বড় মন্দ! গরিলা চলে-ফেরে গদাইলশকরি চালে ধীরে ধীরে, এমনকী খুব বেশি বিপদে না পড়লে দৌড়োদৌড়ি করে শরীরকে সে ব্যস্ত করতে চায় না। এইসব কারণে গরিলার পিছু নেওয়া অনেকটা সহজ।
গরিলাদের সন্ধানে কিভু অরণ্যে এসে এক জাতের মানুষ দেখে অবাক হয়েছি। ইংরেজিতে এদের নাম পিগমি, আমি বালখিল্য বলতে চাই। পৃথিবীতে এই বালখিল্যদের চেয়ে ছোট আকারের মানুষ আর চোখে পড়ে না, মাথায় এরা আমার কোমরের চেয়ে উঁচু নয়। দূর থেকে এই বালখিল্যদের দেখলে মনে হয়, যেন একদল নয়-দশ বছরের ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
বাল্যখিল্যদের রং কুচকুচে কালো, চুল কোঁকড়া, নাক থ্যাবড়া, কোমরে খালি তেলেচোবানো একটুকরো ন্যাকড়া ঝোলে। ছোট চেহারা হলেও এদের দেহ খুব বলিষ্ঠ, সুদৃঢ় মাংসপেশিগুলো দেহের ওপরে ফুলে ফুলে ওঠে! এবং এরা পরম সাহসী। নিজেদের দেহের মতনই ছোট ছোট বর্শা নিয়ে এরা গভীর জঙ্গলে শিকার করতে ঢোকে ও বড় বড় বড় হাতি আর বন্যমহিষ বধ করে! শিকারই এদের একমাত্র জীবিকা। শাকসবজি, শিকড় খেয়েই এরা দিন কাটাতে পারে, যখন মাংস খাবার সাধ হয় তখন তিরধনুক বা বর্শা নিয়ে বনে গিয়ে শূকর বা হরিণ মেরে আনে। বালখিল্যরা আফ্রিকার অন্য কোনও বাসিন্দাদের সঙ্গে মেলামেশা করে না। সবুজ বনের ভিতরে নৃত্যশীল নদীর তীরে ছোট ছোট পাতার কুঁড়ে বানিয়ে পরম শান্তিতে তারা সরল জীবন কাটিয়ে দেয় এবং সভ্যতার কোনও ধারই ধারে না।
