একদিন শ্যামল বাংলার এক কালো শিশু হয়তো গ্রামের পথে বা নদীর ধারে আপন মনে নেচে-খেলে বেড়াচ্ছিল; কিংবা হয়তো সে স্নেহময়ী মায়ের কোলে নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমিয়ে খেলার স্বপন দেখছিল। হয়তো তার নাম ছিল কালু বা ভুলু, কানাই বা বলাই। হয়তো সে ছিল বাঙালি মুসলমানের ছেলে–তার নাম ছিল করিম বা অন্য কিছু। এসব বিষয়ে ঠিক করে আমি কিছু বলতে পারি না। কারণ ইতিহাস এ-সম্বন্ধে নীরব। ইতিহাস কেবল বলে, ওই অনামা খোকাটি, বাংলারই ছেলে।
গ্রামে হানা দিতে এসে ফিরিঙ্গি-বোম্বেটের শনির দৃষ্টি পড়ল হঠাৎ সেই খোকাটির ওপরে। তাদের মনে পড়ে গেল ইউরোপের সুন্দরীমহলে কৃষ্ণবর্ণ শিশু-গোলামের ভারি আদর! এ কাফ্রি শিশু নয় বটে, কিন্তু রং যার সাদা নয়, তাকে কাফ্রি ছাড়া আর কিছু বলা চলে না।
বোম্বোটেরা বাংলার সেই দুলালকে চুরি করে পালিয়ে গেল।
সেদিন সেই শিশু মাকে হারিয়ে এবং তার মা কোলের ছেলেকে হারিয়ে কত কেঁদেছিল, ইতিহাস তার বর্ণনা করেনি, কিন্তু আমরা অনুমান করতে পারি। আরও কল্পনা করতে পারি, সেখানকার সেই কান্না সারাজীবনই জেগে ছিল তার বুকের ভিতরে। এবং যারা তার এই কান্নাকে স্থায়ী করেছিল, সে যে তাদের ক্ষমা করতে পারেনি, এটাও আমরা জানতে পারব যথাসময়ে।
.
গ
চলো, তোমাদের কত সাগর কত নদীর ওপারে, কত যুগ আগেকার নতুন দেশে নিয়ে যাই।
দেশের নাম হচ্ছে, ফ্রান্স। দুশো বছর আগে ইউরোপে ফ্রান্সের তুলনা ছিল না। ফরাসিরা যে খাবার খায়, সারা ইউরোপ তাই খেতে ভালোবাসে; ফরাসিরা যে পোশাক পরে, সারা ইউরোপ তারই নকলে সাজগোজ করে।
এই বিখ্যাত দেশের মস্ত রাজা তখন পঞ্চদশ লুই। একদিকে লুই যে নির্দয় রাজা ছিলেন, তা নয়; কিন্তু রাজা হতে গেলে যে-যে গুণের দরকার, পঞ্চদশ লুইয়ের মধ্যে তা ছিল না। তিনি রাজকার্য দেখতেন না, সর্বদাই তুচ্ছ আমোদ-প্রমোদ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকতেন। ফলে ফ্রান্স হয়ে পড়ে অরাজক দেশের মতো এবং প্রজাদের হয় অত্যন্ত দুরবস্থা। এইজন্যেই পঞ্চদশ লুইয়ের মৃত্যুর পর ষোড়শ লুইয়ের রাজত্বকালে প্রজারা খেপে উঠে বিদ্রোহী হয়ে রাজা-রানি ও আমির-ওমরাহদের হত্যা করে। ইতিমধ্যে ওইসব ঘটনা ফরাসি বিপ্লব নামে বিখ্যাত।
কাউন্ট দ্যু’ব্যারির বউয়ের সঙ্গে পঞ্চদশ লুইয়ের অত্যন্ত বন্ধুত্ব হয়–সে মাদাম দ্যু’ব্যারি নামে সুপরিচিত।
দ্যু’ব্যারি ছিল খুব সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী। রাজা তার গল্প শুনতে ভালোবাসেন, তার পরামর্শে ওঠেন বসেন। দ্যু’ব্যারির মুখের কথায় বড়-বড় ওমরাকে রাজপদ থেকে বঞ্চিত করা হয়, আবার তার একটি ইঙ্গিতে পথের ভিখারিও আমির হয়ে দাঁড়ায়! সকলেই তার অনুগ্রহ লাভের জন্যে ব্যস্ত। কারণ, আগে সে খুশি না হলে, রাজা খুশি হন না!
দ্যু’ব্যারি রাজবাড়িরই এক মহলে থাকে। রাজা নিত্য তাকে দামি-দামি ভেট পাঠান। নয় মণ ওজনের সোনার তাল এনে রাজা তার ড্রেসিং টেবিলের আসবাব গড়িয়ে দিলেন! তার এক-একটি পোর্সিলেনের কফির পিয়ালার দাম হাজার-হাজার টাকা। তার জামাকাপড়ের দাম যে কত লক্ষ টাকা, সে হিসাব রাখা অসম্ভব। তার জড়োয়া গহনার বিনিময়ে একটি রাজ্য বিকিয়ে যায়! এইভাবে দ্যু’ব্যারির মন রাখবার জন্যে রাজা দু-হাতে প্ৰজার টাকা খরচ করেন। রাজ্যময় অভাবের হাহাকার, কিন্তু প্রজাদের কাছ থেকে কেড়ে আনা অর্থে দ্যু’ব্যারির প্রমোদ কক্ষ আলোকোজ্জ্বল! দ্যু’ব্যারির নাম শুনলে প্রজারা জ্বলে ওঠে!
একটা তুচ্ছ নারীর শক্তি রাজার চেয়েও বেশি দেখে দেশের আমির-ওমরারাও দ্যু’ব্যারির উপরে খঙ্গহস্ত হয়ে উঠল।
দ্যু’ব্যারির একটি কাফ্রি খোকা-গোলাম পোশবার শখ হল। বাজার থেকে তখনি একটি গোলাম কিনে আনা হল–যেমন করে কিনে আনা হয় বানর বা কুকুর।
সে হচ্ছে ফিরিঙ্গীদের চুরি করে আনা আমাদের সেই বাংলার অনামা ছেলে।
.
ঘ
সোনার খাঁচায় বন্দি করলে বনের পাখি কি খুশি হয়? দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে বাপ-মায়ের আদরের কোল হারিয়ে বাংলার ছেলে ফিরিঙ্গি রাজবাড়ির গোলামি পেয়ে কি খুশি হয়েছিল? একটু পরেই আমরা জানতে পারব।
গোলামকে দ্যুব্যারির ভারি পছন্দ হল! পোশা কুকুরকে নাম দিতে হয়, নতুন গোলামকে কি-নামে ডাকা যায়?
সবাই শুধোয়, ওরে, তোর নাম কী?
বাঙালির ছেলে, ফরাসি ভাষা জানে না, কাজেই চুপ করে থাকে।
তখন একজন প্রিন্স তার নাম দিলেন, জামোর! ইতিহাসে বাংলার ছেলে এই নামেই বিখ্যাত হয়ে আছে।
দ্যু’ব্যারির কৃপায় জামোর খাঁটি সোনার কাজ-করা বহুমূল্য পোশাক পেলে। তার জন্যে ব্যবস্থা হল ভালো-ভালো খাবারের। রাজবাড়ির ঘরে-ঘরে দ্যু’ব্যারির আদরের দুলাল হেসে-নেচে খেলে বেড়ায়। যেখানে আমির-ওমরাহর প্রবেশ নিষেধ, সেখানেও জামোরের অবাধ গতি! আমির ওমরাহরা জামোরকে প্রসন্ন রাখতে ব্যস্ত, কারণ সে দ্যু’ব্যারির প্রিয়পাত্র! দ্যু’ব্যারি এক মিনিটও তাকে চোখের আড়ালে রাখতে পারেন না–এত তাকে ভালোবাসেন!
কিন্তু বাংলার ছেলে জামোর কি বুঝতে পারেনি, দ্যু’ব্যারি নিজের পোশা কুকুরকেও তার চেয়ে কম ভালোবাসেন না?
সাধারণ লোকেরা জামোরকে কাফ্রি বলেই জানত। কিন্তু ঐতিহাসিকরা স্পষ্ট ভাষায় তাকে native of Bengal বলে বর্ণনা করেছেন। বিখ্যাত ফরাসি চিত্রকর Decrenze দ্যু’ব্যারির সঙ্গে জামোরের একখানি তৈলচিত্র এঁকেছিলেন। দ্যু’ব্যারি কফির পেয়ালা নিয়ে পান করছেন, আর বালক জামোর ঠিক প্রিয় কুকুরের মতো কীর মুখের পানে চেয়ে ট্রে হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। তার রং কালো বটে, কিন্তু তার নাক-মুখ-চোখে কাফ্রিত্ব নেই। রাজচিত্রকর স্বচক্ষে জামোরকে দেখেই তার মূর্তি এঁকেছিলেন।
