অতঃপর সুন্দরবাবুর অবস্থাটা দেখা দরকার।
সিংহ-ভল্লুক-গন্ডারের গর্জন শ্রবণ করে সুন্দরবাবু অচেতন হয়ে পড়েছিলেন, এখন তার মূর্ছা ভেঙে গেল বন্দুকের শব্দে। তিনি বলে উঠলেন, হুম! ঘন ঘন বন্দুকের শব্দ হচ্ছে। যে! তাহলে তুমুল লড়াই শুরু করে গেছে? কিন্তু এখানে যে দুটো ভূতুড়ে জানোয়ারের নমুনা দেখেছি বাবা, তাদের সঙ্গে লড়াই করে কখনও পেরে ওঠা যায়? যাদের চেহারা দেখলেই পেটের পিলে যায় চমকে, তাদের সঙ্গে লড়ব কেমন করে? এখান থেকে লম্বা দেওয়ারও কোনও উপায় নেই, মহাসমুদ্রের মাঝখানে পুঁচকে একটা দ্বীপ, তারই মধ্যে হয়েছি বন্দি! ঝোপের বাইরেও পা বাড়াতে ভরসা হয় না, কে জানে বাবা কোথায় ঘুপটি মেরে বসে আছে বদমেজাজি কিম্ভুতকিমাকারের দল! হুম কী যে করি! ওরে বাপ রে! এ আবার কী?
বিপুল বিস্ময়ে এবং বিষম আতঙ্কে সুন্দরবাবুর বিস্ফারিত চক্ষু দুটো গোল হয়ে উঠল চাকতির মতো!
থরথর করে কাঁপতে লাগল পায়ের তলাকার মাটি, তার পরেই শোনা গেল যেন অসম্ভবরূপে বিরাট এক মহাদানবের বিশ্ব-ফাটানো ভৈরব হুংকারের পর হুংকার! তার পরেই দেখা গেল, পাহাড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে পুঞ্জীভূত ধূম্ররাশি এবং থেকে-থেকে ঠিকরে ঠিকরে উঠছে মেঘচুম্বী প্রচণ্ড অগ্নিশিখা।
দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল বহু জীবের ভীত কণ্ঠস্বরের একটানা আর্তনাদ। এও দেখা গেল, অনেক তফাতে দলে দলে জীব কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো ছুটোছুটি করছে দিকে দিকে, কিন্তু সেগুলো মানুষ কি জানোয়ার কিছুই বোঝা যায় না।
দুই হাত দিয়ে চেপে বুকের কাপুনি থামাবার চেষ্টা করে সুন্দরবাবু মনে-মনেই বললেন, এ আবার কি কাণ্ড বাবা? পৃথিবীর প্রলয়কাল এল নাকি?
ঝোপের বাইরে অনেকগুলো দ্রুত পায়ের শব্দ শুনে সুন্দরবাবুর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল। তিনি আবার বুঝি অজ্ঞান হয়ে যান!
তারপরে শোনা গেল বিমল চিৎকার করে বলছে, আগ্নেয়গিরি জেগে উঠছে! পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসছে তপ্ত লাভার স্রোত! দ্বীপের সমস্ত প্রাণী মারা যাবে। নৌকো ভাসাও, নৌকো ভাসাওজাহাজে চলো!
মানিকের গলায় শোনা গেল–জয়ন্ত, জয়ন্ত! সুন্দরবাবু কোথায় গেলেন? সুন্দরবাবু?
এই যে আমি, এই যে আমি বলতে-বলতে সুন্দরবাবু হাঁসফাস করতে করতে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
মানিক তাঁর হাত ধরে ছুটতে ছুটতে বললে, আর নয়, এই অভিশপ্ত দ্বীপে আর নয়! প্রাণে বাঁচতে চান তো প্রাণপণে দৌড়ে চলুন!
জাহাজ ছুটছে। তার আর দ্বীপের মাঝখানে এখন অনেকখানি ব্যবধান।
কিন্তু দ্বীপের দিকে তাকালে এখন কেবল দেখা যায় বিপুল ধুম্রপুঞ্জের সঙ্গে বিরাট অগ্নিকাণ্ড। আগুনের শিখায় লালচে হয়ে উঠছে ওখানকার আকাশ পর্যন্ত।
বিমল দুঃখিতভাবে বললে, বিদায় ডা. মোরোর দ্বীপ! মনে এই আক্ষেপ রয়ে গেল তোমার সমস্ত রহস্য জানা গেল না।
সুন্দরবাবু রেগে তিনটে হয়ে বললেন, আবার আপনি রহস্যের নাম মুখে আনছেন? রহস্য! যতদিন বাঁচব আর কখনও কোনও রহস্যেরই ধার মাড়াব না–হুম!
ফরাসি বিপ্লবে বাঙালির ছেলে
ক
কিছু কম দুশো বছর আগেকার কথা।
পৃথিবীর স্থলপথে তখন ডাকাতদের ভিড়, আর জলপথে বোম্বেটেদের জয়যাত্রা। পৃথিবীর দেশে-দেশে তখন দাস-ব্যবসা চলছে পুরোদমে। বোম্বেটেরা জলে করত যাত্রীদের জীবন ও সর্বস্ব হরণ এবং আফ্রিকায় ডাঙায় নেমে করত কালো মানুষ চুরি। লাল মানুষদের দেশ আমেরিকার উড়ে গিয়ে জুড়ে বসে সাদা-মানুষরা গোলাম আর কুলির কাজে খাটাবে। বলে এইসব কালো মানুষকে দাম দিয়ে কিনে নিত।
কালো মানুষ বলতে সাধারণত বোঝায়, কাফ্রিদের। হতভাগ্য কাফ্রি জাতি! ইতিহাসের প্রথম যুগ থেকেই দেখি, পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশেই কাফ্রিরা বন্দি হয়ে গোলাম রূপে হাড়ভাঙা খাটনি খাটছে! রোমে, আরবে–এমনকী, ভারতেও রাজাবাদশা ও বড়লোকদের ঘরে ঘরে কাফ্রি গোলাম রাখার প্রথা ছিল।
আঠারো শতাব্দীতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে সন্ত্রান্ত সমাজের সুন্দরী বিলাসিনীরাও শখ করে কাফ্রি গোলাম পুষতেন। গোলামদের গায়ের রং সাদা নয় বলে তাদের মানুষ বলেই মনে করা হত না। আমরা যেমন কুকুর, বিড়াল ও পাখিদের আদর করে পুষি, অথচ তাদের উচ্চতর জীব বলে মনে করি না, ইউরোপীয় শৌখিন মেয়েরাও ওই কাফ্রি গোলামদের সেইভাবেই দেখতেন। দিগ্বিজয়ী সম্রাট নেপোলিয়নের ছোট বোন পলিন স্পষ্টই বলেছিলেন, কাফ্রিদের সামনে। আবার লজ্জা করব কেন? কাফ্রিরা মানুষ নাকি?
আর-একটা কথা জানিয়ে রাখি। ইউরোপীয় সুন্দরীদের কাছে তখন সবচেয়ে বেশি আদর ছিল, কাফ্রি জাতের ছোকরা গোলামদের।
.
খ
বাঙালিদের রং কাফ্রিদের মতন কালো নয় বটে, কিন্তু তামাটে। সাহেবদের চোখে তামাটে ও কালো রঙের মধ্যে কোনও তফাত ধরা পড়ে না। তারা দুই রংকেই এক বলে ধরে নিয়ে গালাগালি দেয়। অথচ পর্তুগাল ও স্পেনের অনেক ইউরোপীয়েরও গায়ের রং অনেক ভারতবাসীর চেয়ে কালো। কিন্তু ইউরোপে জন্মেছে বলে তারা কালো হলেও কালো নয়!
প্রায় দুশো বছর আগে বাংলায় ছিল ফিরিঙ্গি-বোম্বেটেদের বিষম দৌরাত্ম।
পূর্ব-বাংলা নদনদী প্রধান বলে ফিরিঙ্গি-বোম্বেটে সেইখানেই অত্যাচার করবার সুবিধা পেত বেশি। তারা নৌকোয় ও ছোট ছোট জাহাজে চড়ে নদী বেয়ে দেশের ভিতরে ঢুকত। মাঝে-মাঝে ডাঙায় নেমে গ্রাম বা শহর লুট করে আবার পালিয়ে যেত। বোম্বেটেদের জ্বালায় পূর্ব-বাংলা তখন অস্থির হয়ে উঠেছিল।
