প্রসিদ্ধ ফরাসি লেখক গনকোর্ট এই বলে জামোরের বর্ণনা করেছেন; তাকে বিকটাকার মনুষ্যত্বের নমুনারূপে দেখা হত। সে সকলকে জলখাবারের থালা জোগাত, মেয়েদের ছাতা বহন করত, খুশি হলে ডিগবাজি খেত। আঠারো শতাব্দীর বিজাতীয় রুচি এই শ্রেণির ছোট্ট বিকৃতাকার জীবকে অত্যন্ত পছন্দ করত এবং নিগ্রোদের ভাবত ক্ষুদ্র দু-পেয়ে জন্তুর মতো!
বাংলার ছেলে জামোর ফ্রান্সে থেকে নিশ্চয়ই ফরাসি ভাষা শিখেছিল। এবং সে যখন শুনত, তাকে বিকটাকার কাফ্রি ও দুপেয়ে জন্তুর মতন দেখা হয়, তখন তার মন কি কত্রী ঠাকুরানির প্রতি কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠত? এত সানুগ্রহ সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্য কি তখন তার সর্বাঙ্গে বিষাক্ত কাঁটার মতো বিঁধত না? শীঘ্রই এর উত্তর পাওয়া যাবে!
বাঙালি হচ্ছে কাফ্রি! বাঙালি হচ্ছে–দু-পেয়ে জন্তু! কেন না তার চামড়া কটা নয়!
.
ঙ
ফ্রান্সের রাজার ছিল অনেক প্রাসাদ এবং প্রত্যেক প্রাসাদেই সর্বময় কর্তারূপে থাকতেন একজন করে গভর্নর। গভর্নরের পদে তখন পদবিওয়ালা সম্ভ্রান্ত লোক ছাড়া আর কারুকে বসানো হত না। একদিন রাজার কাছে দ্যু’ব্যারি আবেদন জানালে, মহারাজ আপনার লুসিয়েনেস প্রাসাদে গভর্নরের আসন খালি হয়েছে। আমার জামোরকে ওই আসনে বসাতে চাই!
পঞ্চদশ লুই চমকে উঠে বললেন, বলো কী! সম্ভ্রান্ত লোক ছাড়া আর কেউ যে গভর্নরের পদ পায় না। জামোর গভর্নর হলে অন্য-অন্য গভর্নরদের মান কোথায় থাকবে? রাজ্যের লোক কি মনে করবে?
দ্যু’ব্যারি বললে, রাজ্যের লোকের কথা আমি গ্রাহ্য করি না! এখানকার আমির-ওমরাহরা আমার শত্রু! আমি তাদের বুঝিয়ে দিতে চাই, আমার চোখে তারা জামোরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়!
রাজা হেসে বললেন, বেশ, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক! এসো জামোর, আজ থেকে তুমি গভর্নর! তোমার মাহিনা হল চারশো টাকা!
সে-যুগে চারশো টাকার দাম এখনকার চেয়ে ঢের বেশি ছিল!
যে-দেশে জামোরের জন্ম, সেখানে পশু-বানরের বিবাহে কোনও-কোনও মানুষ-বানর লাখ টাকা খরচ করেছে! সে-ও পোষা কুকুর-বিড়ালের মতন জীবন্ত খেলনা তাকে গভর্নরের পদে বসিয়ে তার মনুষ্যত্বের প্রতি সম্মান দেখানো হল না, বরং তার নীচতাকে যে উঁচু করে তুলে ধরা হল দেশের উচ্চপদস্থ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মাথা নীচু করবার জন্যেই, এটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধি যে বাঙালির ছেলে জামোরের ছিল না, একথা মনে করা চলে না।
গনকোর্ট হয়তো সেইজন্যেই বলেছেন, প্রাসাদ হল গভর্নর জামোরের বনের পাখির সোনার খাঁচার মতো!
বিকটাকার মানুষ, দু-পেয়ে জন্তু জামোর মহামান্য গভর্নর হয়ে মুখে নিশ্চয় একগাল হেসেছিল, কিন্তু তার অপমানিত মনের মধ্যে কী প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠেছিল, পরের দৃশ্যেই আমরা তা দেখতে পাব।
.
চ
পরের দৃশ্যের যবনিকা তুললুম প্রায় বিশ বৎসর পরে।
ইতিমধ্যে পঞ্চদশ লুই মারা পড়েছেন, ষোড়শ লুই কয়েক বৎসর রাজ্য করে, পূর্বপুরুষদের পাপে নির্দোষ হয়েও বিদ্রোহী প্রজাদের হাতে রানির সঙ্গে প্রাণ দিয়েছেন।
সমস্ত ফরাসি জাতি রক্ত-পিপাসায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে, সকলেরই মুখে এক কথা– এতদিন ধরে যারা প্রজাদের রক্ত শোষণ করেছে, আমাদের অনাহারে রেখে আমাদেরই কষ্টার্জিত অর্থে বিলাসের খেলনা কিনেছে, আজ তাদের রক্ত চাই!
জামোর সেদিন রাজবাড়িতে ছিল না, ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহী প্রজাদের সঙ্গে! সে আর বালক নয়, পূর্ণবয়স্ক যুবক। সেদিন সে আর কারুর গোলাম নয়, বাংলার সুনীল আকাশেরই মতন স্বাধীন! সেদিন সে ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, তাকে দু-পেয়ে জন্তু ভেবে এতদিন কারা তার মনুষ্যত্বকে ব্যঙ্গ করেছে!
বিচারালয়ের কাঠগড়ায় উঠে বন্দিনী দ্যু’ব্যারি সভয়ে স্তম্ভিতনেত্রে দেখলে, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াল, রাজবাড়ির পোষা জ্যান্তো খেলনা, বিকটাকার মনুষ্যত্বের নমুনা, জামোর! আজ জানমারের মুখে কৃপাপ্রার্থী আবদারের হাসি নেই, তার দুই চক্ষে জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের মুক্ত জাগ্রত মনুষ্যত্বের প্রতিহিংসা-বহ্নি!
জামোর একে-একে দ্যু’ব্যারির সমস্ত কথা প্রকাশ করে দিলে।
.
ছ
শেষ দৃশ্য।
চারিদিকে বিপুল জনতা। সকলেই চিৎকার করছে–মার, মার। যারা মনুষ্যত্বকে মর্যাদা দেয়নি, গরিবকে মানুষ ভাবেনি, তাদের সকলকে হত্যা কর।
গিলোটিনের তলায় হাড়িকাঠে গলা দিয়ে অভাগিনী দ্যু’ব্যারি সকাতরে চেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও, বাঁচাও। দয়া করো। আমার যথাসর্বস্ব দান করব।
ভিড়ের ভিতর থেকে নিষ্ঠুর ভাষায় কে বললে, তোমার যথাসর্বস্ব তো প্রজাদেরই নিজস্ব সম্পত্তি।
গিলোটিনের খাঁড়া নেমে এল। দ্যু’ব্যারির ছিন্নমুণ্ড আর কোনও কথা কইলে না।
এ-দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। জনতার ভিতরে কি জামোরও ছিল?
জানি না।
ইতিহাস আর তাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি।
শিকল-পরা বাঙালি গোলাম জামোর, ফরাসিদের সাহিত্যে ও চিত্রকলায় অমর হয়ে আছে। কিন্তু গোলামির শিকল খুলে স্বাধীন জামোর কোথায় গেল, সেকথা কেউ বলতে পারে না।
বনের পাখিকে সোনার খাঁচায় বন্দি করে কেউ ভেব না, তার প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করছ। তোমরা যাকে মনে করো পাখির আনন্দের গান, সে হচ্ছে পাখির দারুণ অভিশাপ।
বিখ্যাত চোরের অ্যাডভেঞ্চার
এক বিশ্ববিখ্যাত চোরের সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি। কিছু কম চারশো বছর আগে বিলাতে এই চোরের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু আজ সারা পৃথিবীর সব দেশই তাকে ঘরের লোকের মতন আদর করে। কেবল আদর নয়, শ্রদ্ধাও করে। আর কোনও চোরই পৃথিবীর কাছ থেকে এত সম্মান, এত ভালোবাসা পায়নি। এই সবচেয়ে বিখ্যাত চোরের নাম তোমাদেরও অজানা নয়। গল্প শুনতে-শুনতে তার নামটি আন্দাজ করো দেখি!
