সুন্দরবাবুও নিজের ঝোপে বসে সব দেখছিলেন এবং শুনছিলেন, এবং ক্ষণে ক্ষণে উঠছিলেন চমকে-চমকে! মাঝে-মাঝে এটাও ভাবছিলেন যে, এমন ভয়ানক জায়গায় এইভাবে একলা একটা ঝোপের ভেতরে বসে থাকা মোটেই নিরাপদ নয়! বিমলদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্যে তাঁর ইচ্ছা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছিল। বিখ্যাত প্রবাদ-বচনটি একটু বদলে নিয়ে মনে মনে তিনি বলছিলেন–দশে মিলি করি কাজ, হারি-মরি নাহি লাজ। শেষটায় সত্যসত্যই তিনি যখন নিজের ঝোপটি ত্যাগ করে বহির্গত হবার উপক্রম করছেন, তখন ঘটে গেল একটা অকল্পিত এবং ভয়ংকর ঘটনা।
হঠাৎ একদিক থেকে আকাশ-ফাটানো চিৎকার জাগল–ওরে বাবা রে, ভূতে ধরলে রে।
সুন্দরবাবু ভূতকে মানতেন অত্যন্ত বেশিরকম। ভূতের নাম শ্রবণ করলেই তার সর্বাঙ্গ হয়ে উঠত রোমাঞ্চিত–বিশেষত রাত্রিবেলায়। তদুপরি তিনি এখন যেখানে অবস্থান করছেন, তার মতে সেটা হচ্ছে দস্তুরমতো ভূতুড়ে দ্বীপ! সুতরাং সেই মুহূর্তেই তিনি ফিরে না তাকিয়ে পারলেন না! এবং সঙ্গে-সঙ্গে অতিশয় স্তম্ভিত চক্ষে যে অসম্ভব দৃশ্য অবলোকন করলেন তা হচ্ছে এই
রামহরি ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে এবং তার পেছনে-পেছনে তাড়া করে আসছে মূর্তিমান দুঃস্বপ্নের মতো সেই বিভীষণ জীবটা? উঃ, সুন্দরবাবু প্রায় মূৰ্ছিত হয়ে ধরাশায়ী হন আর কি!
দেখা যাচ্ছে হাতির মতো প্রকাণ্ড একখানা আশ্চর্য মুখ! হাতির মতো প্রকাণ্ড বটে, কিন্তু সেটা মোটেই হাতির মুখ নয়! সে যেন খানিক সিংহ, খানিক ভল্লুক, খানিক গন্ডারের মুখ নিয়ে ভেঙে-চুরে অথচ মিলিয়ে মিশিয়ে গড়া! তার দুটি ক্ষুধিত চক্ষে দপদপ করে জ্বলছে দারুণ হিংসার অগ্নি!
সুন্দরবাবু প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলেন, হুম, হুম, হুম।
পরমুহূর্তেই দেখা গেল বাঘাকে, এবং শোনা গেল তার ক্রুদ্ধ চিৎকার! মস্ত একটা লাফ মেরে বাঘা সেই মুখখানার পেছনে এসে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর সে কী কান ফাটানো প্রাণ-দমানো তর্জন-গর্জন এবং কী ঝটাপটি, লাফালাফি ও হানাহানি!
সুবাবু আর পারলেন না, দুই নেত্রে সরষেফুল দেখে বাবা রে বলে চেঁচিয়ে উঠেই অজ্ঞান হয়ে ধড়াস করে পড়ে গেলেন মাটির উপরে!
অন্যান্য সকলেই সেই দৃশ্য দেখেছিল। বিমল তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললে, কুমার, আমার সঙ্গে এসো। জয়ন্তবাবু! মানিকবাবু! আপনারা এইখানেই বসে ওইদিকে দৃষ্টি রাখুন।
বিমল ও কুমার বেগে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে দেখলে, সেই কিম্ভুতকিমাকার, সিংহ ভল্লুক গন্ডারের মতো দেখতে মস্ত মুখখানার পেছনে কণ্ঠদেশ কামড়ে রয়েছে বাঘা! সেই অদ্ভুত জন্তুটা বাঘার কবল থেকে মুক্ত হবার জন্যে বাঘাকে নিয়েই বারংবার মাটির ওপর থেকে লাফ মেরে শূন্যে উঠে আবার মাটির ওপরে এসে পড়ে ছটফট করছে এবং গড়াগড়ি দিচ্ছে; কিন্তু বাঘা যেন ছিনে জোঁক দাঁতের কামড় একটুও আলগা করতে রাজি নয়!
গুড়ুম! গুড়ুম! গর্জে উঠল বিমল ও কুমারের বন্দুক।
সিংহ-ভল্লুক-গন্ডারের মুখ আর একবার বাঘাকে নিয়ে শূন্যে লম্ফত্যাগ করে আবার ধরাশায়ী হয়ে দুই-একবার ছটফট করে স্থির হয়ে গেল।
কুমার বন্দুকের অগ্রভাগ দিয়ে সেই জীবটার দেহকে পরীক্ষা করে বললে, আয় রে আমার বাঘাআয় রে আমার মহাবীর! ওটা একেবারে পাথরের মতো মরে গিয়েছে, সাঙ্গ হয়েছে ওর লীলাখেলা!
বিমল বিস্ফাতির নেত্রে বললে, ভাই কুমার! ডা. মোরোর বিচিত্র খেয়াল এ কী জন্তু সৃষ্টি করেছে! দেখো, এত বড় হাতির মতো মুখ, কিন্তু এই মুখের তলায় রয়েছে মাত্র হাত দেড়েক লম্বা আর হাত খানেক চওড়া একটা থলের মতো দেহ! আর সেই দেহের তলায়। রয়েছে কুমিরের পায়ের মতো চারখানা ছোট ছোট পা! এ যেন পর্বতের মুষিক প্রসব!
ঠিক সেই সময়ে ওদিক থেকে জয়ন্ত চিৎকার করে বললে, বিমলবাবু! কুমারবাবু!
বিমল ও কুমার আবার দ্রুতবেগে হাজির হল গিয়ে যথাস্থানে।
জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, ওদিকে তাকিয়ে দেখুন, চারপায়ে হাঁটা জীবগুলোর সঙ্গে দুইপায়ে হাঁটা জীবগুলোর লড়াই বেধে গিয়েছে!
বিমল খানিকক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে বললে, তাই তো দেখছি। ওদের মধ্যে যারা নিজেদের মানুষ বলে গর্ব করে, নিশ্চয়ই তারা হিংসুক জীবগুলোকে বাধা দিতে চায়।
মানিক বললে, অদ্ভুত কাণ্ড-কারখানা! এই অজানা দ্বীপেও আছে আমাদের না-জানা বন্ধু।
কুমার বললে, বিমল, অন্য-অন্য জীবরা মারামারি নিয়ে ব্যস্ত বটে, কিন্তু সেই ফাঁকে তিনটে মূর্তি চুপি চুপি আমাদের দিকে আসছে দেখতে পাচ্ছ?
বিমল আবার দূরবিনের সাহায্য গ্রহণ করে বললে, কুমার, কুমার! দুটো মূর্তির গায়ের রং, চিতাবাঘের মতো! চাটগাঁয়ে গিয়ে তুমি এমনি মুর্তিই দেখেছিলে না?
নরপশু তিনটে ঝোপঝাপ ও গাছপালার আড়ালে আত্মগোপনের চেষ্টা করতে-করতে অনেকটা এগিয়ে এল।
বিমল বললে, ওদের আর কাছে আসতে দেওয়া নয়। ছোড়ো সবাই বন্দুক। এক, দুই, তিন।
একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুক গর্জন করে উঠল। একটা মূর্তি লাফ মেরে উঠেই মাটির ওপরে আছড়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। আর-একটা মূর্তি ধরাশায়ী হয়ে আর একটুও নড়ল না। তৃতীয় মূর্তিটা বেগে পলায়ন করলে।
বন্দুকের ভীষণ গর্জন শুনেই নরপশুরা মারামারি থামিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল চিত্রার্পিতের মতো। তার পরেই কতকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে বলে উঠল, আবার আমাদের প্রভুরা এসেছেন! এইবারে আমাদের শাস্তি পেতে হবে!
