অভুক্ত অবস্থাতেই কেবল এক পেয়ালা কফি পান করেই বিমলদের সঙ্গে তিনি গাত্রোত্থান করলেন। তাঁবুর বাইরে পদার্পণ করবার ইচ্ছা তার একটুও ছিল না। নিতান্ত চক্ষুলজ্জার খাতিরেই সকলের পেছনে পেছনে তিনি সুড়সুড় করে এগুতে লাগলেন ঠিক যেন বলির পাঁঠার মতো।
বিমল ভুল বলেনি, সত্যিই সেদিনকার রাত্রিটি ছিল কবিত্বময়। দূরে মহাসাগরের ভৈরব রাগের সঙ্গে কাছের নটিনী তটিনী জলবীণার তারে তারে বাজছিল অতি মৃদু একটি রাগিণীর গুঞ্জন। আকাশের তারা-সভায় জেগে ছিল সভাপতি চাঁদ। তালজাতীয় গাছগুলি দুলে দুলে উঠছিল বাতাসের তালে-তালে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাথার পাতায়-পাতায় জ্যোত্মা পরিয়ে দিচ্ছিল ঝকমকে বিজলি-হার। আরও দূরে স্তব্ধ পাহাড় ও নিথর বনভূমিকে দেখাচ্ছিল স্বপ্ন-জগতের পরিপুরীর মতো।
কিন্তু এই শান্তি-সুষমা সুন্দরবাবুকে অভিভূত করতে পারলে না। তার মতে, ঝড়ের আগে প্রকৃতিও এমনি শান্ত ভাব ধারণ করে। যে-কোনও মুহূর্তে এখানে কি কুরুক্ষেত্র কাণ্ড বাধবার সম্ভাবনা, তাই ভেবে ভেবেই তিনি হয়ে পড়লেন যারপরনাই কাতর! কিন্তু সেই কাতরতার ভেতরেও তিনি পৈতৃক প্রাণটি রক্ষা করবার সঠিক উপায় খোঁজবার জন্যে এদিকে ওদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করতে ভুললেন না।
এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল পরস্পরের দিকে হেলে পড়ে তিনটি তাল-জাতীয় গাছ। তারই তলায় রয়েছে একটি নাতিবৃহৎ ঝোপ এবং ঝোপের ভেতর থেকে মাথা চাগাড় দিয়ে উঠেছে মস্ত একখানা পাথর। সুন্দরবাবু বুঝলেন ও জায়গাটা তাঁর পক্ষে হবে অনেকটা নিরাপদ।
বিমলের দিকে ফিরে তিনি বললেন, বিমলবাবু, ওই তিনটে গাছের তলায় বসে আমি যদি পাহারা দি, তাহলে আপনাদের কিছু আপত্তি আছে কি?
বিমল জায়গাটার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সুন্দরবাবুর মনোভাব বুঝে মুখ টিপে হেসে বললেন, আপত্তি? কিছুমাত্র না।
মানিক বললে, কিন্তু সুন্দরবাবু, একটু হুঁশিয়ার হয়ে ওখানে যাবেন।
সুন্দরবাবু অগ্রসর হচ্ছিলেন, কিন্তু মানিকের কথা শুনে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, হুঁশিয়ার হয়ে যাব! কেন বলো দেখি?
কে বলতে পারে ওই ঝোপের তলায় আপনার হনুমান-বিছের মতো কোনও বিদকুটে জন্তু-টন্তু লুকিয়ে নেই?
সুন্দরবাবু মানিকের কথা নিতান্ত অসংগত মনে করতে পারলেন না। অত্যন্ত সন্দিগ্ধ ভাবে ঝোপটার দিকে একবার তাকিয়ে জয়ন্তের দিকে ফিরে বললেন, হ্যাঁ ভাই জয়ন্ত, তুমি একবার আমার সঙ্গে ওই ঝোপ পর্যন্ত এগিয়ে যাবে?
কেন সুন্দরবাবু?
ভায়া হে, একজোড়া চোখের চেয়ে দু-জোড়া চোখের দাম বেশি। দুজনে মিলে ঝোপটা একবার পরীক্ষা করে দেখব, ওখানে যাচ্ছেতাই কিছু ঘুপটি মেরে আছে কিনা!
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে সুন্দরবাবুর সঙ্গে অগ্রসর হয়ে সেই ঝোপ পর্যন্ত গেল। না, সেখানে। সন্দেহজনক কিছুই আবিষ্কৃত হল না। সুন্দরবাবু তখন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে চার হাতে পায়ে গুঁড়ি মেরে ঝোপের ভেতরে ঢুকে বললেন, হুম! কপালে আজ কি লেখা আছে কে, জানে?
রাত্রির মৌনব্রত ভাঙবার চেষ্টা করছিল অশান্ত মহাসাগরের অশান্ত জল-কল্লোল। আকাশ সায়রে সাঁতার কেটে চাঁদ এগিয়ে এসেছে অনেকখানি। চারদিকে পুলক ছড়িয়ে দিয়েছে স্বচ্ছ আলোক। এখানে-ওখানে ছায়ার সঙ্গে লুকোচুরি-খেলা খেলছে জ্যোত্সা। মাঝে-মাঝে ছোট নদীর ক্ষীণ রেখাঁটি দেখা যাচ্ছে গলাননা হিরার মতো।
কেটে গেল প্রথম রাত্রি।
প্রকৃতির ভেতরে আলোকোৎসব হচ্ছে বটে, কিন্তু জ্যোত্সাকেও হার মানিয়ে দেয় এমন একটা সুতীব্র ও সুদীর্ঘ আলোক আজ এখানে ঘোরাফেরা করছে এই ক্ষুদ্র দ্বীপের এধার থেকে ওধার পর্যন্ত। সেটা হচ্ছে জাহাজের শক্তিশালী সার্চলাইট। অন্ধকারকে নির্বাসিত করবার জন্যে কুমারই আজ আলোর ব্যবস্থা করে এসেছে।
আচম্বিতে এই চলন্ত আলোক-রেখাটা স্তম্ভিত হয়ে গেল।
সকলে সচকিত দৃষ্টিতে দেখলে, একটা ঢালু পাহাড়ে-জমির ওপরে আবির্ভূত হল অনেকগুলি মূর্তি। দল বেঁধে তারা নীচের দিকে নেমে আসতে লাগল।
চোখে দূরবিন লাগিয়ে বিমল বললে, ওদের মানুষ বলেই মনে হচ্ছে; কিন্তু ওরা হাঁটছে চতুষ্পদ জন্তুর মতো!
জয়ন্ত বললে, ওরা আসছে আমাদেরই দিকে।
বিমল বললে, হুঁ, তা আসবেই তো। রাত্রি হয়েছে গভীর, জেগেছে ওদের নকল মানুষ-দেহের মধ্যে বুভুক্ষু পশু-আত্মা! জয়ন্তবাবু, ডা. মোরোর থিয়োরির ভেতর, গোড়াতেই ছিল গলদ। অস্ত্রোপচারের সাহায্যে কোনও পশুর বাইরেকার আকার বদলালেই তার ভেতরকার স্বভাব বদলায় না। পশুরা হচ্ছে–
সে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলতে-বলতে হঠাৎ থেমে গেল।
সার্চলাইটের সীমার মধ্যে এসে দাঁড়াল আরও একদল মুর্তি। তারা দেখতেই কেবল। মানুষের মতো নয়, হাঁটছেও মানুষের মতো দুই পায়ে।
দূর থেকে একটা অস্পষ্ট, কিন্তু গম্ভীর স্বর বললে, চার পায়ে চলব না; এই হচ্ছে আইন। আমরা কি মানুষ নই?
অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে বললে, আমরা মানুষ!
গম্ভীর কণ্ঠ আবার বললে, মাছ-মাংস খাব না; এই হচ্ছে আইন। আমরা কি মানুষ নই?
অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে বলে, আমরা মানুষ!
গম্ভীর কণ্ঠে আবার বললে, মানুষদের দেখলে তাড়া করব না; এই হচ্ছে আইন। আমরা কি মানুষ নই?
অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে বললে, আমরা মানুষ!
বিমল বললে, শুনছেন জয়ন্তবাবু? এই দ্বীপের সব নরপশু এখনও ডা. মোরোর শিক্ষা ভোলেনি? এর একটা কারণও অনুমান করতে পারি। খুব সম্ভব, যারা আমাদের আক্রমণ করতে চায় তারা হচ্ছে, ডা. মোরোর দ্বারা সৃষ্ট নরপশুদের বংশধর। তারা ডা. মোরোকে দেখেওনি, তাই তাঁর সম্মোহন-শক্তি তাদের ওপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি!
