সুন্দরবাবুর বিস্ময় এমন মাত্রা ছাড়িয়ে উঠল যে মুখব্যাদান করে তিনি নির্বাক ভাবে বসে রইলেন মূর্তির মতো।
বিমল বললে, কিন্তু ডা. মোরো খোদার ওপরে খোদাকারি করতে গিয়েছিলেন, তাই পরে প্রকৃতি নিতে চেয়েছে প্রতিশোধ। ওইসব গরিলা-মানুষ, বাঘ-মানুষ আর অন্যান্য জন্তু মানুষ দেখতে মানুষের মতো হলেও মানুষের প্রকৃতি তাদের ওপরে সমানভাবে কাজ করতে পারলে না। তাদের ভেতরে ক্রমেই বেশি করে আবার ধীরে ধীরে সজাগ হয়ে উঠতে লাগল জানোয়ারের প্রকৃতি। তারপর জন্তু-মানুষদের যেসব সন্তান হল, তাদের দেহও হয়ে উঠল অনেকটা জন্তুর মতো দেখতেই। শিশু-বয়সেই তারা বাপ-মায়ের কাছ থেকে মানুষের ভাষা ও নীতি শিক্ষা করেছিল বটে, কিন্তু তাদের কাছে প্রকাশ পায় বিশেষ বিশেষ জন্তুর বিশেষ বিশেষ স্বভাব। আজ তাদের মাংস খেতে আপত্তি নেই। মানুষ দেখলে হিংস্র জন্তুর মতোই তাড়া করবে আর মাঝে মাঝে দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেও এখন তারা বিচরণ করবে চতুষ্পদ জন্তুর মতো। তাদের বংশধররা হয়তো জন্মাবধি অবিকল জন্তুর দেহ নিয়েই জন্মগ্রহণ করবে, হয়তো মানুষের ভাষায় কথা কইবার শক্তি পর্যন্তও তাদের থাকবে না।
সুন্দরবাবু বললেন, ধরলুম, এই দ্বীপে বাস করে কতকগুলো আজব জন্তু-মানুষ; কিন্তু আমি যে হনুমান-বিছেটাকে দেখেছি, তার সঙ্গে তো কোনও মানুষের কি কোনও বিশেষ জন্তুর চেহারার কিছুই মেলে না! সেটা এই দ্বীপে এল কেমন করে? তারপর ধরুন, আপনারা আজ যে কিম্ভুতকিমাকার সিংহ-ভল্লুক-গন্ডারটাকে দেখেছেন, তাকেও তো তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিতে পারি না!
বিমল বললে, পেনড্রিক সাহেবের কাছে ডা. মোরো বলেছিলেন, জন্তু-মানুষের পর জন্তু মানুষ গড়তে-গড়তে তার যখন একঘেয়ে লাগত, তখন তিনি বৈচিত্র্যের জন্যে একাধিক জন্তুর চেহারা মিলিয়ে মাঝে-মাঝে সৃষ্টিছাড়া সব জানোয়ার তৈরি করতেন। ওই হুনুমান-বিছে প্রভৃতি সেইসব জানোয়ারেরই নমুনা।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম! আপনার ওই পেনড্রিক সাহেব আর ডা. মোরো জাহান্নমে গেলেও আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু উপস্থিত নিজেদের কথাও ভেবে দেখতে হবে তো? ওই নরদেহধারী জন্তুগুলো আর জন্তুদেহধারী উলঙ্গ বিভীষিকাগুলো যদি আমাদের আক্রমণ করে?
এর মধ্যে যদি-টদির কিছু নেই, ওরা আমাদের আক্রমণ করবেই।
সুন্দরবাবু চমকে উঠে বললেন, বলেন কি মশাই!
হ্যাঁ। খুব সম্ভব ওরা আজ রাত্রেই আমাদের আক্রমণ করবে।
কী করে জানলেন আপনি?
ওরা আমাদের দেখেছে। ওদের মধ্যে যারা বেশি হিংস্র তারা নিশ্চয়ই আজ রাত্রে শান্তভাবে চুপ করে বাসায় বসে থাকবে না।
কিন্তু আপনি কেবল রাত্রের কথাই তুলছেন কেন? আমাদের আক্রমণ করবার ইচ্ছে থাকলে ওরা দিনের বেলাতেও আসতে পারে তো?
আপনি কি হিংস্র জন্তুদের স্বভাব জানেন না? দিনেরবেলায় তাদের হিংস্র মন আধ ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। দিনের আলো নেববার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা জাগ্রত হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। রাত্রি যত বাড়ে তাদের হিংস্র ভাবও তত বেশি হয়ে উঠে। সেই সময় তারা বেরিয়ে পড়ে দলে দলে জীব-শিকারে। আমার অনুমান সত্যি কিনা আজ রাত্রেই পাওয়া যাবে তার প্রমাণ।
সুন্দরবাবু ভয়ার্ত স্বরে বললেন, মাপ করবেন মশাই, আমি প্রমাণ-ট্রমাণ কিছুই পেতে চাইনে। এই মুহূর্তেই আমি জাহাজে গিয়ে উঠতে চাই।
বিমল সেকথা কানে না তুলে বললে, এই দ্বীপের সব জীবই যে হিংস্র আর হত্যাকারী, আমি সেকথা মনে করি না। আমরা আজ স্বকর্ণে শুনেছি, কতকগুলো জীব এখনও নিজেদের মানুষ বলে গর্ব করে আর মনুষ্য ধর্ম পালন করবার জন্যে নীতি-বাক্যও মুখস্থ করে থাকে। এও শুনে এসেছি, এখানে আমাদের আবির্ভাবে তারা ভয় পেয়েছে বটে, কিন্তু আমাদের মতো আসল মানুষকে তারা মনে করে প্রভুর মতোই। খুব সম্ভব তারা আমাদের আক্রমণকারীদের দলে যোগ দিতে রাজি হবে না।
সুন্দরবাবু বললেন, যে জীবগুলো তাদের মতো বৈষ্ণব নয় আপনি সেই হতভাগাদের কথা ভাবছেন না কেন? হুনুমান-বিছে আর ওই ওর নাম কি সিংহ-ভল্লুক-গন্ডারের দল যদি আমাদের এখানে এসে হানা দেয়?
বিমল হাসতে হাসতে বললে, আমরা যে সঙ্গে এতগুলো সেপাই, মেশিন-গান আর বন্দুক-রিভলভার এনেছি, সে সব কি খালি লোক দেখাবার জন্যে?কুমার, আর খানিক পরেই সন্ধ্যা নামবে। তুমি এখন থেকেই সেপাইদের প্রস্তুত হয়ে থাকতে বলে এসো। সকলেই যেন এক একটা ঝোপঝাঁপ বেছে নিয়ে ওই বন আর নদীর দিকে রাখে সতর্ক দৃষ্টি। মেশিন-গানগুলো বাইরে যথাস্থানে এনে রাখবার ব্যবস্থা করো। আজকে আমরা রাত্রি যাপন করব কবির মতো চন্দ্রকরোজ্জ্বল মুক্ত আকাশের তলায়। তফাত খালি এই, কবিরা ব্যবহার করেন মসী, আর আমরা হব অসির ভক্ত।
কিন্তু এই অসাময়িক কবিত্বের জন্যে সুন্দরবাবুর গা যেন জ্বলে গেল। একে তো যুদ্ধের আয়োজনের কথা শুনেই তার বুকের ভেতরে জেগেছে ঢিপঢিপ শব্দ, তার ওপরে আবার এই কবিত্বের অত্যাচার! এতটা তার আর সহ্য হল না, তিনি তাড়াতাড়ি দোদুল্যমান ভূঁড়ি নিয়ে ছুটলেন সকলের নামে নালিশ করতে রামহরির কাছে।
.
০৮.
সুন্দরবাবুকে উদর-পিশাচ উপাধি দিয়ে মানিক যখন-তখন জ্বালাতন করত; কিন্তু এই দ্বীপের মাটিতে পা দিয়েই তাঁর সেই সুবিখ্যাত জঠরাগ্নি ঘুমিয়ে পড়েছিল যেন একেবারেই! তখন ওপরে আজ আবার কতকগুলো দানব বা রাক্ষসের মতো জীবের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হতে পারে এই সম্ভাবনাটা তাঁকে এতটা কাহিল করে ফেললে যে, মুখবিবরে তিনি একখণ্ড খাদ্যও নিক্ষেপ করতে পারলেন না।
