বিমল বললে, না সুন্দরবাবু, মানিকবাবু সত্য কথাই বলছেন।
তবু সুন্দরবাবু বিশ্বাস করতে চাইলেন না। জয়ন্তকে জিজ্ঞাসা করলেন, দেখ জয়ন্ত, আমি বরাবরই দেখে আসছি, তুমি আমাকে কোনও দিনই মিথ্যে ভয় দেখাবার চেষ্টা করোনি। মানিক যা বলছে তা কি সত্যি?
জয়ন্ত বললে, মানিক একটুও অত্যুক্তি করেনি। এরকম সব সৃষ্টিছাড়া জীবকে আমরা সকলেই স্বচক্ষে দেখেছি।
অত্যন্ত দমে গিয়ে সুন্দরবাবু কিছুক্ষণ একেবারে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, জয়ন্ত, এসব দেখবার পরও তোমরা এখনও কি এই দ্বীপের ওপরে থাকতে চাও? আমি কি আগেই তোমাদের সাবধান করে দিইনি যে এটা হচ্ছে ভূতুড়ে দ্বীপ? দেশে আমার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা আছে, মাস-দুই পরে পেনশন নিয়ে পায়ের ওপরে পা দিয়ে বসে হাঁপ ছাড়ব মনে করছি, আর তোমরা কিনা আমাকে ধাক্কা দিয়ে অপঘাতে মরবার জন্যে এই ভয়ংকর স্থানে টেনে নিয়ে এলে? তোমাদের মনে কি একটুও দয়ামায়া নেই ভাই? বলতে-বলতে সুন্দরবাবুর মুখখানি কাঁদো কাঁদো হয়ে এল।
বিমল তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে শান্ত কণ্ঠে বললে, ভাববেন না সুন্দরবাবু, আমরা বেঁচে থাকতে আপনার কোনওই অনিষ্ট হবে না।
সুন্দরবাবু আশ্বস্ত হলেন না, মুখ ভার করে বললেন, আপনি ভারী কথাই তো বললেন! আপনারা বেঁচে থাকলে আমার অনিষ্ট হবে না, কিন্তু এই সাংঘাতিক দ্বীপে এসেও আপনারা যে বেঁচে থাকবেন, এমন আশা কেউ করতে পারে কি?
নানা বিপদের মুখে গিয়েও যখন আমরা মরিনি, তখন এই ছোট্ট দ্বীপ থেকে নিশ্চয়ই জ্যান্ত দেহ নিয়ে ফিরে যাব, এমন বিশ্বাস আমাদের আছে। কিন্তু এখন সেসব কথা থাক। আপাতত আমাদের দেহও হয়েছে শ্রান্ত আর উদরের ক্ষুধাও হয়েছে অশান্ত, এখন আমাদের একমাত্র বন্ধু হচ্ছে রন্ধনশালার রামহরি। চলুন সুন্দরবাবু, সেই দিকেই ধাবমান হওয়া যাক। বৈকালে চায়ের আসরে আপনাকে এই দ্বীপের রহস্য বুঝিয়ে বলব।
.
সারাদিন সুন্দরবাবু তাঁবুর বাইরে একটিবার মাত্র পা বাড়াননি। বৈকালে বিমলদের চায়ের আসর বসল বাইরে খোলা জমির উপরে। সেখান থেকে বিমল ও জয়ন্ত প্রভৃতি বারংবার ডাকবার পরে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও আসরে যোগ দিলেন বটে, কিন্তু চা পান করতে করতে এস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত চক্ষে ক্রমাগত দূরের পাহাড় ও অরণ্যের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন।
কিন্তু দূরের আলোছায়া-মাখা অরণ্য ও পাহাড়কে দেখাচ্ছিল তখন ছবির মতো সুন্দর। এদিকের ছোট নদীটিও যেন রূপোলি আলোকলতার মতো পড়ে রয়েছে পৃথিবীর শ্যামল শয্যার উপর। চারিদিকেই দেখা যাচ্ছে পরম শান্তির মধুর ইঙ্গিত, কোথাও কোনও বিভীষিকার এতটুকু আঁচ পর্যন্ত নেই।
চা-পান করতে করতে বিমল বললে, সুন্দরবাবু, অনেকদিন আগে ঘটনাচক্রে বাধ্য হয়ে পেনড্রিক নামে এক সাহেব এই দ্বীপে এসে পড়েছিলেন। এখানে এসে তিনি যা দেখেছিলেন সে সমস্তই কাগজে-কলমে লিখে রেখে গেছেন। সেই লেখাটি বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক এইচ জি ওয়েলস দি আইল্যান্ড অব ডক্টর মোরো নামে একখানি পুস্তকে প্রকাশ করেছেন।
আমি বরাবরই ওয়েলস সাহেবের রচনার ভক্ত। তাঁর ওই বইখানি পড়েই আমি সর্বপ্রথমে এই দ্বীপের কথা জানতে পারি। ডা. মোরো ছিলেন একজন বিচক্ষণ জীবতত্ত্ববিদ। কেবল তাই নয়, Surgery বা শল্যবিদ্যায় তার হাত ছিল অসাধারণ। অনেক গবেষণার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে এসে উপস্থিত হন যে, বিভিন্ন জন্তুর জীবন্ত দেহের ওপরে অস্ত্রোপচার করে তাদের দেহগুলোকে মানুষের দেহের মতো করে তোলা যায়।
সুন্দরবাবু বললেন, বেশ বোঝা যাচ্ছে, ওই ডা. মোরো ছিলেন দস্তুরমতো উন্মাদগ্রস্ত ব্যক্তি। আরে অপারেশন করে গাধাকে যদি মানুষ করে তোলা যেত তা হলে তো ভাবনাই ছিল না!
বিমল বললে, ব্যস্ত হবেন না সুন্দরবাবু, আগে আমার কথা শুনুন। ডা. মোরো কেন যে এরকম অভাবিত সিদ্ধান্তে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন, ওয়েলস সাহেবের কেতাবখানা পড়ে দেখলে আপনিও তা উপলব্ধি করতে পারবেন। ডা. মোরোর সিদ্ধান্ত নিয়ে এখানে আমি আর কোনও বাক্যব্যয় করতে চাই না। তবে তিনি যে সত্য-সত্যই গরিলা, বৃষ, চিতাবাঘ, নেকড়ে, হায়না, ভালুক, শুওর, কুকুর প্রভৃতির দেহের ওপরে অস্ত্রচালনা করে তাদের আকার করে তুলেছিলেন যথাসম্ভব মানুষের মতোই, পেনড্রিক সাহেব স্বচক্ষে তা দেখে লিখে রেখে গিয়েছেন। আর তার কথা যে কাল্পনিক নয়, আমরাও আজ এই দ্বীপে এসে তার যথেষ্ট প্রমাণই পেয়েছি। দ্বীপে আমরা আজ যে সব মনুষ্য রূপধারী জন্তুগুলোকে দেখেছি, সেগুলো হয় ডা. মোরোর স্বহস্তের কীর্তি, নয় তারা হচ্ছে তারই সৃষ্ট জীবদের বংশধর। তাদের দেহই কেবল মানুষের মতো দেখতে নয়, তারা কথাও কয় মানুষের ভাষায় ইংরেজিতে।
সুন্দরবাবু বললেন, নাঃ, ডা. মোরো পাগল না হলেও শেষটা আমাকেই দেখছি পাগল হতে হবে। আপনি কি বলতে চান বিমলবাবু, অস্ত্রোপচার করে জন্তুকেও শেখানো যায় মানুষের ভাষা?
বিমল বললে, না, আমি সেকথা বলতে চাই না। ডা. মোরো নিজেই পেনড্রিক সাহেবকে বলেছিলেন, এইসব জন্তুকে মানুষের আকার দিয়ে মানুষের ভাষা শিখিয়েছিলেন তিনি নিজেই। কেবল মানুষের ভাষা নয়, তিনি তাদের মানুষের আচার-ব্যবহারও শেখাতে ভোলেননি। ওয়েলস সাহেবের কেতাবে এমন ইঙ্গিতও আছে, ডা. মোরো হিপনোটিজম বা সম্মোহন বিদ্যাও জানতেন। খুব সম্ভব সেই সম্মোহন-বিদ্যার প্রভাবই ওই মানুষ জন্তুগুলোর ওপরে কাজ করেছিল সবচেয়ে বেশি। মানুষ জন্তুগুলো ডা. মোরোকে ভয় করত যমের মতো, তাকে তারা প্রভু বলে মনে করত। ডা. মোরো তাদের বুঝিয়েছিলেন–তোমরা হচ্ছ মানুষ; তোমরা চতুষ্পদ জন্তুর মতো চলাফেরা কোরো না; তোমরা কখনও মৎস্য মাংস ভক্ষণ কোরো না; মানুষ দেখলে তোমরা তাদের পেছনে তাড়া করে যেও না প্রভৃতি। এইসব নীতি বাক্য তিনি তাদের সর্বক্ষণ মুখস্থ করতে বলতেন। আজ আমরাও তাদের মুখস্থ করা নীতিবাক্য কতক কতক শুনে এসেছি।
