অন্যান্য মূর্তিগুলো তেমনি উদ্ভট। প্রত্যেকটাকে দেখলেই কোনও না কোনও জন্তুর কথা স্মরণ হয়। একটা মূর্তিকে দেখতে তো প্রায় প্রকাণ্ড একটা শূকরের মতোই, তার নাকের তলায় চিবুক ও ওষ্ঠাধরের কোনও চিহ্ন নেই বললেও চলে। অথচ সে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মতো দুই পায়ে ভর দিয়ে এবং তার দেহের সাধারণ গঠনের মধ্যে শূকরের চেয়ে মানুষের সাদৃশ্যই বেশি। তাদের দেহের অন্যান্য বিশেষত্বগুলো আধ-অন্ধকারে ভালো করে বোঝা গেল না।
একটা বড় গাছের ডালের ওপর থেকে নেমে এসেছিল কাছির মতো মোটা খুব লম্বা দুটো ঝুরি। গরিলার মতো দেখতে মানুষটা হঠাৎ দুই হাতে সেই দুটো ঝুরি ধরে ফেলে অনায়াসে মাটির ওপর থেকে খানিকটা ওপরে উঠে বারংবার দোল খেতে লাগল মনের আনন্দে। তারপর সেই ভাবেই শূন্যে দুলতে-দুলতে ভাঙা হেঁড়ে গলায় বললে, আবার জাহাজ এসেছে, আবার প্রভুরা এসেছে, আবার আমাদের শাস্তি পেতে হবে।
নীচে থেকে অন্য মূর্তিগুলো সমস্বরে বলে উঠল, আবার আমাদের শাস্তি পেতে হবে।
কুমার হঠাৎ বিমলের গায়ে একটা ঠেলা মারলে। বিমল সচমকে মুখ ফেরাতেই কুমার ইঙ্গিতে সামনের দিকটা দেখিয়ে দিলে।
যা দেখা গেল, ভয়াবহ!
খাদের ওপাশে পাহাড়ের ওপরে ছিল নানাজাতীয় গাছের তলায় একটানা ঝোপের সার। একটা ঝোপের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আছে প্রকাণ্ড ও বীভৎস একখানা মুখ। সেটা যে-কোন্ জীবের মুখ, কিছুই বোঝবার উপায় নেই। সেই ভয়ংকর মুখের গড়ন খানিকটা সিংহের, খানিকটা ভল্লুকের এবং খানিকটা গন্ডারের মুখের মতো! এই দ্বীপের বাইরে পৃথিবীর দৃষ্টি নিশ্চয়ই কোনওদিন এমন অভাবিত ও অপার্থিব জীবকে দর্শন করবার সুযোগ পায়নি! পণ্ডিতরা বলেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগে আদিম পৃথিবীতে আশ্চর্যরূপে বীভৎস ও বিপুলবপু জীবরা নাকি বিচরণ করত। মাটি খুঁড়ে তাদের অনেকের কঙ্কাল আবিষ্কার করা হয়েছে এবং পণ্ডিতরা সেই সব কঙ্কাল দেখে তাদের চেহারা কতকটা অনুমান করে নিয়েছেন! এই দ্বীপে কি তাদেরই কোনও কোনও বংশধর আজও বিদ্যমান আছে?
জন্তুটার দেহের অন্য কোনও অংশ দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার বিস্ফারিত দুই চক্ষুর ভেতর দিয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল যেন ক্ষুধিত হিংসার আগুন।
মানিক বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে সেই মুখখানার ওপরে গুলিবৃষ্টি করবার উপক্রম করলে।
জয়ন্ত টপ করে তার হাত চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে তিরস্কার করে বললে, ক্ষান্ত হও মানিক, করো কি। বন্দুকের শব্দ শুনে এখানকার সব জীব যদি আমাদের কাছে ছুটে আসে, তাহলে আর কি আমরা আত্মরক্ষা করতে পারব?
হঠাৎ ঝোপের আড়ালে মিলিয়ে গেল সেই বেয়াড়া মুখখানা।
বিমল উঠে দাঁড়িয়ে বললে, জীবটা যে ভয়ানক হিংস্র তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। মাঝখানে এই খাদটা আছে বলেই এতক্ষণ ও আমাদের আক্রমণ করতে পারেনি। এখন বোধহয় অন্য দিক দিয়ে এদিকে আসবার জন্যে চেষ্টা করবে। এখানে ওরকম আরও কত জীব আছে কে জানে! আপাতত বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়াই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ।
জয়ন্ত সায় দিয়ে বললে, আমারও ওই মত। এই অন্ধকার জঙ্গলের ভেতরে আমরা অত্যন্ত অসহায়। আমরা কারুকে দেখতে পাচ্ছি না বটে, কিন্তু আড়াল থেকে শত্রুরা নিশ্চয়ই আমাদের ওপরে নজর রেখেছে। এখানকার প্রত্যেক ঝোপে-ঝোপেই বিপজ্জনক। আসুন, আবার আমরা বেরিয়ে যাই।
.
০৭.
দ্বীপের অরণ্য থেকে সকলে যখন আবার নিজেদের তাঁবুর ভেতরে ফিরে এল, তখন সর্বাগ্রে তাদের সম্ভাষণ করলেন সুন্দরবাবু। শুধোলেন, জঙ্গলের ভেতরে আরও কতগুলো হনুমান বিছে দেখে এলে?
মানিক বললে, আরে রেখে দিন আপনার হুনুমান-বিছে! আমরা যাদের দেখেছি তাদের দেখলেই আপনি হুম বলে অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।
বিস্ময়ে দুই চোখ পাকিয়ে সুন্দরবাবু বললেন, বলো কি হে? হনুমান-বিছের চেয়েও ভয়ানক কিছু থাকতে পারে নাকি? উঁহু! একথা আমি মোটেই বিশ্বাস করি না!
আমার কথায় যদি বিশ্বাস না করেন তবে নিজেই একবার জঙ্গলে গিয়ে চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে আসুন না!
সুন্দরবাবু তাচ্ছিল্য ভরে বললেন, যে জঙ্গলে হনুমান-বিছে পাওয়া যায় সেখানে কোনও ভদ্রলোকেরই যাওয়া উচিত নয়।
আরে বারবার কি হনুমান-বিছের কথা বলছেন? আমরা একটা কি জানোয়ার দেখেছি জানেন? তাও তার সমস্ত দেহটা দেখতে পাইনি, দেখছি কেবল তার মুখখানা! আপনি ছবির নৃসিংহ মূর্তি দেখেছেন তো? এই মূর্তি দেখলে নৃসিংহও ভয়ে পিঠটান না দিয়ে পারবে না।
হুম, তুমি বড় বাজে কথা বলো মানিক! নৃসিংহ হচ্ছে রূপকথার একটা অসম্ভব আর আজগুবি মূর্তি। তারও চেয়ে অপার্থিব কোনও জানোয়ার পৃথিবীতে থাকতে পারে নাকি?
সুন্দরবাবু, কল্পনা করুন এমন একখানা মস্ত বড় মুখ যার খানিকটা দেখতে সিংহের মতো খানিকটা ভালুকের মতো আর খানিকটা গন্ডারের মতো। অর্থাৎ তাকে সিংহও বলা যায় না, ভালুকও বলা যায় না, গন্ডারও বলা যায় না।
সুন্দরবাবু আতঙ্কে এতটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন যে, তার মুখের ভেতর থেকে একটি টুঁ শব্দও নির্গত হল না।
মানিক বললে, আমরা আরও কী সব আশ্চর্য মূর্তি দেখেছি শুনবেন। গরিলার মতো দেখতে মানুষ, শুয়োরের মতো দেখতে মানুষ, ষাঁড়ের মতো দেখতে মানুষ, বাঘের মতো দেখতে মানুষ, শেয়ালের মতো দেখতে–
সুন্দরবাবু তাড়াতাড়ি মানিককে বাধা দিয়ে হাত নেড়ে বলে উঠলেন, থামো বাপু, থামো! তুমি কি বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাতে চাও? তুমি কি আমাকে ডাহা হাঁদা-গঙ্গারাম পেয়েছ? আরে গেল রে!
