.
০৬.
সকালবেলায় চায়ের আসরে বিমলের কাছে গিয়ে রামহরি মিনতি করে বললে, খোকাবাবু, তোমার পায়ে পড়ি। ও জঙ্গলের ভেতরে তোমাদের আর গিয়ে কাজ নেই।
বিমল মুখ টিপে হেসে বললে, ছিঃ রামহরি, তুমি যত বুড়ো হচ্ছ, ততই ভীরু হয়ে উঠছ।
রামহরি বললে, হ্যাঁ খোকাবাবু, আমি ভয় পাচ্ছি বটে। কিন্তু তুমি কি জানো না আমার ভয় হয় কেবল তোমার জন্যেই? ওই জঙ্গলটার লক্ষণ ভালো নয়। ওদিকে তাকালেই আমার বুক চমকে উঠে, মনে হয় যত রাজ্যের যত বিপদ ওখানে যেন ওত পেতে বসে। আছে! তুমি কি লক্ষ্য করোনি খোকাবাবু, এখানে একটা পাখিরও গান শোনা যায় না?
বিমল বললে, এখানে চারদিকে কেবল জল আর জল! এই বিশাল সমুদ্র পার হয়ে কোনও গানের পাখিই এত দূর উড়ে আসতে পারে না। কিন্তু ওই পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে দেখো। ওখানে বসে রয়েছে কত সামুদ্রিক পাখি! ওরা গান গায় না বটে, কিন্তু চিৎকার করে যথেষ্ট!
রামহরি বললে, যে সব পাখি গান গাইতে পারে না, তারা হচ্ছে অলক্ষুণে। যেমন পেঁচা আর বাদুড়। তাদের দেখলেই মনে ওঠে বিপদ-আপদের কথা। তা পাখি থাক আর না থাক, তুমি ওই জঙ্গলের ভেতরে যেও না।
বিমল মাথা নেড়ে বললে, তা হয় না রামহরি! আমরা যে রহস্যের খোঁজে এতদূর এসেছি, তাকে পাওয়া যাবে হয়তো ওই জঙ্গলের মধ্যেই। এ দ্বীপটা খুবই ছোট। ঘুরে আসতে আমাদের বেশি সময় লাগবে না। সুন্দরবাবুকে নিয়ে তুমি এখানেই থাকো, ফিরে এসে তোমাদের হাতের রান্না খাব। ছজন-গুর্খা এখানে পাহারা রইল, বাকি ছজন যাবে আমাদের সঙ্গে। কীরে বাঘা, তুইও এখানে থাকবি, না আমাদের সঙ্গে যাবি?
কিন্তু বাঘা তাদের সঙ্গে যাবার জন্যেই প্রস্তুত। সে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে বিমলের পায়ের কাছে ছুটে এসে বললে, ঘেউ, ঘেউ! তারপর বিমল, কুমার, জয়ন্ত ও মানিক যখন পথে বেরিয়ে পড়ল তখন বাঘা ছুটতে লাগল সকলের আগে আগেই।
ছোট্ট একটা নদী নাচতে নাচতে ছুটে চলেছে, দুই তট কল-সংগীতে পূর্ণ করে। মাঝে মাঝে তার জলরেখা হারিয়ে গিয়েছে বড়-বড় ঝোপের তলায়। তারপর আরম্ভ হল চড়াই, লতাপাতা ও তৃণগুল্মে অলংকৃত ভূমি ক্রমেই উঠে গিয়েছে ওপর দিকে। এখানে ওখানে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট শৈলখণ্ড, এক জায়গায় রয়েছে উষ্ণ প্রস্রবণ, তার জল বেরিয়ে আসছে আগ্নেয়-পাহাড়ের তপ্ত বুকের ভেতর থেকে। চড়াই যেখানে শেষ হয়েছে সেইখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, দ্বীপের অনেকটা অংশ চোখের সামনে পড়ে রয়েছে রিলিফ ম্যাপের মতো।
নদী, পাহাড়, উপত্যকা, মাঠ ও অরণ্য ও শ্যামলতার পরেই দেখা যাচ্ছে সীমাহীন মহাসাগরের নির্মল নীলিমা। এ ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ে না, এখানে যে জীব-জন্তু বাস করে কোথাও এমন চিহ্নই নেই।
বিমল বললে, সূর্যের আলোয় চারদিক ঝকঝক করছে বটে, কিন্তু সামনের ওই অরণ্যটাকে দেখে মনে হচ্ছে, সূর্যকরও ওর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। আমার মনে হচ্ছে, এই দ্বীপের বাসিন্দারা সূর্যকে ভয় করে। ওই অরণ্যের অন্ধকারের ভেতরে গেলে হয়তো আমরা তাদের আবিষ্কার করতে পারব। কিন্তু সাবধান, বন্দুককে প্রস্তুত রেখে আমাদের ওই বনের ভেতর গিয়ে ঢুকতে হবে।
চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে সকলে আবার অগ্রসর হল ধীরে-ধীরে।
নীচের দিকে ছোট-বড় পাথর, ঝোপ-ঝাঁপ ও আগাছার জঙ্গল এবং মাথার ওপরে লতার ঘন জালে বাঁধা মস্ত মস্ত গাছের শ্যামল পত্ৰছত্র। বাতাসের হিল্লোলে শোনা যাচ্ছে অশ্রান্ত তরু-মর্মরের ভাষা। দেখতে-দেখতে দিনের আলো যেন ঝিমিয়ে পড়ল। বনের ভেতরে চারদিকে নেমে এল সন্ধ্যার আবছায়া। সেই আলো-আঁধারি মাখা অরণ্যের অন্তঃপুর তখন হয়ে উঠল রীতিমতো রহস্যময়।
তারা বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু এ হচ্ছে পার্বত্য প্রদেশের অরণ্য। এখানে বনের এক-একটা অংশ হঠাৎ নেমে গিয়েছে নীচের দিকে। সেই রকম একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বিমল সচমকে বলে উঠল, চুপ!
নীচের দিক থেকে শোনা যাচ্ছে কাদের কণ্ঠস্বর। সেগুলো যে মানুষের কণ্ঠস্বর তাতেও সন্দেহ নেই, কিন্তু পৃথিবীর সাধারণ মানুষ সেরকম স্বরে কথা কয় না। তারও চেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে আর একটা ব্যাপার। এই অদ্ভুত দ্বীপের গভীর জঙ্গলে বসে কারা পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তা কইছে ইংরেজি ভাষায়! যে কথাগুলো শোনা গেল, বাংলা ভাষায় তরজমা করলে তা দাঁড়ায় এইরকম। একজন বললে, চার পায়ে চলব না; এই হচ্ছে আইন। আমরা কি মানুষ নই?
কয়েকটা কণ্ঠ সমস্বরে বললে, আমরা মানুষ!
প্রথম কণ্ঠ বললে, মাছ-মাংস খাবো না; এই হচ্ছে আইন। আমরা কি মানুষ নই?
উত্তরে সমস্বরে শোনা গেল, আমরা মানুষ।
আবার প্রথম কণ্ঠ বললে, মানুষদের দেখলে তাড়া করবে না; এই হচ্ছে আইন। আমরা কি মানুষ নই?
সমস্বরে শোনা গেল, আমরা মানুষ!
তারা ইংরেজি ভাষায় কথা কইছে বটে, কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বরে একটা অত্যন্ত অস্বাভাবিকতা এবং উচ্চারণে ছিল অদ্ভুত এক জড়তা। কৌতূহলী বিমল মাটির ওপরে শুয়ে পড়ে বুকে হেঁটে পাহাড়ের ধারে গিয়ে নীচের দিকে মুখ বাড়িয়ে সাবধানে দেখতে লাগল। অন্য সকলেও তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে।
নীচের দিকে রয়েছে একটা খাদের মতো অপরিসর জায়গা; দুই দিকে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড় নিয়ে সংকীর্ণ একটা উপত্যকার মতো সেই খাদটা খানিক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছে। এর থেকে ওধারের পাহাড় পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে ওপর দিকে রয়েছে এমন লতা-পাতার জাল যে, নীচের খাদের ভেতরে সূর্যরশ্মির একটা টুকরো পর্যন্ত প্রবেশ করছে না। ছায়ামাখা ময়লা আলোয় খানিক স্পষ্ট ও খানিক অস্পষ্ট ভাবে দেখা গেল, সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটা মানুষের মূর্তি। খানিকক্ষণ ভালো করে লক্ষ করবার পর বোঝা গেল, সেগুলো মানুষের মূর্তি হলেও তাদের দেহগুলোকে অমানুষিক বললেও অন্যায় হবে না। প্রত্যেক মূর্তিরই দেহের উপর-অংশ যেমন বড়, পায়ের দিক তার তুলনায় তেমনি ছোট। তাদের মধ্যে যে মূর্তিটা সবচেয়ে বৃহৎ, তাকে দেখলে বনমানুষ বা গরিলা ছাড়া আর কোনও জীবকেই মনে পড়ে না। অথচ তাকে গরিলা বলাও চলে না, কারণ তার দেহ খুব বেশি রোমশ নয় এবং তার মুখেও মাখানো রয়েছে প্রায় মানুষের মতো ভাব।
