সুন্দরবাবু ধপাস করে বিছানার ওপরে বসে পড়ে আগে খুব খানিকক্ষণ হাঁপিয়ে নিলেন। তারপর কতকটা প্রকৃতিস্থ হয়ে বললেন, সব কথাই বলব বটে, কিন্তু সকলের কাছে আগেই একটি অনুরোধ করে রাখছি। আমি স্বচক্ষে সত্যই যা দেখেছি তা ছাড়া আর কিছুই বলব না। আমি ভুলও দেখিনি, অত্যুক্তিও করব না। কিন্তু আপনারা দয়া করে আমার কথায় বিশ্বাস করবেন।
খাওয়াদাওয়ার পর সকলকার সঙ্গে খানিক গল্প-গুজব করে নিজের তাঁবুতে এসে আমি তো শুয়ে পড়লুম। খানিক পরেই ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে এল চোখের পাতা। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলুম জানি না, কিন্তু হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। জেগে উঠেই মনে হল তাঁবুর ভেতরে আমি আর একলা নেই। প্রথমেই নাকে এল কেমন একটা বোঁটকা গন্ধ। তার পরেই শুনলুম মাটির ওপরে খসখস করে শব্দ হচ্ছে।
আস্তে আস্তে বিছানার ওপরে উঠে বসলুম। ঘুমোবার সময় আলো নিবিয়ে দিইনি, তাঁবুর এক কোণে জুলছিল হারিকেন লণ্ঠনটা। সেই আলোতে দেখলুম, বেশ একটা মোটা সাপের মতো জীব আমার খাটের তলায় গিয়ে ঢুকছে, বাইরে বেরিয়ে আছে কেবল তার ল্যাজের দিকটা। ভালো করে দেখে বুঝলুম সেটা সাপ নয়, তার গায়ের রং তেঁতুলে বিছের মতো, আর দেহের গড়নও প্রায় সেইরকমই।
লম্বায় তার দেহটা কতখানি তা বুঝতে পারলুম বটে, কিন্তু চওড়ায় তার দেহটা সাত আট ইঞ্চির কম হবে না। এত বড় বিছের কথা জীবনে কোনওদিন শুনিনি। এ যদি কামড়ায় তাহলে আমার অবস্থাটা হবে কীরকম, তা অনুমান করেই তাড়াতাড়ি বালিশের তলা থেকে রিভলভারটা বার করে নিলুম।
বিছেটা বোধহয় টের পেয়েছিল যে আমি জেগে উঠেছি। সাঁৎ করে তার দেহের সবটাই ঢুকে গেল খাটের তলায়। আমি মহা ফাঁপরে পড়ে বিছানার উবু হয়ে বসে ভীষণ ভয়ে ঘেমে উঠতে লাগলুম।
তারপর অত্যন্ত আচমকা একটা ভয়ানক উদ্ভট জীব খাটের তলা থেকে বাইরে এসে পড়ল। সেটাকে দেখে তো আমার চক্ষুস্থির!
বিমলবাবু, আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, প্রায় ছয় ফুট লম্বা ও সাত-আট ইঞ্চি চওড়া বৃশ্চিকের দেহের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে আছে একখানা মস্ত হনুমানের মুখ? কল্পনা তো করতে পারবেনই না, হয়তো আমার কথা বিশ্বাসও করবেন না; কিন্তু আমি কিছুমাত্র ভুল দেখিনি, বলেন তো ঈশ্বরের নামে শপথ করতে পারি।
গোখরো সাপেরা ফণা তুলে যেমন মাটির ওপর থেকে খানিকটা উঁচু হয়ে উঠে, এই কিম্ভুতকিমাকার আশ্চর্য জীবটা ঠিক সেইভাবে উঁচু হয়ে আমার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সে গর্জন করে উঠতেই আমি রিভলভারের ঘোড়া টিপে দিলুম। পরমুহূর্তেই জীবটা মাটির ওপরে আছাড় খেয়ে পড়ল আর তার ল্যাজের ঘা লেগে হ্যারিকেন লণ্ঠনটা ভেঙে একেবারে নিভে গেল!
তাঁবুর ভেতর ঘোর অন্ধকার। হঠাৎ আমার খাটের ওপরে সশব্দে কি একটা এসে পড়ল, আমিও সঙ্গে সঙ্গে তড়াক করে খাট থেকে লাফিয়ে পড়ে উপর্যুপরি রিভলভার ছুঁড়তে লাগলুম। তারপর আপনাদের আবির্ভাব। এখন তো দেখছি সে আশ্চর্য জীবটা আর তাঁবুর ভেতরে নেই; কিন্তু বলুন আপনারা, যেটাকে এইমাত্র আমি দেখেছি, সেটা কি জীব হতে পারে? আপনারা হয়তো বলবেন, ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ে আমি জেগে উঠছি। কিন্তু স্বপ্ন নয় মশাই, স্বপ্ন নয়। আমার রিভলভারের গুলি খেয়ে জীবটা আহত হয়েছিল। মাটির দিকে তাকিয়ে দেখুন, এখনও তার রক্তের দাগ ওখানে রয়েছে।
জয়ন্ত হেঁট হয়ে রক্তের দাগগুলো পরীক্ষা করতে করতে বললে, হা, সুন্দরবাবু, আপনার কথায় আমি বিশ্বাস করছি। একটা কোনও জীব যে আপনার রিভলভারের গুলিতে আহত হয়েছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই; কিন্তু আপনি যেরকম বললেন, জীবটাকে কি ঠিক সেই রকমই দেখতে?
সুন্দরবাবু বললেন, একেবারে অবিকল! এখনও আমার চোখের সামনে তার মূর্তিটা যেন জ্বলজ্বল করছে। যতদিন বাঁচব তার চেহারা কোনওদিন ভুলব না, হুম!
কুমার বললে, জীবতত্ত্বে হনুমানের মতো মুখ আর বৃশ্চিকের মতো দেহধারী প্রাণীর কথা কোনওদিন পাওয়া যায়নি। কোনও জীবতত্ত্ববিদই এরকম উদ্ভট জীবের অস্তিত্ব স্বীকার করবেন না।
সুন্দরবাবু বললেন, জীবতত্ত্বের পণ্ডিতরা আমার কথা শুনে কি বলবেন তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। আমার বিশ্বাস, আজ যাকে দেখেছি, জীব রাজ্যের কেউ সে নয়। বলেছি তো এটা হবে ভূতুড়ে দ্বীপ, ভূতেরা কত রকম দেহ ধারণ করতে পারে তা কি কেউ জানে?
বিমল ধীরে ধীরে বললে, ডা. মোরোর দ্বীপে যে এরকম জীব পাওয়া যায়, এইচ জি ওয়েলস তার উল্লেখ করেননি; কিন্তু তাঁর কেতাবে এ সম্বন্ধে দু-একটা ইঙ্গিত আছে বটে।
জয়ন্ত বললে, কীরকম ইঙ্গিত?
পরে তা বলব। আপাতত আমাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, এই দ্বীপটা ভালো করে পরিদর্শন করা। এখানকার জঙ্গলের ভেতরে গেলে আর পাহাড়ের ওপরে উঠলে নিশ্চয়ই বহু রহস্যের সন্ধান পাওয়া যাবে। কাল সকালেই আমরা এখানকার জঙ্গলের দিকে যাত্রা করব।
সুন্দরবাবু চমকে উঠে বললেন, আমরা মানে? আমি কোনওদিনই ওই জঙ্গলের ভেতরে গিয়ে ভূতের হাতে প্রাণ খোয়াতে রাজি নই। এখানকার একটিমাত্র জীবের যে নমুনা দেখলুম আমার পক্ষে তা যথেষ্টরও বেশি। জঙ্গলের ভেতরে নানা রূপ ধারণ করে আরও যাঁরা বিরাজ করছেন, আমি দূর থেকেই তাদের পায়ে প্রণাম করছি।
