রামহরির কানে কানে সুন্দরবাবু বললেন, আমাদের দুজনের কি উচিত জানো রামহরি? ওই দ্বীপে না উঠে এই জাহাজের ভেতরেই বাস করা।
রামহরি মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, তা, হয় না বাবুমশাই! খোকাবাবু যমালয়ে যেতে চাইলে আমাকেও তার সঙ্গে সঙ্গেই যেতে হবে।
সুন্দরবাবু এমন একটা মুখভঙ্গি করলেন যার দ্বারা বোঝা গেল, রামহরির উত্তর শুনে তিনি মোটেই প্রীত হননি।
.
০৫.
একদিকে অরণ্য ও ছোট-ছোট পাহাড়ের শিখর, একদিকে একটি ছোট্ট নদী এবং আর দুই দিকে পনেরো-ষোলো হাত প্রবালপ্রাচীর, তারই মাঝখানে ফেলা হয়েছে কয়েকটা তাবু।
জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু আপনি চমৎকার স্থান নির্বাচন করেছেন। ওই দুদিকে প্রবাল প্রাচীর আছে বলে শত্রু আসবার ভয় নেই। কেবল ওই বন আর নদীর দিকে সাবধানী দৃষ্টি রাখলেই আমরা নিরাপদে থাকতে পারব।
হঠাৎ সুন্দরবাবু একটা সুউচ্চ লম্ফ ত্যাগ করে উঠলেন, বাপ রে, ভূমিকম্প হচ্ছে।
বিমল সহজ স্বরেই বললে, ভয় নেই সুন্দরবাবু, ভয় নেই। এখানে পায়ের তলায় মাঝে-মাঝে মাটি এমনি কঁপবে!
সুন্দরবাবু ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, বটে! এখানকার মাটির এমন বেয়াড়া স্বভাবের কারণটা কি শুনি?
এটা সাধারণ দ্বীপ নয়, এখানে সমুদ্রের তলায় যে আগ্নেয়-পর্বত আছে, এই দ্বীপটিকে তারই চূড়া বলে বর্ণনা করা যায়। আমি আর কুমার দ্বীপের খানিকটা পরিদর্শন করে এসেছি। চারিদিকেই দেখেছি পাথরের গায়ে রয়েছে গর্তের পর গর্ত। সেই সব গর্ত আর কিছুই নয়, আগ্নেয়-পর্বতের ধোঁয়া বেরুবার পথ। ওই দেখুন, খানিক দূরে একটা ধোঁয়ার রেখা দেখতে পাচ্ছেন? ওখানেও গর্তের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগ্নেয় পর্বতেরই ধোঁয়া।
সুন্দরবাবু সভয়ে বললেন, বিমলবাবু, আপনি যে আমার আক্কেল গুড়ুম করে দিলেন। পায়ের তলায় ভূমিকম্প আর আগ্নেয়গিরি নিয়ে মানুষ কখনও বাস করতে পারে? কোনদিন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে আগুন, আর আমাদের দেহের বদলে এখানে পড়ে থাকবে খালি মুঠো কয়েক ছাই।
বিমল বললে, অতটা দুর্ভাবনার দরকার নেই। এইচ জি ওয়েলস সাহেবের গল্পের নায়ক এই দ্বীপে এসেছিল ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে। তারও দশ-পনেরো বছর আগে যে এই দ্বীপটার অস্তিত্ব ছিল এমন প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। এত দিনের মধ্যেও আগ্নেয়গিরি যখন উৎপাত করেনি তখন আরও গোটাকয়েক দিন আমরা বোধহয় নিরাপদেই কাটিয়ে দিতে পারব।
বিমলদের সঙ্গে এসেছিল বারো জন গুর্খা। তারা সকলেই আগে ফৌজে কাজ করত। বিমল তাদের ডেকে হুকুম দিলে যে, যে দুদিকে প্রবালপ্রাচীর নেই সেইখানে সর্বদাই বন্দুক নিয়ে পাহারা দিতে। তারপর ফিরে বললে, আমাদের সবাইকে এখানে সর্বদাই সশস্ত্র হয়ে থাকতে হবে। কারণ, কোনও দিক দিয়ে কখন শত্রুর আবির্ভাব হবে, কিছুই বলা যায় না। কুমার, আমাদের মেসিন-গান দুটো তুমি বাইরে এনে বসিয়ে রাখো।
এইসব আয়োজন দেখে সুন্দরবাবুর উদ্বেগ ও অশান্তি ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগল। কিন্তু বিমল, কুমার, মানিক ও জয়ন্তর কাছ থেকে তিনি কোনও সান্ত্বনাই খুঁজে পেলেন না। তাদের কাছে গেলেই তিনি পান শুধু ভীষণ সব সম্ভাবনার ইঙ্গিত।
শেষটা রীতিমতো মুষড়ে পড়ে তিনি ঢুকলেন গিয়ে রামহরির তাবুর ভেতরে। রামহরি রান্নায় ব্যস্ত ছিল। তার বন্ধনের বিচিত্র আয়োজন দেখে সুন্দরবাবুর অশান্ত মনটা অনেকটা প্রশান্ত হয়ে উঠল। আর একটি প্রাণীও সেই তাঁবু-রান্নাঘরের আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মারছিল। সে হচ্ছে বাঘা। তার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করেছে মাংসের সুগন্ধ!
সেই রাত্রে।
চন্দ্রহীন অন্ধকার রাত যেন কান পেতে শ্রবণ করছে বিশাল সাগরের উচ্ছ্বসিত তরঙ্গ–কোলাহল!
আচম্বিতে মানুষের আর্তনাদের পর আর্তনাদে চারিদিক হয়ে উঠল ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত! সঙ্গে-সঙ্গে বারবার শোনা গেল রিভলভারের শব্দ! তার পরেই জাগল কুকুরের ক্রুদ্ধ চিৎকার!
বিমল, কুমার, জয়ন্ত ও মানিক সকলেই ব্যস্তভাবে তাঁবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।
কুমার উদ্বিগ্নকণ্ঠে বললে, এ যে সুন্দরবাবুর গলা! বাঘাও চাঁচাচ্ছে। সুন্দরবাবু ক্রমাগত রিভলভার ছুড়ছেন! ব্যাপার কী?
সকলে দ্রুতপদে সুন্দরবাবুর তাঁবুর ভেতরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে দেখলে, তাবুর এক কোণে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছেন সুন্দরবাবু। তাঁর মুখ-চোখ আতঙ্কগ্রস্ত।
বিমল জিজ্ঞাসা করলে, কী হয়েছে সুন্দরবাবু, আপনার এমন অবস্থা কেন?
প্রথমটা সুন্দরবাবু কোনও কথাই উচ্চারণ করতে পারলেন না। তারপর কেবলমাত্র বললেন, হনুমান-বিছে!
হুনুমান-বিছে?
হ্যাঁ-হ্যাঁ, হুনুমান-বিছেই বলো আর বিছে-হুঁনুমানই বলো, আমি দেখেছি একটা অসম্ভব জীবকে।
মানিক বললে, জয়ন্ত, ভয়ে সুন্দরবাবুর মাথার কল বিগড়ে গেছে, যা বলছেন তার মানেই হয় না।
ভয়ার্ত সুন্দরবাবু এইবারে হলেন রীতিমতো ক্রুদ্ধ। চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, হ্যাঁ হে বাপু, আমার তো মাথার কল বিগড়ে গেছে, কিন্তু এখানে আজ থাকলে তোমার দেহের ওপরে। মাথাটাই বজায় থাকত কিনা সন্দেহ। আমি যা দেখেছি, কেউ কোনও দিন দুঃস্বপ্নেও তা দেখেনি। বাস রে বাস, আমার বুকটা এখনও শিউরে শিউরে উঠছে। ভাগ্যে রিভলভারটা ছিল, নইলে আজ কী যে হত কিছুই বলা যায় না।
বিমল বললে, শান্ত হন সুন্দরবাবু। ভালো করে বুঝিয়ে বলুন আপনি কি দেখেছেন।
