কুমার সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে বললে, সুন্দরবাবু, একটা ছোট্ট দ্বীপ দেখে এতটা ভড়কে যাচ্ছেন কেন?
সুন্দরবাবু আরও রেগে উঠে বললেন, ভড়কে যাব না কীরকম? বলেন কি মশাই? আপনাদের আমি কি চিনি না? আমি কি জানি না পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যেখানে অপেক্ষা করে আছে মারাত্মক সব আপদ-বিপদ, একটু খবর পেলেই সেই সব জায়গায় আপনারা ছুটে যান বদ্ধ পাগলের মতো! আপনারা যে ওই বিশেষ দ্বীপটাতে সুমুদুরের হাওয়া ভক্ষণ করতে আসেননি, এটুকু বুঝতে পারব না এমন কচি খোকা আমি নই। আপনাদের ধাপ্পায় ভোলবার কথা আমার নয়; কিন্তু কি জানেন কুমারবাবু, মুনিরও মতিভ্রম হয়, আমারও মতিভ্রম হয়েছিল। নইলে কি আপনাদের সঙ্গে আবার দেশের বাইরে পা বাড়াতুম? কখনও না!
এমনসময় রামহরি সেখানে দাঁড়াল। সকলকার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললে, কী হয়েছে সুন্দরবাবু, আপনি এত খাপ্পা হয়ে উঠেছেন কেন?
সুন্দরবাবু, বললেন, খাপা না হয়ে উপায় কি রামহরি? এই বাবুগুলি ধাপ্পা দিয়ে আমাদের দুজনকে এখানে কেন টেনে এনেছেন জানো?
কেন সুন্দরবাবু?
আমরা জবাই হব বলে।
রামহরি দুই চক্ষু ছানাবড়ার মতো করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সুন্দরবাবু বললেন, এরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে এত দূর এসেছে কেন জানো? ওই একফোঁটা দ্বীপে গিয়ে নামবে বলে।
রামহরি ফিরে দ্বীপটার দিকে তাকিয়ে বললে,বাবুরা ওই দ্বীপে গিয়ে নামবে নাকি? ওটা কী দ্বীপ?
ভগবান জানেন! দ্বীপটার যা চেহারা দেখছি, পৃথিবীর কোনও মানুষই বোধহয় ওর নাম কখনও শোনেনি!
ওই দ্বীপে কি আছে?
ওখানে নিশ্চয়ই আছে মূর্তিমান বিভীষিকার দল। তা নইলে এমন ডাহা ডানপিটে ছোকরার দল এতদূর কখনও ছুটে আসে? দ্বীপটাকে দেখেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! ঘাড়ে ভূত না চাপলে অমন দ্বীপে কেউ বেড়াতে আসে না।
রামহরি সায় দিয়ে বললে, তা যা বলেছেন! এই বাবুগুলির প্রত্যেকেরই ঘাড়ে চেপে আছে একটা করে ভূত!
সুন্দরবাবু বললেন, কিন্তু আমাদের ঘাড়ে তো ভূত নেই, আমরা কেন এদের সঙ্গে বেঘোরে ছুটোছুটি করে মরি!
রামহরি দার্শনিকের মতো গম্ভীরভাবে বললে, সঙ্গদোষে সব হয় সুন্দরবাবু, সঙ্গদোষে সব হয়।
সুন্দরবাবু অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, দেখো রামহরি, এসে যখন পড়েইছি তখন উপায় নেই। কিন্তু আমার একটা কথা সর্বদাই মনে রেখো। জেনো, এই দলে মানুষের মতো মানুষ বলতে আছি কেবল আমরা দুজন। আমরা ওদের দলে কোনও দিনই যোগ দেব না। ভবিষ্যতে আমরা যা করব, নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেই করব, ওদের কারুর পরামর্শ আমরা শুনব না। চলো, চুপিচুপি তোমাকে গোটা কয়েক কথা বলতে চাই।
বিমলের দিকে একবার উত্তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রামহরির হাত ধরে প্রস্থান করলেন সুন্দরবাবু।
জাহাজ তখন দ্বীপের খুব কাছে এসে পড়েছে। এখান থেকে দ্বীপের সবটা দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু তার আয়তন সাত-আট বর্গমাইলের বেশি হবে না। এ অঞ্চলে অধিকাংশ দ্বীপেরই উৎপত্তি আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে। এই দ্বীপটির উৎপত্তির মূলেও সেই কারণই অনুমান করা যায়।
দ্বীপের একদিকে রয়েছে নতোন্নত মুক্তভূমি, বাকি সবখানেই দেখা যাচ্ছে ঘন সবুজ রঙের ছবি, লতা-গুল্ম পাতায় ঢাকা গাছের পরগাছের দল। সব চেয়ে বেশি চোখে পড়ে তালজাতীয় একরকম গাছ। একদিকে সমুদ্রের নীল জলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে খুব উঁচু ও সুদীর্ঘ কালো পাথুরে পাড়। তার ওপরে একটানা চলে গিয়েছে বড় বড় ঝোপের পর ঝোপ। সেখানকার নিবিড় শ্যামলতার ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছিল প্রভাত-সূর্যের সোনালি জলের ঢেউ।
বিমলের দৃষ্টি হঠাৎ চমকে উঠল। এক দিকে আঙুল নির্দেশ করে সে বললে, দেখুন জয়ন্তবাবু দেখুন!
সকলে সবিস্ময়ে দেখলে, ঝোপগুলোর তলায় সরাসরি বসে কতকগুলো নিশ্চল পাথরের মূর্তি! কিন্তু সেগুলো যে জীবন্ত মূর্তি, তাও বেশ বোঝা যাচ্ছে। স্পষ্ট করে দেখা না গেলেও তাদের মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু প্রত্যেক মূর্তির গায়ের ওপরই দেখা যাচ্ছে নানান-রকম রঙের খেলা হলদে, কালো, সাদা ও লালচে প্রভৃতি।
কুমার বললে, বিমল, ওরা যদি মানুষ হয় তাহলে ওদের গায়ের রং ওরকম কেন? ওরা কি গায়ের সঙ্গে মিলানো কোনও রঙিন পোশাক পরে আছে?
বিমল বললে, কিছুই তো বলতে পারছি না। ডা. মোরোর দ্বীপে যে ওরকম রঙিন পোশাক-পরা মানুষ আছে, এ খবর তো আমিও পাইনি।
জাহাজের সাইরেন হঠাৎ তীব্র স্বরে বেজে উঠে আকাশ-বাতাস চারদিক যেন বিদীর্ণ করে দিলে! সঙ্গে সঙ্গে ঝোপগুলোর সুমুখ থেকে প্রত্যেক মূর্তিই এক এক লাফ মেরে অদৃশ্য হয়ে গেল!
জয়ন্ত বললে, ওগুলো নিশ্চয়ই মানুষের মূর্তি নয়।
বিমল বললে, কেন?
মানুষ কখনও বসে বসেই অত উঁচু লাফ মেরে ঝোপের ভেতরে গিয়ে পড়তে পারে?
বিমল কোনও উত্তর দিলে না। কিন্তু সুন্দরবাবুর টনক নড়ল। দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে তিনি মত প্রকাশ করলেন, ওগুলো মানুষ, নয়, হুম!
মানিক বললে, আপনি কি বলতে চান সুন্দরবাবু?
দুই ভুরু সংকুচিত করে সুন্দরবাবু বললেন, আমার কথার অর্থ হচ্ছে, তুমি একটি পাজির পা-ঝাড়া!…রামহরি! অ রামহরি! শুনেছ? যা ভেবেছি তাই, আমরা এসেছি একটা ভূতুড়ে দ্বীপে!
জাহাজ আর অগ্রসর হতে পারলে না। সেইখানেই নোঙর ফেললে। বিমলের আদেশে খালাসিরা দ্বীপে যাবার জন্যে বোট নামাবার আয়োজনে নিযুক্ত হল।
