এইচ জি ওয়েলসের বইখানা এগিয়ে দিয়ে বিমল বললে, আমার মুখে কিছুই শোনবার দরকার নেই। এই বইখানা নিয়ে যান, এর পাতাগুলির ওপরে চোখ বুলালেই সব কথা জানতে পারবেন; কিন্তু তার আগে বলুন দেখি, আমি আর কুমার যদি সেই দ্বীপের দিকে যাত্রা করি, তাহলে এই অ্যাডভেঞ্চারে আপনারাও কি যোগ দিতে রাজি হবেন?
জয়ন্ত ও মানিক সমস্বরে বলে উঠল, নিশ্চয়ই।
কুমার বললে, বিমলের অনুমান, ফিলিপ সাহেবের গল্প আর এইচ জি ওয়েলসের রচনা সত্য না হলেও আমি কিছুমাত্র দুঃখিত হব না; জীবনে বড়ই ঘটনার অভাব হয়েছে, কলকাতা শহরকে মনে হচ্ছে ছোট খাঁচার মতো, এখানে আর বেশি দিন আবদ্ধ হয়ে থাকলে বেতো রুগির মতো শয্যাগত হয়ে পড়ব। অন্য কোনও ঘটনা ঘটুক বা নাই ঘটুক, অন্তত বঙ্গে পিসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ছুটোছুটি করে আসা যাবে তো? আমার পক্ষে তাও হবে একটা বিপুল মুক্তির মতো!
বিমল বললে, কিন্তু সাবধান, রামহরি যেন আপাতত ঘুণাক্ষরেও মোরোর দ্বীপের কথা জানতে না পারে। তাহলে সে এখান থেকে কিছুতেই নড়তে রাজি হবে না। আমাদের রন্ধনশালার হর্তাকর্তা সে, তাকে সঙ্গে না রাখলে কি চলে? কি বলো, কুমার!
কুমার বললে, সে কথা আর বলতে? যখনই একলা বিদেশে গিয়েছি, রামহরির শ্রীহস্তের রান্না খেতে না পেয়ে রীতিমতো রোগা হয়ে পড়েছি!
বিমল হঠাৎ চাপা গলায় বললে, সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনেই বুঝছি ঘরের ভেতরে এখনই সুন্দরবাবুর আবির্ভাব হবে। দলে ভারী হওয়ার জন্যে তাকেও ভুলিয়ে-ভালিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই, তাকেও আসল রহস্যের কথা বলবার দরকার নেই।
ব্যস্তভাবে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন সুন্দরবাবু। কুমারের দিকে তাকিয়ে উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, হুম! এই যে কুমারবাবু, আমার বনমুরগিদের খবর কি? নিশ্চয়ই তাদের চাটগাঁয়ে ফেলে আসেননি?
কুমার হাসতে হাসতে বললে, না, আপাতত তারা বাস করছে এই বাড়িতেই।
পেটের ওপরে ডান হাত বুলোতে বুলোতে এক গাল হেসে সুন্দরবাবু বললেন, চমৎকার! চমৎকার!
.
০৪.
সিন্ধুর মুখে বিন্দুর মতো অনেক দূরে দেখা গেল ছোট্ট একটি দ্বীপ। বলা বাহুল্য, ভারতবর্ষ থেকে আমরা জাহাজে উঠেছি, এবং জাহাজ এখন এসে পড়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের ভেতরে এবং এখন যেখান দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তার একদিকে আছে ওই ছোট্ট দ্বীপটি, আর একদিকে আছে দক্ষিণ আমেরিকার তটভূমি। এখানটা সাধারণ জাহাজ চলাচলের পথ নয়, আর সেই কারণেই ভাড়া করে একখানি নিজস্ব জাহাজ নিয়ে আমাদের এখানে আসতে হয়েছে।
ভূ-পর্যটক ফিলিপ সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া চার্টের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তারপর আবার দ্বীপের দিকে দৃষ্টিপাত করে বিমল উফুল্ল কণ্ঠে বললে, ওইটেই যে ডা. মোরোর দ্বীপ সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই! ওই ছোট্ট জায়গাটুকুর ভেতরে কোনও বৃহৎ রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে, দূর থেকে দ্বীপটিকে দেখলে মোটেই সে সন্দেহ হয় না!
হঠাৎ পেছন থেকে সুন্দরবাবুর কণ্ঠে শোনা গেল, হুম! আপনার এ কথার অর্থ কি বিমলবাবু!
বিমল তাড়াতাড়ি চার্টখানা মুড়ে ফেলে ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, এই যে সুন্দরবাবু! আপনি যে কখন চুপিচুপি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, আমরা কিছুই টের পাইনি!
সুন্দরবাবু বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ, টের পাননি বলেই তো পেছন থেকে আমি আপনাদের সব কথা শুনতে পেয়েছি!
কি, শুনেছেন সুন্দরবাবু?
আরে, শুধু কি শুনেছি, আসল ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি।
কি বুঝেছেন সুন্দরবাবু?
সাগর-ভ্রমণে বেরুবেন, স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে, এমনই সব আরও নানা লোভ দেখিয়ে আপনারা আমাকে কলকাতা থেকে এখানে টেনে এনেছেন। তারপর অকুল পাথারে ভেসে রোজ আপনাদের হাবভাব ব্যবহার দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল যে, আপনাদের এই সাগরযাত্রার পেছনে কোনও গভীর রহস্য আছে। মাঝে-মাঝে সেই সন্দেহ আপনাদের কাছে প্রকাশও করেছিলুম; কিন্তু আমার কথা আপনারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মশাই, গোয়েন্দাগিরি করে আমি চুল পাকিয়ে ফেললুম, আমার সন্দেহকে আপনারা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পারবেন কেন? তবে ফঁদে যখন পা দিয়েছি, ফলভোগ করতেই হবে, কাজেই মুখে কিছু আর বলিনি; কিন্তু আজ বুঝতে পেরেছি, কলকাতা থেকেই আপনাদের লক্ষ্য ছিল ওই অজানা দ্বীপটার উপরে।
মানিক মুখে কপট ভয়ের ভাব ফুটিয়ে তুলে বললে, বলেন কি সুন্দরবাবু! কোথায় কলকাতা আর কোথায় এই ছোট্ট দ্বীপটা। মাঝখানে আছে প্রায় সাড়ে এগারো হাজার মাইল ব্যাপী জলপথ। আমাদের লক্ষ্য করবার শক্তি কি এতই অসাধারণ যে কলকাতার বসেই এই দ্বীপটা চোখে দেখতে পেয়েছি? না সুন্দরবাবু, না আপনার এই অত্যুক্তির অত্যাচার আমরা সহ্য করতে রাজি নই!
সুন্দরবাবু ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, তোমার ঠাট্টা থামাও মানিক! অসময়ে ঠাট্টা ভালো লাগে না। আমার বিরুদ্ধে একটা মস্ত ষড়যন্ত্র হয়েছে! নইলে তোমরা যে এই বিশেষ দ্বীপটাতেই আসতে চাও, একথা আগে আমাকে বলেনি কেন?
বললে কি করতেন?
করতুম আর কি, তোমাদের সঙ্গে আসতুম না।
কেন আসতেন না?
হুম! এর আগে, বোকার মতো তোমাদের পাল্লায় পড়ে যত বারই দেশের বাইরে এসেছি, ততবারই পড়েছি সাংঘাতিক সব বিপদে। তবু বেশির ভাগ বিপদের ধাক্কা কোনওরকমে। সামলাতে পেরেছি ভারতবর্ষের মাটিতেই ছিলুম বলে। কিন্তু এবার তোমাদের সঙ্গে এসে পড়েছি। এমন এক জায়গায় যেখানে মা-বাপ বলতে কেউ থাকবে না। চারদিকে কেবল থইথই করছে জল, তার মাঝখানে একরত্তি একটা সরষের মতো রয়েছে ওই বাজে দ্বীপটা! হায় রে, আর কি আমি দেশে ফিরতে পারব?
