তারপর কুমার বলছে, তার গায়ের রং নাকি চিতাবাঘের মতো। চিতার বাসায় পালিত হলেও সে হচ্ছে মানুষ। সুতরাং প্রকৃতি বন্য হলেও তার গায়ের রং কখনও চিতার মতো হতে পারে না। তার ওপরে সে নাকি শিকার করে মানুষ ও জন্তুর কাঁচা মাংস খায়। জন্তুর দ্বারা পালিত যে মনুষ্য শিশু লোকালয়ে ফিরে এসেছে, তাদেরও এরকম স্বভাবের কথা শোনা যায়নি। যদি তর্কের অনুরোধে ধরে নেওয়া যায় যে, এই চিতা-মানুষটা বরাবর বনে থেকে নরখাদক বাঘের মতোই হিংস্র হয়ে উঠেছে, তাহলেও এখানে প্রশ্ন উঠবে, তবে সে ইংরেজি ভাষা শিখলে কার কাছ থেকে? আর লোকালয়ে না এসেও সে নৌকো চালনা করবার ক্ষমতা অর্জন করলে কেমন করে? না জয়ন্তবাবু, এই ঘটনার ভেতরে আছে গভীরতর রহস্য!
মানিক বললে, কিন্তু সে রহস্যের চাবিকাঠি যখন আমাদের কাছে নেই, তখন ওকথা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আপাতত কোনও লাভ হবে না। তার চেয়ে এখন উচিত হচ্ছে, কুমারবাবুর প্রসাদে সে বন্য রামপক্ষীগুলি আত্মদান করবার জন্যে আমাদের দ্বারস্থ হয়েছে, সকলে মিলে তাদের পরিদর্শন করে আসা।
কুমার উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললে, বেশ তো, চলুন না। আসুন জয়ন্তবাবু, এসো বিমল।
বিমল বললে, আপাতত মুরগি দেখবার ইচ্ছে আমার নেই। তোমরা যাও।
জয়ন্ত ও মানিককে নিয়ে কুমার ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। মিনিট পনেরো পরে তারা যখন আবার ফিরে এল তখন দেখলে, বিমল একখানা বই হাতে নিয়ে চুপ করে বসে আছে।
মানিক সুধোল, ওখানা কি বই, বিমল?
বিমল বললে, এখানি এইচ. জি. ওয়েলসের বই। তুমিও পড়েছ, এর নাম হচ্ছে The Island of Dr. Moreau, মনে আছে, এই বইখানা নিয়ে আমরা দুজনে মিলেই অনেক জল্পনা কল্পনা করেছিলুম?
কুমারের দুই চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল। অল্পক্ষণ নীরব থেকে সে বললে, বিমল! তুমি কি বলতে চাও? না, না, তা হচ্ছে অসম্ভব।
বিমল মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললে, কি অসম্ভব, কুমার?
ডাক্তার মোরের দ্বীপের সঙ্গে নিশ্চয়ই চাটগাঁয়ের ওই আশ্চর্য মানুষটার কোনও সম্পর্ক নেই।
কেন?
প্রশান্ত মহাসাগরে দক্ষিণ-আমেরিকার পাশে কোথায় সেই ডাক্তার মোরের আজব দ্বীপ, আর কোথায় এই ভারতবর্ষের চট্টগ্রাম। ও দ্বীপের কোনও জীব কেমন করে এখানে এসে হাজির হবে? এটা কি অসম্ভব নয়?
কুমার, তোমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমিও তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। ওখান থেকে কোনও জীবের ভারতবর্ষে আসাটা কি ডাক্তার মোরের দ্বীপের চেয়েও বেশি অসম্ভব?
তুমি কি বলতে চাও, বিমল?
বিমল বললে, ভূ-পর্যটক ফিলিপ সাহেবের কথা তোমার মনে আছে!
কুমার বললে, ফিলিপ? যার সঙ্গে আমরা দক্ষিণ-আমেরিকার ইকুয়াডর রাজ্যে সূর্যনগরীর গুপ্তধন দেখতে গিয়েছিলুম? নিশ্চয়ই। তাঁর কথা কি এত শিগগিরই ভুলতে পারি?
বিমল বললে, হ্যাঁ, আমি সেই ফিলিপ সাহেবের কথাই বলছি। এটাও তুমি ভোলোনি বোধহয়, মিস্টার ফিলিপ তার ভূ-পর্যটনের গল্প বলতে বলতে কত দেশের বিচিত্র সব রহস্যের কথা শুনিয়েছিলেন। তাঁরই মুখে ডাক্তার মোরের দ্বীপের কথা আমি প্রথম শুনি। প্রশান্ত মহাসাগরের ঠিক যেখানে সেই দ্বীপটি আছে, মি. ফিলিপ একখানা নকশা এঁকে তাও আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা যদি একখানা জাহাজ ভাড়া করে সমুদ্রপথে বেরিয়ে পড়ি, তাহলে সেই নকশা অনুসারে অনায়াসেই মোরের দ্বীপে গিয়ে হাজির হতে পারব।
জয়ন্ত বললে, কিন্তু বিমলবাবু, কুমারবাবুর মুখে যে অদ্ভুত মানুষটার গল্প শুনে আপনি এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হয়েছেন, আমিও সেই মানুষটার সঙ্গে সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের কোনও অদ্ভুত দ্বীপের কিছুমাত্র সম্পর্ক আবিষ্কার করতে পারছি না! আমারও প্রশ্ন হচ্ছে, একখানা ছোট বোটে চড়ে অত দুর থেকে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে কেউ কি ভারতবর্ষে এসে উঠতে পারে!
বিমল ধীরে-ধীরে বললে, জয়ন্তবাবু, মাঝে-মাঝে আপনি কি খবরের কাগজে পড়েননি যে, ছোট-ছোট তুচ্ছ নৌকায় চড়ে একাধিক সাহেব সমুদ্রপথে পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন? মাঝে মাঝে একথাও শোনা যায়, চিনা ও জাপানিরা ওইরকম ছোট নৌকোয় চেপে অতবড় প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে আমেরিকা পর্যন্ত গিয়ে পড়েছে। কিন্তু এখানে ওই নৌকোর কথা না তুললেও চলে। কারণ, কুমারের দেখা ওই অদ্ভুত জীবটা যে নৌকোর চড়েই ভারতবর্ষে এসে পড়েছে, তারও কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই। হয়তো সে অন্য কোনও উপায়ে এখানে এসে হাজির হয়েছে, তারপর যেভাবেই হোক, একখানা নৌকো সংগ্রহ করেছে। সেই উপায়টা যে কি, তা নিয়ে আপাতত আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই। আর ওই জীবটা যে মোরোর দ্বীপেরই বাসিন্দা, তাও আমি জোর করে বলতে চাই না; কিন্তু কুমারের মুখে দ্বীপটার বর্ণনা শুনে আমার মনে প্রথমেই অনেক দিন পরে জেগে উঠেছে ডাক্তার মোরোর দ্বীপের কাহিনি। বহুকাল থেকেই আমার বাসনা ছিল আমরাও একবার ওই দ্বীপে গিয়ে দেখে আসব ভূ-পর্যটক ফিলিপ সাহেবের আর এইচ জি ওয়েলসের কথা সত্যি কিনা! যদি আমরা সেখানে গিয়ে হাজির হতে পারি, তাহলে চট্টগ্রামের এই আজব জীবটার সঙ্গে কেন যে আমি ওই দ্বীপটার সম্পর্ক নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছি সেকথা আপনাদের কাছে খুলে বলব।
মানিক বললে, বিমলবাবু, ডাক্তার মোরোর দ্বীপের রহস্য আমরা কোনওদিনই শুনিনি। আপনি দু-চার কথায় খুলে বলবেন কি?
