আমি বললুম, বেশ, তাহলে গাছ থেকে নেমে পড়ো। যে জীবটাকে দেখেছি, নিশ্চয় সে আমার গুলিতে জখম হয়েছে। জঙ্গলের ভিতর থেকে তাকে খুঁজে বার করা খুব কঠিন হবে না।
সমস্ত বনভূমি তখন সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল জ্যোতির্ময়ী ঊষার শান্ত আশীর্বাদে। আকাশ বাতাস পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পাখির প্রভাতী সংগীতে। মাথার ওপরে আকাশ-পথ দিয়ে আঁকে আঁকে উড়ে যাচ্ছে বালিহাঁস, বনমুরগি এবং অন্যান্য পাখি। চোখের সামনে নেই আর অন্ধকার বা আবছায়ার বাধা।
মাটিতে নেমে আমরা দুজনে বন্দুক প্রস্তুত রেখে অগ্রসর হলুম। জঙ্গলের যেখানে গিয়ে জীবটা অদৃশ্য হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলুম, মাটির ওপরে রয়েছে টাটকা রক্তের দাগ। সেই রক্তের দাগ ধরে আমরা এগিয়ে চললুম।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বেশ খানিকটা এগুবার পর আমরা গিয়ে পড়লুম ফরসা জায়গায়। সেই খোলা জমির ওপরে গাছপালা নেই, মাঝে-মাঝে আছে কেবল ঝোপঝাঁপ বা ছোট ছোট আগাছার জঙ্গল। তারপর দেখা যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের সীমাহারা নীল জলের বিস্তার। রক্তের চিহ্ন চলে গিয়েছে সমুদ্রের দিকে।
বিনোদলাল বললে, কুমার তুমি যে জীবটাকে আহত করেছ, নিশ্চই সেটা জানোয়ার নয়। এখানে রক্তের দাগের সঙ্গে যে পায়ের চিহ্নগুলো দেখা যাচ্ছে, এগুলো মানুষের পায়ের ছাপ না হয়ে যায় না।
বিনোদলাল ভুল বলেনি। সত্যি, এগুলো মানুষের পায়ের দাগই বটে।
বিনোদের কথার কোনও জবাব না দিয়ে পদচিহ্নের অনুসরণ করে আমি দৌড়োতে আরম্ভ করলুম। খানিকটা অগ্রসর হবার পরেই হঠাৎ দেখতে পেলুম, একখানা নৌকো তট ছেড়ে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে এবং সেখানে চালনা করছে একটিমাত্র মানুষ।
আচম্বিতে সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে এল একটা বিশ্রী অট্টহাসি। তোমরা শুনলে বিশ্বাস করবে না, কিন্তু সেই অদ্ভুত অট্টহাসির মধ্যে আমি পেলুম যেন একসঙ্গে মানুষের কণ্ঠস্বর এবং ব্যাঘ্রের হুঙ্কার।
খালি চোখে নৌকাবাহী মূর্তিটাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। আমার সঙ্গে ছিল দূরবিন, তাড়াতাড়ি সেটা বার করে চোখের সামনে ধরলুম।
যা দেখলুম তা কেবল আশ্চর্য নয়, উদ্ভটও বটে! নৌকোর ভেতরে বসে আছে একটা সম্পূর্ণ নগ্ন মনুষ্য মূর্তি। কিন্তু তার গায়ের রং অনেকটা চিতাবাঘের মতো! হলদের ওপর গোল গোল কালো ছাপ। কোনও কথা না বলে দূরবিনটা বিনোদলালের হাতে দিলুম। সেও মূর্তিটাকে দেখে প্রথমটা চমকে উঠল, তারপর দূরবিন নামিয়ে আমার দিকে ফিরে বললে, কুমার, আমার কি সন্দেহ হচ্ছে জানো? ও লোকটা বোধহয় নিজের দেহের ওপরে তুলি বুলিয়ে চিতাবাঘের রং ফলিয়েছে।
কিন্তু কেন?
কেন আর, ও লোকটা বোধহয় ছদ্মবেশে এখানকার সকলকে ভয় দেখাতে চায়!
তা হলে তুমি ওকে মানুষ বলে মনে করো?
নিশ্চয়ই! রং ছাড়া ওর দেহের সমস্তটাই প্রমাণ দিচ্ছে যে ও হচ্ছে মানুষ! আর মানুষ ছাড়া অন্য কোনও জীবকে কখনও তুমি কি নৌকো চালাতে দেখেছ?
কিন্তু তুমি কি একথাও কখনও শুনেছ যে, মানুষ কখনও নরখাদক বাঘের মতো কাঁচা মাংস খাবার জন্যে গো-হত্যা আর নরহত্যা করেছে? ও মূর্তিটা আবার ইংরেজি ভাষায় কথা কয়। অথচ ও যেভাবে অট্টহাসি হাসলে, তার ভেতরেও পাওয়া গেল হিংস্র বাঘের গর্জন। কোনও মানুষ ওরকম গর্জন করতে পারে একথা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। আসলে কথা কি জানো বিনোদলাল? এ এক অদ্ভুত প্রহেলিকা! নইলে স্বচক্ষে যা দেখছি, স্বকর্ণে যা শুনছি, তাও সত্য বলে ভাবতে পারছি না কেন?
বিমল, এই হচ্ছে আমার কাহিনি। এই সঙ্গে এটুকু আমি বলে রাখি, এই ঘটনার পরে আরও দুদিন আমি চট্টগ্রামে ছিলুম। কিন্তু ও অঞ্চলে আর কোনও নৈশ উপদ্রবের কথা আমরা শুনতে পাইনি।
.
০৩.
কুমারের কাহিনি শেষ হওয়ার পর সকলে খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। বিমলের কপালের চর্ম কুঞ্চিত হয়ে উঠল, তার মুখে ফুটল গভীর চিন্তার লক্ষণ।
সর্বপ্রথমে কথা কইলে জয়ন্ত। সে ধীরে ধীরে বললে, নেকড়ে বাঘ আর ভালুকেরা যে মাঝে-মাঝে মানুষের শিশু ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা না করে পালন করে, এর কয়েকটি বিশ্বাসযোগ্য নজির আছে। কুমারবাবু যে কাহিনি শোনালেন, তাও কি সেইরকম কোনও ব্যাপার হতে পারে না? হয়তো কোনও মানুষ শিশু বয়স থেকে চিতাবাঘিনীর বাসায় পালিত হয়েছিল। তাই সেও পেয়েছে বাঘের স্বভাব, জীব-জন্তুর কাঁচা মাংস না হলে তার চলে না।
বিমল বললে, চিতা আর ভাল্লুকের বাসায় পালিত মানুষের কাহিনি যে সত্যি, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ওই শ্রেণির মানুষের স্বভাব জন্তুর মতো হয় বটে, কিন্তু তাদের সম্বন্ধে আরও কতকগুলি কথা জানা গিয়েছে। প্রথমত প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, তারা পনেরো-বিশ বছরের বেশি বাঁচে না। অনেকে তারও আগে মারা যায়। দ্বিতীয়ত জঙ্গল থেকে মানুষের আশ্রয়ে এসেও তারা মানুষের ভাষায় দু-চারটের বেশি কথা কইতে শেখে না; তৃতীয়ত, নেকড়ে বা ভালুকের দ্বারা পালিত মানুষের গায়ের রং নেকড়ে বা ভালুকের মতো হয় না; কিন্তু কুমারের কাহিনিতে আমার যে মানুষটির কথা শুনলুম, তা হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আহত বলে সে পরিষ্কার ইংরেজি ভাষায় আর্তনাদ করে। এই ভাষা সে কোথায় কার কাছে শিখলে? ভারতবর্ষের কোথাও চিতাবাঘের দ্বারা পালিত মানুষ সাহেবের আশ্রয়ে এসে ইংরেজি ভাষা শিখলে, সে কথা আজ দেশে দেশে বিখ্যাত হয়ে উঠত। কিন্তু এমন কোনও চিতা-মানুষের কাহিনি কোনও দিনই আমাদের কানে ওঠেনি।
