লোকটি কাঁদো কাঁদো মুখে আবার বললে, হুজুর, রক্ষা করুন, আমাদের রক্ষা করুন।
বিনোদ অধীর স্বরে বললে, আরে, আমরা তোমাদের কেমন করে রক্ষা করব? তোমাদের জন্যে কি আমরা বন্দুক ঘাড়ে করে রাত্রে হাটে-মাঠে-ঘাটে পাহারা দিয়ে বেড়াব?
বিমল, আগেই বলেছি ততক্ষণে আমার কৌতূহল রীতিমতো জেগে উঠেছে। ঘটনার মধ্যে আমি পেলুম যেন রহস্যের গন্ধ। আমি বললুম, বিনোদ আমরা ইচ্ছে করলে হয়তো এদের কিছু সাহায্য করতে পারি।
কীরকম? তুমি তো কালকেই কলকাতার দিকে রওনা হতে চাও।
তুমি যদি রাজি হও, তাহলে আমি আরও তিন-চার দিন এখানে থেকে যেতে পারি।
বিনোদ হেসে ফেলে বললে, বুঝেছি। চড়ুকে পিঠ সড়সড় করে আর ধুনোর গন্ধ পেলেই মনসা নাচেন। বেশ, যা ভালো বোঝো করো।
বিমল, তার পরেই তোমার কাছে আসে আমার প্রথম টেলিগ্রাম।
লোকে যেমন করে বাঘ শিকার করে, আমিও অবলম্বন করলুম সেই পদ্ধতি।
পরদিনেই খবর এল, কুতুবদিয়া প্রণালী সৃষ্টি করে পৃথিবীর একটা বাহু যেখানে বঙ্গোপসাগরের ভিতরে অগ্রসর হয়ে গিয়েছে, সেই নরখাদক জন্তুটার শেষ আবির্ভাব হয়েছে। সেখানেই। ঝোপের ভিতরে সেখানেও পাওয়া গিয়েছে একটা গরুর খানিকটা খাওয়া দেহ।
হিংস্র জন্তুদের স্বভাবই হচ্ছে, উদর পূর্ণ হবার পর কোনও দেহের খানিকটা বাকি থাকলে তারা সেটা ঝোপ-ঝাপের ভিতরে লুকিয়ে রেখে যায়। পরদিন রাত্রে আবার তারা ফিরে এসে দেহের বাকি অংশটাকে গ্রহণ করে।
আমরা ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে দেখলুম, যে ঝোপের ভিতরে গরুর দেহটা আছে, তার খুব কাছেই রয়েছে একটা মস্তবড় গাছ। লোকজনের সাহায্যে সেই গাছের ওপরে বাঁধলুম একটা মাচা। তারপর সন্ধ্যার আগেই বিনোদকে নিয়ে আমি সেই গাছে উঠে মাচার ওপরে গিয়ে বসলুম।
রাত্রের প্রথম দিকে আকাশে ছিল অষ্টমীর চাঁদ। আলো খুব স্পষ্ট না হলেও চারিদিকে বেশ নজর চলছিল। যে ঝোপটার দিকে আমাদের লক্ষ্য, তার দুই পাশেই ছিল খানিকটা করে খোলা জমি। তারপর দুই দিকেই দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের প্রাচীর। ওই ঝোপটার ভিতরে ঢুকতে হলে ভোলা। জমিটা পার না হলে আর উপায় নেই। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই আমার চোখে পড়ল না।
তারপর চাঁদ গেল অস্তে। চারিদিকে অন্ধকার, আমাদের চোখও অন্ধ। বিনোদ একে রাত জাগতে অভ্যস্ত নয়, তার ওপরে এই অন্ধকারের জন্যে বিরক্ত হয়ে সে আরম্ভ করলে নিদ্রাদেবীর আরাধনা। আমি কিন্তু ঠায় জেগেই বসে রইলুম। কোনও দিকে চোখ চলছিল না। বটে, কিন্তু আমার দুই কান হয়ে রইল অত্যন্ত সজাগ। সে রাত্রে বাতাস পর্যন্ত ছিল না, বনের গাছপালা একেবারে নীরব; কিন্তু এই স্তব্ধতাকে ভাঙতে পারে এমন কোনও শব্দই আমার কানে প্রবেশ করলে না।
পূর্ব আকাশে ফুটে উঠল ভোরের আলোর প্রথম আভাসটুকু। দু-একটা পাখিও ডাকতে আরম্ভ করলে।
আমার রাত জাগা ব্যর্থ হল ভেবে বিনোদকে জাগিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ করছি, এমনসময় সচকিতে দেখলুম হঠাৎ এক দৃশ্য!
ডান দিকের জঙ্গলের ভিতর থেকে জানোয়ারের মতো দেখতে কি একটা বেরিয়ে এল। অত্যন্ত ঝাপসা আলোতে জানোয়ারটা যে কি, তা বুঝতে পারলুম না; কিন্তু সে যে চার পায়ে ভর দিয়ে হাঁটছে এটুকু আমি লক্ষ্য করলুম। চলতে-চলতে একবার সে সন্দিগ্ধ ভাবে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আমাদের গাছের দিকে দৃষ্টিপাত করলে। অন্ধকারে বিড়ালের চোখ যেমন জ্বলে, তারও দুই চক্ষে রয়েছে তেমনি জ্বলন্ত নীলাভ আলো।
নিশ্চয়ই সে আমাকে দেখতে পায়নি, কারণ আবার সে অগ্রসর হল সেই ঝোপটার দিকে যার ভিতরে ছিল গরুটার অর্ধভুক্ত দেহ।
.
আমি বুঝলুম এই আমার সুযোগ। বন্দুক তুলে তখনই ঘোড়া টিপে দিলুম।
বন্দুকের গর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই শুনলুম একটা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত চিৎকার! যাকে মনে করছিলুম হিংস্র জন্তু, হঠাৎ সে দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বিষম যন্ত্রণায় ইংরেজি ভাষায় আর্তনাদ করে উঠল, Oh my God! My God!
দ্বিতীয়বার বন্দুক ছোড়বার জন্যে আমার হাতের আঙুল তখন আবার ঘোড়ার ওপরে গিয়ে পড়েছিল, কিন্তু মনুষ্য-কণ্ঠের সেই আর্তনাদ শুনে আমি এমন হতভম্ব হয়ে গেলুম যে, আর বন্দুক ছুঁড়তে পারলুম না।
মানুষই হোক আর জানোয়ারই হোক, সেই জীবটা আবার মাটির ওপরে পড়ে চতুষ্পদ জন্তুর মতোই বেগে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল ডানদিকের জঙ্গলের মধ্যে।
ইতিমধ্যে কানের কাছে বন্দুকের শব্দ শুনেই বিনোদলালের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তার ওপরে আবার মানুষের আর্তনাদে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেল সে!
প্রায় এক মিনিটকাল আমরা দুজনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলুম।
তারপর বিনোদ জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাপার কি কুমার? বন্দুক ছুড়লে কেন? মানুষই বা আর্তনাদ করলে কেন? জানোয়ার ভেবে তুমি মানুষ খুন করলে নাকি?
আমি বললুম, আপাতত তোমার কোনও প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর দিতে পারব না। তবে চতুষ্পদ জন্তুর মতো একটা কিছু দেখেছিলুম নিশ্চয়ই, নইলে খামোকা বন্দুক ছুঁড়তে যাব কেন? কিন্তু বন্দুক ছোড়বার ঠিক পরেই একটা মানুষের আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গেই মূর্তিটা দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল; তারপর সে পালিয়ে গেল আবার চতুষ্পদ জন্তুর মতোই চার পায়ে ভর দিয়ে।
বিনোদলাল আমার কথা বিশ্বাস করলে না। মাথা নেড়ে বললে, তুমি নিশ্চয় তন্দ্রায় আচ্ছন্ন চোখে রজ্জুতে সর্পভ্রম করেছ! চতুষ্পদ জানোয়ার কখনও মানুষের ভাষায় চিৎকার করে না। আর মানুষও কখনও চতুষ্পদ জন্তুর মতো চার পায়ে ভর দিয়ে ছুটে পালায় না।
