খানিক পরে রাস্তায় দরজার কাছে একখানা গাড়ি আসবার শব্দ হল। অনতিবিলম্বেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে কুমার। জয়ন্ত বললে, কুমারবাবু, আপনার টেলিগ্রামে যা দেখেছি, আপনার মুখেও দেখছি তাই।
আমার মুখে কি দেখছেন জয়ন্তবাবু?
রহস্যের আভাস।
হাতের বন্দুকটা একটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে কুমার বললে, হ্যাঁ জয়ন্তবাবু, আপনি ভুল দেখেননি। যা-তা রহস্য নয়–যাকে বলে একেবারে গভীর রহস্য; কিন্তু সেকথা পরে বলছি, আগে বনমুরগিগুলোর একটা ব্যবস্থা করি।…রামহরি, ও রামহরি!
পাশের ঘর থেকে সাড়া এল, কি বলছ গো কুমারবাবু?
গাড়ির চালে এক ঝাঁকা জ্যান্ত রামপাখি আছে। তুমি সেগুলোকে বাগানে মুরগি-ঘরে রেখে এসো। তারপর তাড়াতাড়ি আমার জন্যে খুব গরম এক পেয়ালা চা বানিয়ে দাও।
কুমার নিজের কোটটা খুলে একখানা সোফার ওপরে নিক্ষেপ করলে। তারপর নিজেও সেখানে বসে পড়ে বলল, বিমল, অদ্ভুত ব্যাপার–একেবারে অভাবিত!
বিমল বললে, তোমার মুখ থেকে শুনছি বলেই ব্যাপারটা অদ্ভুত বলে বিশ্বাস করছি। পৃথিবীর সাড়ে পনেরো আনা লোকই যেসব ব্যাপারকে অদ্ভুত বলে মনে করে, তার মধ্যে। আমি কিছু মাত্র অদ্ভূতত্ত্ব খুঁজে পাই না। কিন্তু তোমার-আমার কথা স্বতন্ত্র। এই জীবনেই আমরা এমন সব অসাধারণ ব্যাপার দেখেছি যে, আমাদের কাছে বোধহয় অদ্ভুত বলে আর কিছুই থাকতে পারে না। কাজেই তুমি যা অদ্ভুত আর অভাবিত বলে বর্ণনা করবে, নিশ্চয়ই তার মধ্যে দস্তুরমতো অসাধারণত্ব আছে। আমরা প্রস্তুত, আরম্ভ করো তোমার অদ্ভুত কাহিনি।
.
বিমল সোফার ওপর একটু সোজা হয়ে বসল। গল্প শুনবার জন্যে উন্মুখ হয়ে সবাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল।
বিশাল হলঘর একেবারে নিস্তব্ধ!
.
০২. জন্তু না মানুষ
কুমার শুরু করলে কেমন করে আমি জ্যান্ত বনমুরগি সংগ্রহ করলুম সে কথা শোনবার জন্যে নিশ্চয়ই তোমাদের আগ্রহ নেই। সুতরাং এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, চট্টগ্রাম বিভাগে একটা পাহাড় অঞ্চলের বনের ভিতরে গিয়ে এই পক্ষীগুলোকে আমি বন্দি করেছি। অবশ্য এই কাজে আমার জমিদার বন্ধু বিনোদলাল আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন।
ফেরবার সময় সমুদ্রের ধার দিয়ে আসছিলুম। সমুদ্র থেকে মাইল দশেক তফাতে চাকারিয়া নামে একটি জায়গা আছে। সেখানে বিনোদের কয়েক ঘর প্রজা ছিল। তাদের কয়েকজন বিনোদের সঙ্গে দেখা করতে এল। লক্ষ করে দেখলুম, তাদের প্রত্যেকেরই মুখে-চোখে দুশ্চিন্তার চিহ্ন। তারা জানালে, একটা নর খাদক জন্তু এসে তাদের ওপরে ভীষণ অত্যাচার করছে। ইতিমধ্যেই অনেকের গরু ও ছাগল তো অদৃশ্য হয়েছেই, তার ওপরে জন পাঁচেক মানুষকেও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
বিনোদ জিজ্ঞাসা করলে, জন্তুটা কি? বাঘ, না অন্য কোনও জানোয়ার?
উত্তরে জানা গেল, জানোয়ারটাকে কেউই স্বচক্ষে দেখেনি। গফুর আলির বাড়ি থেকে জানোয়ারটা যেদিন একটা বাছুর নিয়ে যায়, সে রাত্রে বৃষ্টি পড়ে পথঘাট হয়েছিল কর্দমাক্ত। সকালবেলায় খোঁজাখুঁজির পর বাছুরের আধ-খাওয়া দেহটা পাওয়া যায় মাঠের একটা ঝোপের ভিতরে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই, সেখানে কাদার ওপরে কোনও জন্তুরই পায়ের দাগ পাওয়া যায়নি। কেবল এটা বেশ বোঝা গিয়েছে যে, রাত্রে একজন মানুষ ওই ঝোপের ভিতরে ঢুকে আবার বাইরে এসেছিল। কাদার ওপরে স্পষ্ট ভাবেই দেখা গিয়েছিল একটা মানুষের পদচিহ্ন।
এইখানেই জেগে উঠল আমার আগ্রহ। জিজ্ঞাসা করলুম, তোমরা কি বলতে চাও, মানুষ ছাড়া কোনও জন্তুই মাটির ওপরে পদচিহ্ন ফেলে সেই ঝোপের ভিতরে প্রবেশ করেনি?
একজন বললে, প্রবেশ করেনি একথা কেমন করে বলব! ঝোপের ভিতরে বাছুরটার আধখাওয়া দেহ যখন পাওয়া গিয়েছে, তখন বুঝতে হবে যে, এ কাজ কোনও মানুষের নয়। মানুষ কখনও গরু-বাছুরের কাঁচা মাংস খেতে পারে না। বাছুরটা যে কোনও হিংস্র জন্তুর কবলে পড়েছিল, সে বিষয়ে একটুও সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই জন্তুটা যে কেমন করে ঝোপের ভিতরে ঢুকে আবার বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে, কাদার ওপরে তার কোনও চিহ্নই আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি!
বিনোদ বললে, তাহলে কি তোমরা বলতে চাও জন্তুটা আকাশপথ দিয়ে আনাগোনা করেছে? তোমাদের কথায় আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
লোকটি বললে, হুজুর আমাদের কথায় বিশ্বাস না করলে আমরা মারা পড়ব। এ অঞ্চলে রোজ রাত্রেই, হয় মানুষ নয় গরু-ছাগল অদৃশ্য হচ্ছে। চারিদিকে এমন বিভীষিকার সৃষ্টি হয়েছে যে, সন্ধ্যার পরে পথে-ঘাটে কেউ পা বাড়াতে ভরসা করে না। এমনকী রাত্রেও আমরা ভয়ে ঘুমুতে পারি না। হুজুর হচ্ছেন জমিদার, আপনি আমাদের রক্ষা না করলে আমরা কোথায় দাঁড়াব বলুন?
বিনোদ বললে, এ ব্যাপারে আমি তোমাদের কি সাহায্য করতে পারি কিছুই তো বুঝতে পারছি না!
হুজুর, আপনাদের দুজনেরই কাছে বন্দুক রয়েছে। আপনারা ইচ্ছে করলেই জন্তুটাকে বধ করতে পারেন।
বিনোদ বললে, তোমরা বাজে কথা বলছ। তোমরাও জন্তুটাকে দেখতে পাওনি, আবার বলছ মাটির ওপরে পায়ের দাগ ফেলে সে চলাফেরা করে না। ঝোপের কাছে পেয়েছ মানুষের কতকগুলো পদচিহ্ন। মানুষ গরু-বাছুরের কাঁচা মাংস খায় না, এ কথা সত্য; কিন্তু কোনও মানুষ রাত্রে সেই ঝোপের ভিতরে যাবেই বা কেন? তোমাদের কোনও কথারই মানে আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
