জয়ন্ত এবং মানিক বোধহয় তোমাদের কাছে অচেনা নয়। মাঝে মাঝে তারা বিমলদের সঙ্গে দেখা করতে আসত, সেদিনও এসেছিল। আর সুন্দরবাবুর কথা তো বলাই বাহুল্য! কারণ, এখানকার প্রভাতী চায়ের বৈঠকে কোনওদিনই তাকে অনুপস্থিত দেখা যায় না। সুতরাং বলতে হবে আজকের চায়ের আসরটি জমে উঠেছিল রীতিমতো।
এমনকী বাঘা কুকুরও হাজিরা দিতে ভোলেনি। সেও সামনের দুই পায়ে ভর দিয়ে বসে দুই কান তুলে ঊর্ধ্বমুখে অত্যন্ত উৎসুক ভাবে তাকিয়ে ছিল চায়ের টেবিলের দিকে। সে বেশ জানে, টেবিলের ওপর থেকে এটা-ওটা-সেটা কিছু কিছু অংশ তারও দিকে নিক্ষিপ্ত হবে।
মাঝে-মাঝে রামহরি খাবারের ট্রে হাতে করে ঘরের ভিতরে ঢুকে সকলকে পরিবেশন করে আবার বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
সুন্দরবাবু একখানা গোটা স্যান্ডউইচ নিজের মস্ত মুখবিবরে ছেড়ে দিয়ে চর্বণ করতে করতে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, বিমল ভায়া, তোমাদের প্রতি জন্মতিথিতেই তো আমরা এসে নিমন্ত্রণ খেয়ে যাই; কিন্তু এবারকার খাদ্যতালিকার ভিতরে আমার একটি বিনীত প্রার্থনা ঠাই পাবে কি?
সুন্দরবাবুকে জ্বালাবার কোনও সুযোগই মানিক ত্যাগ করে না। সে বললে, আপনার বিনীত প্রার্থনাটি নিশ্চয়ই খুব অসাধারণ? হয়তো বলে বসবেন, আমি কঁঠালের আমসত্ত্ব খাব।
সুন্দরবাবু স-টাক মাথা নেড়ে বললেন, না কখখনো নয়, অমন অসম্ভব আবদার আমি করব না। ফাজিল ছোকরা কোথাকার, আমায় কি কচি খোকা পেয়েছ?
কুমার হাসতে হাসতে বললে, আমাদের জন্মদিন আসতে না আসতেই চায়ের পেয়ালায় তুমুল তরঙ্গ ভোলা কেন? মানিকবাবু, আপনি সুন্দরবাবুকে আর বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, ওঁর যা বলবার আছে উনি বলুন।
সুন্দরবাবু মানিকের দুষ্টুমিভরা হাসির দিকে একবার সন্দেহপূর্ণ নেত্রে তাকিয়ে বললেন, আমার কথাটা কি জানেন কুমারবাবু? এবারে আপনাদের জন্মতিথির খাদ্যতালিকায় কিঞ্চিৎ নতুনত্ব সৃষ্টি করলে কেমন হয়?
কীরকম নতুনত্ব সুন্দবাবু!
দেখুন কুমারবাবু, চিরদিনই শুনে আসছি বনমুরগির মাংস নাকি একটি উপাদেয় খাদ্য; কিন্তু এমনই আমার দুর্ভাগ্য যে, আজ পর্যন্ত আমার খাবারের থালায় বন-মুরগির আবির্ভাব হল না কখনও। আপনাদের জন্মতিথির দৌলতে যদি সেই সৌভাগ্যটা লাভ করতে পারি, তা হলে আমার একটি অনেক দিনের বাসনা চরিতার্থ হয়।
মানিক বললে, দেখছ তো জয়ন্ত, সুন্দরবাবুর আবদারটি কতদূর অসংগত!
সুন্দরবাবু কিঞ্চিৎ উত্তপ্ত স্বরে বললেন, কেন, অসংগত কেন? আমি কি কঁঠালের আমসত্ত্ব খেতে চাইছি? বনমুরগি কি দুনিয়ায় পাওয়া যায় না?
মানিক বললে, দুনিয়ায় অবশ্য পাওয়া যায়, কিন্তু কলকাতা শহরে পাওয়া যায় না। আপনার বনমুরগির জন্যে বিমলবাবুরা বনবাস করবেন নাকি?
জয়ন্ত বললে, অভাবে কলকাতার ফাউল হলে কি চলবে না? সুন্দরবাবু কি বলেন?
সুন্দরবাবু বললেন, আমার আর কিছুই বক্তব্য নেই। আরজি পেশ করলুম এখন। বিমলবাবুদের যা মর্জি হয়।
কুমার চো করে শেষ চা-টুকু পান করে উৎসাহিত কণ্ঠে বললে, তথাস্তু, সুন্দরবাবু, তথাস্তু! আমাদের আসছে জন্মবারে আপনাকে বনমুরগির মাংস খাওয়াবই, খাওয়াব।
বিমল একটু বিস্মিত স্বরে বললে, কুমার, তুমি যে একেবারে কঠিন প্রতিজ্ঞা করে বসলে হে! কলকাতার কোনও বাজারে বনমুরগি বিক্রি হয় নাকি?
কুমার বললে, মোটেই না!
তবে?
আমার বন্ধু বিনোদলাল রায়চৌধুরী হচ্ছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের জমিদার। তিনি প্রায়ই আমাকে ওখানে যাবার জন্যে নিমন্ত্রণ করেন। তুমি জানো বোধহয় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বনে ঝাঁকে আঁকে বনমুরগি পাওয়া যায়। মনে করছি, কালই আমি দিনকয়েকের জন্য চট্টগ্রাম যাত্রা করব।
মানিক বললে, সে কি কুমারবাবু, সুন্দরবাবুর একটা আবদার রক্ষা করবার জন্যে আপনি এতটা কষ্ট স্বীকার করবেন?
না মানিকবাবু, কেবল সুন্দরবাবু কেন, আমি আপনাদের সকলেরই তৃপ্তি সাধনের জন্যে চট্টগ্রামে যেতে চাই। জন্মতিথিতে বন্ধুদের যদি একটি নতুন জিনিস খাওয়াতে না পারি, তা হলে জন্মতিথির আর সার্থকতা রইল কোথায়? আমি কালই চট্টগ্রামের দিকে ধাবমান হব। তারপর সেখানকার বন থেকে ডজনখানেক জাত বনমুরগি সংগ্রহ করে আবার ফিরে আসব আমাদের কলকাতার।
মানিক বললে, সুন্দরবাবু, আপনার বিনীত প্রার্থনা তা হলে পূর্ণ হল। এইবারে আপনি পরমানন্দে অট্টাহায্য করতে পারেন।
সুন্দরবাবু অত্যন্ত খাপপা হয়ে কেবল বললেন, হুম।
.
চট্টগ্রাম থেকে কুমারের ফেরবার কথা ছিল বিশ তারিখে।
কিন্তু ঠিক তার আগের দিনে কুমারের কাছ থেকে বিমল এই টেলিগ্রাম পেলে, বনমুরগি পেয়েছি; কিন্তু আসছে কাল কলকাতার পৌঁছোতে পারব না। বিশেষ কারণে আমাকে আরও দিনকয়েক এখানে থেকে যেতে হবে। এজন্যে যদি আমাদের জন্মতিথি-উৎসব মাটি হয়, উপায় নেই।
টেলিগ্রামখানি হাতে করে বিমল বিস্মিত মনে ভাবতে লাগল, কুমারের বিশেষ কারণটা কী হতে পারে? নিশ্চয়ই কোনও সাধারণ কারণ নয় যার জন্যে বনমুরগি পেয়েও সে যথাসময়ে এখানে আসতে নারাজ।
তেইশ তারিখে কুমারের আর একখানা টেলিগ্রাম এল। সেখানি পড়ে বিমল জানতে পারলে, চব্বিশ তারিখের সকালে সে কলকাতা এসে পৌঁছোবে।
কুমার একটি রীতিমতো রহস্যপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি করে তুলেছিল। সেই জন্য বৈঠকখানায় তার জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল বিমল, জয়ন্ত ও মানিক।
