কফিখানায় মালিক বললে, চেহারা আর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, ও সেই পেরুগিন ছাড়া আর কেউ নয়। খবরের কাগজে আমি পড়েছি, মার্সিলিসের জেল ভেঙে পেরুগিন পালিয়ে এসেছে।–আচ্ছা, ওর সঙ্গে একটু আলাপ করেই দেখা যাক না কেন? মালিক, লোকটির কাছে গিয়ে শুধোলে, কি হে ভায়া, মার্সিলিস থেকে আসছ নাকি?
লোকটি লাফ মেরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, তোর নিকুচি করেছে! যদি এসেই থাকি, হয়েছে কি? বলেই সে কোমরবন্ধে হাত দিলে। তার কোমরবন্ধে রয়েছে মস্ত এক ছোরা!
মালিক বললে, হু, তুমি দেখছি একটি জাহাবাজ বাজপক্ষী! বহুতআচ্ছা, এসো তবে, আমার সাঙাতদের সঙ্গে বসে খেয়ে-দেয়ে একটু ফুর্তি করবে চলো!
লোকটি নারাজ হল না। দলে গিয়ে মিশল বটে, কিন্তু কথাবার্তা বড় একটা কইলে না। নাম জিজ্ঞাসা করাতে বললে, ফ্রাঙ্কোইস। কিন্তু সবাই বুঝলে, তার আসল নাম–পেরুগিন।
আবাদির কানে এই খবর গেল। সে স্থির করলে, এমন কাজের লোককে হাতছাড়া করা হবে না। তার আড্ডায় ফ্রাঙ্কোইসের নিমন্ত্রণ হল। কিন্তু আবাদি-সর্দার বয়সে ছোকরা হলে কি হয়, সে মহা হুঁশিয়ার ব্যক্তি। প্রথমেই সে দেখা দিলে না, আগে আড়াল থেকে লুকিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ধরে ফ্রাঙ্কোইসকে পরীক্ষা করলে। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে পরে সে বেরিয়ে এল!
কিন্তু ফ্রাঙ্কোইস প্রথমটা কিছুতেই তার দলে ভর্তি হতে রাজি হল না। কয়েকদিন সাধাসাধির ও অনেক লোভ দেখাবার পর শেষটা সে স্বীকার পেলে।
ঠিক সেইসময়ে ফ্রান্সের এক মন্ত্রীর বাড়ি লুট করবার জন্যে দলের মধ্যে ষড়যন্ত্র চলছিল। মন্ত্রীবাড়ির এক দাসী ছিল আবাদি সর্দারের চর। সে এসে খবর দিয়েছে, বাড়ির সমস্ত লোকজন নিয়ে মন্ত্রী বিদেশে হাওয়া খেতে গেছেন, বাড়িতে আছে খালি সে আর একজন দ্বারবান।
আবাদি ঠিক করলে, প্রথমেই এই ব্যাপারে ফ্রাঙ্কোইসকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে সে তার সাহস, বুদ্ধি ও শক্তি পরীক্ষা করবে।
যথাসময়ে সন্ধ্যার পর আবাদি-সর্দারের এক চ্যালা একখানি দামি মোটরগাড়ি চুরি করে নিয়ে এল। আবাদি ও ফ্রাঙ্কোইস দস্তুরমতো হোমরা-চোমরার মতো সাজপোশাক পরে মন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হল।
তখন পথঘাট নির্জন। তাদের সন্দেহ করতে পারে এমন কেউ নেই।
বাড়ির ভিতরে ঢুকে আবাদি ও ফ্রাঙ্কোইস দেখলে, একখানা আরাম-চেয়ারে আধশোয়া অবস্থায় দ্বারবান নাক ডাকিয়ে নিদ্রা দিচ্ছে।
আবাদি তার মোটা লাঠিগাছটা বাগিয়ে ধরে পা টিপেটিপে এগিয়ে গেল।
আচম্বিতে বিনামেঘে বজ্রাঘাতের মতো দ্বারবান এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠে আবাদিকে ধরে তুলে আছড়ে মারলে!
আবাদি মাটির উপরে পড়েই চোখের নিমিষে অটোমেটিক রিভলভার বার করে বারংবার ঘোড়া টিপতে লাগল, কিন্তু কী ভয়ানক, ঘোড়া পড়ে, তবু টোটা ফাটে না!!
আবাদি চিৎকার করে উঠল, ফ্রাঙ্কোইস! গুলি করে ওকে মেরে ফেল!
কিন্তু দ্বারবানের পাশে দাঁড়িয়ে তার বন্ধু হাসতে হাসতে বললে, আমি ফ্রাঙ্কোইস নই, আমি পেরুগিনও নই,আমি হচ্ছি, ডিটেকটিভ মার্টিন! তেমার রিভলভার থেকে আমিই টোটা সরিয়ে ফেলেছি!
হিংস্র গোখরোর মতো ফেঁশ করে উঠে আবাদি বললে, ও, তাই নাকি? বেশ, তাহলে ধর আমাকে! বলেই সে জামার পকেট থেকে সুদীর্ঘ এক ছোরা বার করে ফেললে!
মার্টিনের সঙ্কেত শুনে তখনি গুপ্তস্থান থেকে পাঁচজন সশস্ত্র পাহারাওয়ালা আত্মপ্রকাশ করলে!
বিফল আক্রোশে পাগলের মতো হয়ে আবাদি দীর্ঘ ছোরাখানা শূন্যে তুলে তীব্র বেগে মার্টিনকে ছুঁড়ে মারলে! এমন তার হাতের টিপ যে, মার্টিন সাঁৎ করে সরে না দাঁড়ালে ছোরাখানা নিশ্চয়ই তার বুকে গিয়ে বিঁধত!
মার্টিন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই হাতে আবাদির গলা টিপে ধরে বললে, হতভাগা শয়তান! তোকে বধ করলেও কোন পাপ হয়না, কিন্তু তা আমি করব না! নে, এখন হাতকড়ি পর!
.
মার্টিনের নখদর্পণে ছিল আবাদির সব ঘরের খবর। একে-একে তার দলের প্রত্যেকেই ধরা পড়ল।
আবাদিকে অভয় দিয়ে বলা হল, তুমি যদি সরকারি-সাক্ষী হয়ে সব কথা স্বীকার করো, তাহলে তোমার দলের সবাইকে শাস্তি দিয়ে, তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
সে সদর্পে বললে, আমি হচ্ছি, আবাদি-সর্দার! দলের প্রত্যেককে রক্ষা করব বলেই আমি সর্দার হয়েছি। আমি তাদের কারুর বিপক্ষেই সাক্ষী হব না, আমার যা হয়, তোক!
তোমাকে যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তুমি কী করবে?
যা করছিলুম তাই করব! আড্ডায় ফিরে গিয়ে আবার নতুন দল গড়ব।
বিচারের ফলে, আবাদিকে সুদূর কালিফোর্নিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হল, কারাবাসের জন্যে।
আবাদি বললে, তোমরা হুকুম দিয়েছ বলেই যে আমাকে যাবজ্জীবন কারাবাস করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমি ঠিক আবার পালিয়ে আসব।
কিন্তু আবাদি তার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেনি। কারাগারেই জ্বর-রোগে অকালে তার মৃত্যু হয়।
মানুষ যা চায়, আবাদি নিজের চেষ্টায় সে-সমস্তই অর্জন করেছিল–বিদ্যা, বুদ্ধি, শক্তি। কেবল কুপথে গিয়েই সেসব ব্যর্থ করলে।
প্রশান্তের আগ্নেয়-দ্বীপ (উপন্যাস)
০১.
বিমল ও কুমার তো তোমাদের অনেকদিনের বন্ধু, কিন্তু তোমরা বোধহয় এটা জানো না, তারা দুজনেই ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এক তিথিতে এবং একই দিনে।
আজ মাসের পয়লা। এই মাসের আটাশ তারিখে তাদের দুজনের জন্মতিথি। তাদের প্রত্যেক জন্মতিথিতেই বিশেষ একটি অনুষ্ঠান হয়। এবারকার উৎসবে কি করা কর্তব্য, সেদিন সকালের চায়ের আসরে বসে গভীরভাবে চলছিল তারই আলোচনা।
