আরও একটু বড় হয়ে আবাদি পথের ধারের বুকস্টল থেকে দোকানির অগোচরে বই চুরি করতে লাগল। পথে-ঘাটে বা পার্কে ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েরা ছবির ও গল্পের বই নিয়ে বেড়াচ্ছে, হঠাৎ কোথা হতে আবাদি এসে চিলের মতো ছোঁ মেরে বই কেড়ে নিয়ে আবার কোথায় চম্পট দিলে! প্যারিসের বড় বড় বাড়ির নীচে মাটির তলায় কুঠুরি থাকে। এমন একটি কুঠুরি ছিল আবাদির আড্ডা। সেখানে সে রীতিমতো একটা লাইব্রেরি বানিয়ে ফেললে।
তার মতন বুদ্ধিমান ছেলে যদি সৎপথে থাকত, তাহলে আজ হয়তো পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় ও শ্রদ্ধা-সম্মানের অধিকারী হতে পারত। কিন্তু অসত্য-পথে গিয়ে সে প্রকৃত মানুষ হওয়ার সব সুযোগেই বঞ্চিত হয়েছে। পুলিশ-দপ্তরের বাইরে কোথাও তার ঠাঁই নেই।
.
আবাদির বয়স যখন এগারো বছর, তখন সে স্বাধীন, কোনও ভিখারির তাঁবে আর কাজ করে না। জোর করে বা ধমক দিয়ে তাকে তবে রাখবার ক্ষমতাও কোনও ভিখারির ছিল না। প্রথম-প্রথম সে অন্ধ বা পঙ্গু ভিখারিদের পুঁজিপাটা লুট করেই অন্নের সংস্থান করত। তারপর অত অল্প লাভে তার মন আর খুশি হত না। তেরো বছর বয়সে এক ধনীর বাড়িতে হানা দিয়ে সে অনেক টাকাকড়ি নিয়ে সরে পড়ল। পুলিশ এই ছোট্ট কুঁজো চোরের বর্ণনা পেলে, কিন্তু তার খোঁজ পেলে না। পনেরো বছর বয়সে আবাদি তার মতন আরও তিনজন ছোকরা সহকারী পেলে, তারা তাকে সর্দার বলে ডাকতে শুরু করলে। দু-বছরের মধ্যে তার দলে আরও তিনটি ছোকরা যোগ দিলে। দল নিয়ে আবাদি-সর্দার নিয়ম করে চুরি-ব্যবসা চালাতে লাগল। একদিন তারা এক গুদামে চুরি করতে ঢুকেছে, এমন সময়ে পাহারাওয়ালার আবির্ভাব। কিন্তু আবাদি সর্দার ও তার দলবলের হাত থেকে বিষম উত্তম-মধ্যম লাভ করে, পাহারাওয়ালা হল কুপোকাত! সতেরো বছর বয়সে আবাদি প্রথম রক্তের স্বাদ পেলে। এক ডিটেকটিভ তাকে গ্রেপ্তার করতে এল, কিন্তু আবাদি ছোরা মেরে তাকে বেহুশ করে ফেললে।
আবাদির দলবৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে প্যারিস শহরে চুরি, রাহাজানি অসম্ভব বেড়ে উঠল। কারুর লোহার সিন্দুক ভাঙে, কারুর পকেট যায় কাটা, কারুর মাথায় পড়ে লাঠি। শহরে হইচই উঠল।
আবাদির এই সময়কার একখানা ডায়ারি পাওয়া গিয়েছে। তাতে সে লিখেছে : জীবন হচ্ছে, যুদ্ধ। যে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তাকেই আমি মারব। মানুষের সমাজে দুটি দল দেখি। একদলের সব আছে, আর-একদলের কিছুই নেই। যাদের সব আছে, তাদের মাথা কেটে নিয়ে আমি আমার অভাব পূরণ করতে চাই। দুর্বলকে ভক্ষণ করুক বলিষ্ঠরা এবং পুলিশ গণনা। করুক কজন মারা পড়ল।
সত্যসত্যই পুলিশকে গণনা আরম্ভ করতে হল। একের নম্বর হচ্ছে–কেচ। কেচ ছিল আবাদি-সর্দারের ডানহাত। সর্দার কানাঘুষোয় খবর পেলে, তাকে পথ থেকে সরিয়ে কেচ দলপতি হতে চায়! দুদিন পরেই পুলিশ, কেচের মৃতদেহ আবিষ্কার করলে। তার বুকে ছোরার আঘাত!
দুইয়ের নম্বর হচ্ছে, এক জহুরি। আবাদি-সর্দার তার দোকান আক্রমণ করেছিল এবং সে বোকার মতো বাধা দিতে গিয়েছিল। তখনি তার মুণ্ড গেল উড়ে।
তিনের ও চারের নম্বর হচ্ছে, এক গৃহস্থ ও তার মেয়ে। আবাদি দলের একজন চুরি করতে গিয়ে গৃহস্থের বন্দুকের গুলিতে মারা পড়ে। দিনকয় পরে আবাদি প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্যে গৃহস্থ ও তার মেয়েকে হত্যা করে এল।
এইভাবে পুলিশের গণনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলল।
সারা শহরে হল মহা বিভীষিকার সঞ্চার, কারুরই ধন-প্রাণ আর নিরাপদ নয়! অন্ধকার পাতালরাজ্যের কুজ-রাজা আবাদি, বয়স তার আঠারো বৎসর মাত্র, কিন্তু এই বিকলাঙ্গ বালকের ভয়ে সকলেই থরথরি কম্পমান!
প্যারিসের বিশ্ববিখ্যাত পুলিশের লজ্জা ও অপমানের সীমা নেই। তারা আবাদির নাম শুনেছে, চেহারার বর্ণনা পেয়েছে, কিন্তু তার ঠিকানা জানে না। উপরওয়ালাদের কাছে ধমক খেয়ে-খেয়ে, বড় বড় নামজাদা ডিটেকটিভদের প্রাণ হল ওষ্ঠাগত।
মার্টিন নামে এক ছোকরা তখন গোয়েন্দা বিভাগে সবে ঢুকেছে। সে ভাবলে, আবাদি সর্দারকে যদি ধরতে পারি তাহলে আমার উন্নতিতে বাধা দেয় কে? সেও তলে তলে খোঁজ নিতে লাগল, কিন্তু কোথাও তার পাত্তা পেলে না!
.
ইতিমধ্যে আর এক খবর শোনা গেল। পেরুগিন নামে এক দুরাত্মা তার খুড়িকে খুন করে প্রাণদণ্ডের হুকুম পেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই সে কারারক্ষীকে হত্যা করে জেল ভেঙে পালিয়েছে। পুলিশ সন্দেহ করে, সে নাকি প্যারিসে এসেই লুকিয়ে আছে! নানান খবরের কাগজে পেরুগিনের চেহারারও বর্ণনা বেরুল। তার গায়ের জোরও যেমন ভয়ানক, শরীরও তেমনি লম্বা-চওড়া! একে আবাদি-সর্দারকেই নিয়ে লোকের প্রাণান্ত-পরিচ্ছেদ, তার উপরে আবার এই খুনে পেরুগিনের কথা শুনে সকলের পিলে গেল চমকে! এখন কাকে রেখে কাকে সামলানো যায়?
প্যারিসের কোনও-কোনও কফিখানায় ভদ্রলোকেরা প্রাণ গেলেও ঢোকে না। সেখানে কেবল চোর, ডাকাত ও হত্যাকারীর আড্ডা বসে। তোমরা বোধহয় জানো না, কলকাতাতেও এই ধরনের কফিখানা আছে, তাদের মালিকরাও গুন্ডাদের সর্দার।
প্যারিসের ওই শ্রেণির কফিখানায় হঠাৎ একজন নতুন লোকের আবির্ভাব হল। লম্বায় চওড়ায় চেহারা মস্তবড়, সে কারুর সঙ্গেই কথা কয় না, নিজের মনেই খেয়ে-দেয়ে চলে যায়।
চোর ও বদমাইশের দলে কৌতূহল জাগল, এই লোকটা কে?
