হঠাৎ এক জায়গায় তার পকেটে কে হাত দিলে সঙ্গে-সঙ্গে আর্তনাদ। সে ফিরে দেখলে, তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোকরা যন্ত্রণায় ছটফট করছে!
ছোকরা বললে, উঃ! আপনার পকেটে আমার হাত আটকে গেছে! উঃ!
আমার পকেটে? কী আশ্চর্য! এসো, এদিকে এসো, হাত খুলে দিচ্ছি। আড়ালে ডুবইস অপেক্ষা করছিল। ছোকরাকে দেখে সে বললে, কি হে, তুমি হাতকড়ি পরে থানায় যেতে চাও, না, আমাকে নিয়ে তোমার আড্ডায় ফিরে যাবে?
ছোকরা, ডুবইসকে তাদের দলের সর্দারের ঘর দেখিয়ে দিলে।
রাত্রে টেট নিজের ঘরে ফিরে এল। হঠাৎ এক পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ডুবইস তার সোনালি চুলগুলো বজ্রমুষ্ঠিতে চেপে ধরলে। তার হাতে হাতকড়ি পরিয়ে দুই পায়ে দড়ি বেঁধে তাকে মাটির উপরে শুইয়ে রাখলে। তারপর ঘরের চারিদিকে চোরাই মাল খুঁজতে লাগল।
ডুবইস অবাক হয়ে দেখলে, টেট ছোকরার পড়াশুনায় মন আছে। কারণ, ঘরের দেওয়ালে তাকে-তাকে অগুন্তি বই সাজানো রয়েছে। প্রত্যেক বই, পুস্তকের দোকান থেকে চুরি করা।
খানিক পরে একটা শব্দ শুনে ডুবইস ফিরে দেখলে যে, টেট জানলার ভিতর দিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়ছে!
ডুবইস বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল! ঘরের এবড়ো-খেবড়ো দেওয়ালে টেট পায়ের দড়ি ঘষে ছিঁড়ে ফেলেছে।
.
চার
কিন্তু সেই বিশ্বাসঘাতক ছোকরাই কিছুদিন পরে টেটকে আবার ধরিয়ে দিলে।
আদালতে তার বিচার হল। বিচারক গম্ভীরভাবে বললেন, ছোকরা তোমাকে এক বৎসর জেল খাটতে হবে। টেট অবহেলাভরে বললে, এক বছর? মোটে বারোটা মাস! ভারি তো!
আচম্বিতে কাঠগড়া থেকে সে একলাফে বিচারকের টেবিলের উপরে গিয়ে উঠল। সেখান থেকে বিস্মিত পাহারাওয়ালাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বাইরে পালিয়ে গেল। তারপর অনেক কষ্টে আবার তাকে ধরা হল। তার সাহস ও কৌশল দেখে সকলেরই চক্ষু স্থির!
তার কিছুকাল পরে আর-একবার সে পালাবার চেষ্টা করলে–টেটের শেষ-চেষ্টা।
জেলখানার উঁচু ছাদে উঠে সে দেখলে, খানিক নীচে একটা কার্নিশ রয়েছে, সেখানে পৌঁছোতে পারলে পলায়নের অত্যন্ত সুবিধা।
টেট লাফ মারলে। কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত হয়ে কার্নিশে গিয়ে পৌঁছোতে পারলে না! একেবারে মাটির উপরে গিয়ে পড়ে তার ঘাড় ভেঙে গেল।
মোটে বারো বছর বয়সে টেটের মৃত্যু হয়। ফরাসি পুলিশের মতে, আরও কিছুকাল বেঁচে থাকলে, মানুষ খুন করে তাকে ঘাতকের হাতেই মরতে হত।
যত বুদ্ধি থাক, যত সাহস থাক, অসৎ পথের পরিণাম চিরদিনই ভয়াবহ। ভালো ছেলে হলে টেট আজ নিশ্চয়ই মস্ত লোক হতে পারত।
প্যারিসের কুব্জ–রাজা
প্যারিসের পুলিশ-দপ্তরে একটি আশ্চর্য ছোকরার জীবনচরিত লিপিবদ্ধ আছে, সেইটিই তোমাদের শোনাব। মনে রেখো, এই অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনির একটি বর্ণও আমার বানানো নয়।
নাম তার–আবাদি। সে নিশ্চয় কোনও হাড়গরিব হাঘরে বাপ-মায়ের ছেলে! যখন তার বয়স মোটে একদিন, সেই সময়েই তার বাপ-মা তাকে প্যারিসের রাজপথে ফেলে পালিয়ে যায়।
আবাদি রাস্তায় পড়ে বেড়াল-কুকুরের বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগল। এক বুড়ি ন্যাকড়া কুড়ুনি সেখান দিয়ে যেতে-যেতে তার কান্না শুনতে পেলে। সে খালি ন্যাকড়া কুড়ত না, পথে-পথে ভিক্ষাও করত। বুড়ি বুঝলে, এই খোকাটিকে দেখিয়ে সে খুব সহজেই লোকের মন ভেজাতে পারবে। সে তখনই আবাদিকে কোলে করে নিয়ে গেল।
বুড়ি যা ভেবেছিল তাই! তার কোলে ছেঁড়া ন্যাকড়া-জড়ানো, অতটুকু একটি কচি খোকাকে দেখে সকলেরই দয়ামায়ার সঞ্চার হয়। প্রত্যেকেই বুড়ির হাতে কিছু না কিছু খুঁজে দেয়। এইভাবে তার রোজগার খুব বেড়ে গেল।
ইতিমধ্যে একদিন উঁচু জায়গা থেকে পাথরের মেঝের উপরে পড়ে গিয়ে আবাদির শিরদাঁড়া গেল দুমড়ে বেঁকে। বয়সে কচি বলে সে প্রাণে বেঁচে গেল বটে, কিন্তু তাকে দেখতে হল বিকলাঙ্গ কুঁজোর মতো।
.
এদিকে বুড়ির রোজগার দেখে প্যারিসের অন্যান্য ভিখারির চোখ টাটিয়ে উঠল। তারা বুঝলে, বুড়ির শ্রীবৃদ্ধির কারণ হচ্ছে ওই আবাদি।
অন্য-এক ভিখারি একদিন বুড়িকে খুন করে আবাদিকে চুরি করে নিয়ে গেল। সেখান থেকে সে কিছুদিন পরে আবার হাতফেরতা হল। বছর-ছয়েক বয়সের মধ্যে আবাদি এইভাবে নানা ভিখারির ঘরে আশ্রয় লাভ করলে।
নানা চরিত্রের ভিখারির সঙ্গে থেকে, ছয় বছর বয়সেই আবাদি হয়ে উঠল খুব চালাক চতুর। সে জাল-অন্ধ ও নকল-খোঁড়া সেজে কেবল ভিক্ষা করতেই শিখলে না, চুরি-বিদ্যাতেও তার হাতেখড়ি হল। খুদে দেহ নিয়ে যে-কোনও গর্ত দিয়ে গলে সে লোকের বাড়ির ভিতরে ঢুকত, তারপর যা পেত তাই নিয়েই বাইরে পালিয়ে আসত। পথে কোনও অন্ধ বা পঙ্গু ভিখারি বসে আছে, হঠাৎ আবাদি এসে তার ভিক্ষা করা টাকাপয়সা তুলে নিয়ে দিলে দে ছুট।
আবাদির মতন ছেলে যে চুরি-জুয়াচুরি শিখবে, এটা খুব আশ্চর্য কথা নয়! সে মানুষ হয়েছে চোর-জুয়াচোরের ঘরেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই যে, লেখাপড়ার দিকে ছিল তার অত্যন্ত প্রাণের টান! কোনও মাস্টার সে পায়নি, কেউ তাকে পড়াশুনো করতে বলেনি, কিন্তু তবু কি বিচিত্র উপায়ে সে লিখতে-পড়তে শিখেছিল তা জানো?
তার ভিখারি-মনিবরা প্রতিদিন যখন এক দুই তিন করে পয়সা গুনত ও হিসাব করত, আবাদি তখন মন দিয়ে শুনত। এই উপায়ে সে ছোটখাটো অঙ্ক শিখে নিলে। প্যারিসের রাজপথে বিজ্ঞাপনের পোস্টার ও বিভিন্ন রাস্তার নাম দেখে তার বর্ণপরিচয় হয়ে গেল। পড়তে শিখলে বটে, তাকে বই কিনে দেওয়ার লোক নেই! কিন্তু আস্তাকুঁড় খুঁজে সে গৃহস্থদের ফেলে-দেওয়া ছেঁড়া বই ও পুরোনো খবরের কাগজ কুড়িয়ে আনত এবং তার দ্বারাই পুস্তকের অভাব। দূর করত।
