মোহনেন্দু উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, আদালতে কি প্রকাশ পাবে মহাশয়? অর্থলোভে কে কোথায় রাহাজানি করেছে, কত মানুষকে জখম করেছে, কত বিভীষিকার সৃষ্টি করেছে–কেমন এইসব তো? ওসব তো অতি সাধারণ ব্যাপার, পৃথিবীর রাম-শ্যাম-যদু-মধুর দলও তো প্রতিদিন যা করছে, ধরা পড়ছে, জেল খাটছে। কিন্তু আদালতে কি প্রকাশ পাবে আমার বিচিত্র পরিকল্পনার পিছনে আছে উচ্চতর, মহত্তর, কোনও উদ্দেশ্য? আদালতে বড়জোর প্রমাণিত হবে যে, পরের সম্পত্তি লুণ্ঠন করবার জন্যেই সৃষ্টি হয়েছে এই যন্ত্রমানব। কিন্তু সেইটেই যে বড় সত্য নয়, এটা নিজের হাতে লিখে আমি কালকেই আপনাদের জানাব। আজ আর আমাকে কোনও প্রশ্ন করবেন না, রাম শ্যাম-যদু-মধুর মতো ধরা যখন পড়েছি, তখন আমাকে থানায় বা হাজতে বা জেলখানায় যেখানে খুশি টেনে নিয়ে যেতে পারেন।
.
অষ্টম । পরিচ্ছেদ রোবট
জয়ন্ত ঘরে ঢুকে দেখলে, মানিক একমনে খবরের কাগজ পাঠ করছে।
সে শুধোলে, কালকের ব্যাপারটা কাগজে বেরিয়েছে নাকি?
বেরিয়েছে বইকী।
চেয়ারের উপরে বসে পড়ে জয়ন্ত বললে, পড়ো তো শুনি।
মানিক পাঠ করে যা শোনালে, তা আমাদের পূর্ব পরিচ্ছেদে বর্ণিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি মাত্র, সুতরাং এখানে উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু বর্ণনার শেষে কাগজের সংবাদদাতা এই মতটুকু প্রকাশ করেছেন।
যন্ত্রমানব। বিলাতি পুঁথিপত্রে যখন চন্দ্রলোকের যাত্রীদের প্রসঙ্গ লইয়া আলোচনা করা হয়, তখন তাহা সম্ভবপর বলিয়া বিশ্বাস না করিলেও আমরা সাগ্রহে পাঠ করি। বিলাতি পুঁথিপত্রে যন্ত্রমানবদের লইয়াও বহু আলোচনা হইয়াছে এবং সেসব আলোচনাও আমরা অল্প উপভোগ করি নাই। মাঝে-মাঝে এ-সংবাদও পাঠ করা যায় যে, পাশ্চাত্যদেশের যান্ত্রিকরা সীমাবদ্ধ। শক্তিসম্পন্ন কলের মানুষ নির্মাণ করিয়াছে এবং তাহারাও সাহায্য করিতেছে সত্যকার মানুষদের নানা কার্যে। কিন্তু সে-সব যন্ত্রমানুষ আসলে খেলাঘরের কলে-দম-দেওয়া পুতুলের উন্নততর ও বৃহত্তর সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নহে।
কিন্তু কল্পনার যন্ত্রমানুষকে প্রায় আসল মানুষের সমকক্ষ করিয়া তুলিয়াছিলেন সর্বপ্রথমে চেকোশ্লোভেকিয়ার কারেল ও জোসেফ ক্যাপেক ভ্রাতৃযুগল, প্রায় একত্রিশ বছর আগে। তাঁদের একখানি পৃথিবীবিখ্যাত নাটক, প্রতীচ্যের দেশে দেশে তাহার অভিনয় হয়। ক্যাপেক ভ্রাতৃযুগল তাদের কল্পনায় সৃষ্ট যন্ত্রমানুষের নাম রাখিয়াছিলেন রোবট। ক্রমে ওই রোবট কথাটি এতটা জনপ্রিয় হইয়া উঠে যে, যন্ত্রমানুষ বুঝাইবার জন্য প্রত্যেক ইংরেজি অভিধানেই রোবট শব্দটি স্থান লাভ করিয়াছে।
কিন্তু বাস্তব জগতে এই রকম প্রায় মানুষের সমকক্ষ রোবট প্রস্তুত করিয়া একজন বাঙালি অপরাধী যে এমনভাবে স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করিবে, এটা ছিল আমাদের নিরঙ্কুশ কল্পনারও অতীত! কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় যে, মোহনেন্দু নিজের অপূর্ব প্রতিভাকে সৎপথে চালনা করিয়া দেশের ও দশের কাছে ধন্যবাদভাজন হইতে পারিল না।
জয়ন্ত বললে, রিপোর্টারের একটু ভুল হয়েছে। পাশ্চাত্য দেশের সবাই জানে, অনেক বিষয়েই প্রায় মানুষের সমকক্ষ–এমনকী কোনও ক্ষেত্রে মানুষেরও চেয়ে কার্যকর–রোবট প্রস্তুত করা অনায়াসেই সম্ভবপর। এই হালেই এ সম্বন্ধে এক-একটি টাটকা খবর পাওয়া গেছে। সেদিন তোমার কাছে আমি কানাডার Defence Research Board-এর চেয়ারম্যান ডক্টর এইচ. এম. সোলান্ডের কথা তুলেছিলুম মনে আছে?
মানিক বললে, আছে।
তিনি কী বলেন শোনো প্রথম মহাযুদ্ধে যেমন অশ্বের স্থান অধিকার করেছিল ট্যাঙ্ক, ভবিষ্যতের যুদ্ধে পদাতিক সৈন্যদের স্থান দখল করবে তেমনই রোবটরাই। তাদের থাকবে কৃত্রিম শ্রবণ, দৃষ্টি, স্পর্শ ও ঘ্রাণের শক্তি ও তারা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারও করতে পারবে। তারা জলে জাহাজ আর শূন্যে বিমান-চালাবে, রিপোর্ট লিখবে ও রেডিয়োর সাহায্যে নির্দেশ গ্রহণ করবে। আমাদের সৈনিকরা শত্রুদের অগ্নিবর্ষণের ফলে অশান্ত বা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে না। তারা হবে ইলেকট্রনিক স্নায়ু আর স্মৃতিশক্তির অধিকারী। এ-ও প্রকাশ পেয়েছে যে, ডক্টর সোল্যান্ড এরকম যন্ত্রমানুষ প্রস্তুত করবার পদ্ধতি জানেন এবং ইঞ্জিনিয়াররা সেই পদ্ধতিতে কাজ করলেই তা সম্ভবপর হবে।
মানিক বললে, আচ্ছা জয়ন্ত, তুমি কি আগেই বুঝতে পেরেছিলে যে ওই ঘটনাগুলো হচ্ছে যন্ত্রমানুষের কীর্তি?
প্রথমে বুঝতে পারিনি, পরে আন্দাজ করতে পেরেছিলুম।
–কেমন করে?
–যা অপ্রাকৃত বা অলৌকিক, তা আমি বিশ্বাস করি না, তার একটা বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজতে চাই। মানুষ বা অন্য কোনও জীব-জন্তুর চোখে মোটরের হেডলাইটের মতো আলো জুলতে পারে না। ধরে নিলুম ওটা যান্ত্রিক কৌশল। তারপর একসঙ্গে একই কণ্ঠে, বহু কণ্ঠের ধ্বনি, ওটাও জীবজগতে অসম্ভব। সুতরাং ধরে নিলুম, মূর্তিটার লোহার আবরণের তলায় আছে ফোনোগ্রাফের মতো কোনও রেকর্ড করবার যন্ত্র–যা একসঙ্গে নানা কণ্ঠ নিঃসৃত শব্দের পুনরাবৃত্তি করতে পারে। তারপর মূর্তিটার আপাদমস্তক লৌহ আচ্ছাদনে ঢাকা শুনেই আমার মনে পড়ে গেল পাশ্চাত্য দেশের রোবটদের কথা। কিন্তু এখনো আমার সব প্রশ্নের উত্তর পাইনি, তাই মোহনেন্দু লিখিত স্বীকারোক্তির জন্যে অপেক্ষা করছি। ওই যে, সিঁড়ির উপরে সুন্দরবাবুর ভারী ভারী পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি, দেখি উনি কি সমাচার বহন করে আনছেন।
