জয়ন্ত উঠে গিয়ে রিসিভার কানে দিয়ে শুধোলে, হ্যালো, কাকে চান? সুন্দরবাবুকে? হ্যাঁ, তিনি এখানেই আছেন, ডেকে দিচ্ছি। ধরুন। ফিরে বললে, সুন্দরবাবু, থানা থেকে আপনাকে ডাকছে।
সুন্দরবাবু মুখ ব্যাজার করে বললেন, স্থান নেই, কাল নেই, দু-দণ্ড পা ছড়িয়ে জিরুবার যো নেই–কেবলই ডাকাডাকি। আর পারি না বাবা, হুম! তারপর গাত্রোত্থান করে ফোন ধরেই তাঁর মুখের উপরে ফুটে উঠল বিরক্তির বদলে মহা বিস্ময়ের ভাব।
সচকিত কণ্ঠে বললেন, আঁঃ, কী বললে?…আচ্ছা, আচ্ছা, এখুনি যাচ্ছি। তোমরা এখুনি অকুস্থলে যাও–বাড়িখানা চারধার থেকে ঘেরাও করে রাখো হা, ভালো কথা। মোহনেন্দুকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে ভুলো না।
রিসিভারটা যথাস্থানে স্থাপন করে উৎসাহিত কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, জয়ন্ত তোমার অনুমান যে এত শীঘ্র সফল হবে তা আমি ভাবতে পারিনি। যাক সে কথা, এখন তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো, সব কথা হবে গাড়িতে।
বাইরে এসে গাড়িতে উঠে জয়ন্ত বললে, বুঝেছি। অলৌকিক দস্যু আবার দেখা দিয়েছে।
হ্যাঁ।
কোন বাড়িতে?
সুরেন রায় রোডে।
তারপর?
এবারে সে প্রায় একটা নরহত্যা করেছে।
কীরকম?
আজ সকালে পাহারা বদলের সময়ে দেখা যায় রাতের পাহারাওয়ালা বাড়ির দরজার সামনে রক্তাক্ত দেহে মূৰ্জিত হয়ে পড়ে রয়েছে। তাকে তখনই হাসপাতালে পাঠানো হয়, কিন্তু
সে বাঁচবে কিনা সন্দেহ।
আর অলৌকিক দস্যু?
তাকে কেউ চোখে দেখেনি বটে, কিন্তু সে ওই বাড়ির ভিতরেই আছে।
কী করে বুঝলেন?
মোহনেন্দু কাল বাড়ি থেকে বেরুবার সময় সদর দরজার তালা দিয়েছিল। আজ সকালে সেই তালাটা পাওয়া গিয়েছে ভাঙা অবস্থায়, পাহারাওয়ালার দেহের পাশে। কিন্তু বাড়ির সদর দরজাটা খোলা নেই, ভিতর থেকে বন্ধ। এ থেকে কি বুঝতে হয়?…কিন্তু আমি কি ভেবে আশ্চর্য হচ্ছি জানো? এত কাণ্ড করে বারবার পুলিশকে অত সহজে ফাঁকি দিয়ে, অলৌকিক দস্যু কি শেষটা এমন নির্বোধের মতো আমাদের হাতের মুঠোয় এসে পড়বে?
রহস্যময় হাস্য করে জয়ন্ত বললে, এজন্যে আমি একটুও বিস্মিত নই। সুন্দরবাবু, আপনাদের ওই অলৌকিক দস্যুর অবস্থা হয়েছে এখন চালকহীন চলন্ত গাড়ির মতো।
তার মানে?
চালককে আপনারা লক আপে রেখেছেন?
মোহনেন্দুর কথা বলছ?
হ্যাঁ। দেহের চালক হচ্ছে মস্তিষ্ক। অলৌকিক দস্যুর মস্তিষ্ক এখন আপনাদের হস্তগত হয়েছে। এখন তাকে বুদ্ধি দেওয়ার কেউ নেই। তাই সে নির্বোধের মতো আচরণ করতে পারে।
তুমি কি বলতে চাও, যত নষ্টের মূল ওই মোহনেই?
নিশ্চয়ই!
তোমার যুক্তি বুঝতে পারলুম না।
এখনই বুঝতে পারবেন। আমরা ঘটনাস্থলে এসে পড়েছি।
সেই দোতলা লালরঙের বাড়ি। সামনে কৌতূহলী জনতা ও দলে দলে পুলিশকারুর হাতে লাঠি, কারুর হাতে বন্দুক।
সদর দরজার সামনে গিয়ে সুন্দরবাবু মাটির দিকে অঙ্গুলি নিদের্শ করলেন। সেখানে রক্তের দাগ।
সুন্দরবাবু সদর দরজার উপরে সজোরে ধাক্কা মারতে মারতে চিৎকার করে বললেন, বাড়ির ভিতরে কে আছ? দরজা খোলো, দরজা খোলো।
সকলে নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল, কিন্তু কেউ সাড়াও দিলে না, দরজাও খুললে না।
সুন্দরবাবু বললেন, আচ্ছা, আগে মোহনেন্দুকে এখানে নিয়ে এসো। যদি তার ডাকেও কেউ সাড়া না দেয়, তাহলে দরজাটা ভেঙে ফেলতে বেশিক্ষণ লাগবে না।
কিন্তু এমন সময়ে ঘটল এক বিচিত্র অঘটন। ঝনাৎ করে বাড়ির দরজা খুলে পথের উপরে লাফিয়ে পড়ল প্রকাণ্ড এক শরীরী দুঃস্বপ্ন–দুই চক্ষে তার ধক ধক করে জ্বলে উঠল দু-দুটো সুদীর্ঘ ও উগ্ৰ অগ্নিশিখা–পায়ে পায়ে সে সুন্দরবাবুর দিকে এগুতে এগুতে বললে, ভোঁ-ভোঁ, ভোঁ-ভোঁ, ভোঁ-ভোঁ। অলৌকিক দস্যু!
সুন্দরবাবু পায়ে-পায়ে পিছোতে-পিছোতে বললেন, আবার ভেঁ-ভেঁ? বন্দুক ছোড়, বন্দুক
এমন সময় মোহনেন্দু কোথা থেকে উদভ্রান্তের মতো ছুটে এসে সকাতরে বলে উঠল, বন্দুক ছুড়বেন না বন্দুক ছুড়বেন না–আমি ওকে এখনি নিশ্চল করে দিচ্ছি!
কিন্তু ইতিমধ্যেই গর্জন করে উঠেছে একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুক! সেই বর্মাবৃত, অতিকায়, অবিশ্বাস্য মূর্তিটা তৎক্ষণাৎ ভূতলশায়ী হল ঠিক ছিন্নমূল বৃক্ষের মতোই–সে একটি মাত্র আর্তনাদও করলে না, মাটিতে পড়ে একবারও ছটফট করলে না। এত সহজে যে এত বড় শত্ৰুনিপাত হবে, এটা কেউ কল্পনাতেও আনতে পারেনি।
মোহনেন্দু অত্যন্ত ভগ্নস্বরে বলে উঠল, করলেন কী? এ আপনারা করলেন কী? আমার কত সাধনার সফল স্বপ্ন একেবারে বিফল করে দিলেন! আমি এক মুহূর্তের মধ্যেই ওকে নিশ্চল করে দিতুম, কিন্তু আপনারা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারলেন না?
সুন্দরবাবু বললেন, মোহনেন্দুবাবু, ও আপনার কে?
আমার মানসপুত্র।
জয়ন্ত এগিয়ে এসে বললে, মানসপুত্রকে মনের ভিতরে রাখলেই আপনি বুদ্ধিমানের কাজ করতেন। কিন্তু তাকে একটা কৃত্রিম আর ভীষণ আকার দিয়ে বাইরের পৃথিবীতে পাঠিয়ে এমন উপদ্রব সৃষ্টি করবার অধিকার আপনার নেই।
মোহনেন্দু বললে, সব কথা যদি আপনারা জানতেন।
আমি জানি, এ হচ্ছে যন্ত্রমানব।
সুন্দরবাবু সবিস্ময়ে বললেন, যন্ত্রমানব?
মানিক সচমকে বললে, যন্ত্রমানব?
জয়ন্ত বললে, হা, ও হচ্ছে যন্ত্রমানব।
মোহনেন্দু বললে, তা হলেও সব কথা জানা হল না!
সুন্দরবাবু বললেন, এখন যা জানা হল না, আদালতেই তা প্রকাশ পাবে।
