সুন্দরবাবুর প্রবেশ…জয়ন্ত শুধোলে, মোহনেন্দু স্বীকারোক্তি লিখে দিয়েছে?
খানকয় কাগজ টেবিলের উপরে ফেলে দিয়ে সুন্দরবাবু বললেন, হ্যাঁ, এই নাও। বাব্বাঃ, কী কাণ্ড!
কাগজগুলো তুলে নিয়ে জয়ন্ত পড়তে বসল।
.
নবম পরিচ্ছেদ। মোহনেন্দুর কথা
আপনারা কেউ ভাববেন আমি চোর, কেউ ভাববেন আমি রাহাজান, কেউ ভাববেন আমি ডাকাত এবং কেউ বা ভাববেন আমি ওদের চেয়ে নিম্নশ্রেণির জীব।
নিজেকে সাধু বলে প্রচার করতে চাই না, তবে আমার উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে বিচার করে দেখলে বুঝতে পারবেন যে, আমি ওদের কারুরই দলের লোক নই।
ক্যাপেকদের R.U.R নাটক পাঠ করে সর্বপ্রথমে এদিকে আমার মন ও দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তারপর পাশ্চাত্য দেশের নানা বিশেষজ্ঞের মতামতের সঙ্গে পরিচিত হই। ক্রমে খবর পাই ওদেশে সত্য সত্যই কেউ কেউ যন্ত্রমানুষ তৈরি করেছেন; তারা ক্যাপেকদের কল্পিত রোবটদের মতো অতটা উন্নত না হলেও তাদের কার্যকলাপ দেখে জনসাধারণ বিপুল বিস্ময়ে অভিভূত না হয়ে পারেনি।
কিঞ্চিৎ পৈতৃক সম্পত্তি ছিল। তারই উপরে নির্ভর করে আমেরিকায় গিয়ে হাজির হলুম, কারণ আধুনিক যন্ত্র-যুগে আমেরিকাই সবচেয়ে অগ্রসর দেশ। সেখানে সুদীর্ঘ আট বৎসরকাল থেকে বিভিন্ন যন্ত্রবিদ্যাবিশারদের অধীনে শিক্ষালাভ ও হাতে-নাতে কাজ করে ফিরে আসি আবার বাংলাদেশে। বলে রাখা উচিত, ওই সময়ের মধ্যে আমি বিজ্ঞানের আরও নানা বিভাগে ঘনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জন করেছি।
তারপর কত গভীর চিন্তা, কত প্রাণপণ সাধনা, কত দুরূহ পরীক্ষার আর বার বার ব্যর্থতার পর আমার আদর্শানুযায়ী যন্ত্রমানব সৃষ্টি করলুম, এখানে তার দীর্ঘ ইতিহাস দিয়ে আপনাদের মন ভারাক্রান্ত করতে চাই না।
সফল হয়ে বেড়ে উঠল আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কথায় আছে, আশাবধিং কো গতঃ– আশার শেষ নেই। আর তাই-ই হল আমার পতনের কারণ। ভাবলুম, সৃষ্টি করব দলে-দলে এমন যন্ত্রমানুষ–যাদের সংখ্যা কেউ গুণে উঠতে পারবে না, যারা সত্যিকার মানুষের চেয়ে হবে ঢের বেশি শ্রমশীল, আজ্ঞাপালক ও কষ্টসহিষ্ণু। সেই সব নকল মানুষের সাহায্যে আমি আসল মানুষের সমাজকে অধিকতর উন্নত ও শ্ৰীমন্ত করে তুলব।
এই উচ্চাকাঙ্খাই হল আমার কাল। কারণ প্রথম যন্ত্রমানুষ তৈরি করবার জন্যে আমাকে বিবিধ পরীক্ষাকার্যে নিযুক্ত হতে হয়েছিল এবং তাইতেই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল আমার পৈতৃক সম্পত্তির অধিকাংশই। দলে দলে নতুন যন্ত্রমানুষ প্রস্তুত করতে গেলে দরকার হবে প্রচুর টাকা। সে টাকা পাব কোথায়?
সেই সময়েই আমার মাথায় আসে যন্ত্রমানুষের সাহায্যে রাহাজানি করবার দুবুদ্ধি। স্থির করলুম যে সব অবাঙালি বাংলার রক্তশোষণ করতে আসে, তাদের পিছনে যন্ত্রমানুষকে লেলিয়ে দিয়ে জোগাড় করব আমার মূলধন। তারপর সেই টাকায় নতুন নতুন যন্ত্রমানুষ তৈরি করে তাদের নিযুক্ত করব বাংলাদেশের গঠনমূলক কার্যে। রাহাজানির জন্যে যে পাপ হবে, সে পাপ ক্ষালন করব স্বদেশের মঙ্গলসাধন করে, এই ছিল আমার যুক্তি। হয়তো এই যুক্তি ভুল। সাফল্যর গর্বে আগে তা বুঝিনি, এখন বুঝতে পারছি। সমাজবিরোধী কার্যের দ্বারা সমাজের মঙ্গলসাধন হয় না।
এখন আমার সৃষ্ট যন্ত্রমানুষের কয়েকটি বিশেষত্বের কথা সংক্ষেপে বলব।
এর শরীরের অধিকাংশই ইস্পাত দিয়ে তৈরি। এর পায়ের তলায় আছে রোলার– সমতল মেঝের উপর দিয়ে বেগে ছুটবার জন্যে। এ চিন্তা করতে পারে। এর মধ্যে খানিকটা ব্রেন টিস্যু রাখবার ব্যবস্থা করেছি–তবে মানুষের মতো এর মাথার ভিতরে তা থাকে না, থাকে তামার আধারে বুকের ভিতরে। এর স্মৃতিশক্তি আছে।
এর দুই চক্ষুর জায়গায় যে দুটো অগ্নিশিখা আছে, সে দুটো সত্য-সত্যই কেবল হেডলাইটের কাজ করে–ওর আসল চোখগুলো আছে পূর্বকথিত ওই তামার মস্তিষ্ক-বাক্সের মধ্যে এবং সংখ্যায় তারা দশটি। ওই তামার আধার বা বাক্সটিই হচ্ছে প্রায় এর সর্বস্ব, কারণ ওইখানেই মস্তিষ্ক ও চোখের সঙ্গে আছে ওর শ্রবণযন্ত্র ও ঘ্রাণযন্ত্রও! আপনাদের অজ্ঞ সেপাইরা যন্ত্রমানুষের প্রাণপদার্থের মতো ওই তামার বাক্সটিই গুলি ছুঁড়ে নষ্ট করে দিয়েছে। ধাতু দিয়ে একটা ছোট বা বড় পুতুল গড়া কিছুমাত্র কঠিন নয়, কিন্তু প্রাণপদার্থ নষ্ট হলে নষ্ট হয় তার সর্বস্বই।
যন্ত্রমানুষ একটা অব্যক্ত শব্দ উচ্চারণ করতে পারে বটে, কিন্তু কথা কইতে পারে না। তবে সে কানে যা শোনে রেকর্ড করতে পারে এবং সেইজন্যই তার মধ্যে ম্যাগনেশিয়াম তার জড়ানো একটি কাঠিম আছে। সে আঁক কষতে পারে, হিসাব রাখতে পারে, ফোনে ডাক এলে রিসিভার ধরতে পারে। সে করতে পারে আরও অনেক কিছুই।
আমার হুকুম দেবতার হুকুম বলে মানতে বাধ্য। কিন্তু কলকবজার কথা জোর করে কিছুই বলা যায় না। যাতে হঠাৎ অবাধ্য হয়ে সে কোনও অকার্য-কুকার্য করতে না পারে, সেইজন্যে তারও উপায় রেখেছি আমার নিজের হাতেই। পকেট-ক্যামেরার মতো ছোট্ট একটি জিনিস সর্বদাই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। যন্ত্রমানুষ যত দূরেই যাক না কেন, সে আমার মতবিরুদ্ধ কোনও কাজ করলেই আমি ওই যন্ত্রের সাহায্যে তৎক্ষণাৎ জানতে পারব এবং বহুদূর থেকেই সঙ্গে সঙ্গে কল টিপে হরণ করব তার সকল শক্তিই। আরও অনেক কথাই বলতে পারতুম, কিন্তু বললুম না এইজন্যে যে, বিশেষজ্ঞ ছাড়া সেসব অন্য কেউ বুঝতে পারবেন না। আর বলেই বা কি হবে? আমার আশার স্বপ্ন তো ভেঙে গিয়েছে, এখন দিন-রাত কেবল চোখের সামনে দেখছি, খোলা রয়েছে কারাগারের দ্বার।
